আমাদের সমাজে ‘তারকা’ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুপালি পর্দার নায়ক-নায়িকা, মাঠ কাঁপানো ক্রিকেটার কিংবা রাজপথের তুখোড় রাজনীতিকদের মুখ। আমরা দীর্ঘকাল ধরে শিল্প-সাহিত্য, বিনোদন আর খেলাধুলার জগতেই তারকা খুঁজতে অভ্যস্ত। কিন্তু এর বাইরেও যে ভিন্ন এক জগতের মানুষ আমাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছেন, আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন—তাদের আমরা কখনোই সেই ‘স্টারডম’ বা তারকার মর্যাদা দিতে শিখিনি।
অথচ এই কাজটা করা আজ আমাদের নিজেদের স্বার্থে, জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থে বড্ড জরুরি হয়ে পড়েছে। কেবল সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে এবং আরও হাজারো সফল গল্পের জন্ম দিতে আমাদের ‘পেশাজীবী’ ও ‘উদ্যোক্তা’ তারকা প্রয়োজন।
কে সেই ‘উদ্যোক্তা তারকা’?
তারকা মানেই কেবল গ্ল্যামার নয়। তারকা মানে এমন একজন মানুষ, যিনি গণমাধ্যম বা রাজনীতির লোক না হয়েও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের মাধ্যমে হয়ে উঠবেন প্রবাদপ্রতিম। যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে সমাজে ‘নায়কোচিত’ গল্প প্রচলিত থাকবে, দেশে-বিদেশে যাদের বিশাল ভক্তকূল গড়ে উঠবে। সাধারণ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম নিয়েও কৌতূহল দেখাবে, তাদের একটি কথা শুনতে ভিড় জমাবে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তারা সর্বোচ্চ সম্মান পাবেন।
বিদেশি গল্প বনাম দেশি বাস্তবতা
বর্তমানে দেশে যে উদ্যোক্তা তৈরির আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেখানে একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে আমি একটি বড় শূন্যতা অনুভব করছি। যখনই নবীনদের কোনো সেমিনার বা কর্মশালায় যাই, অবধারিতভাবেই বিদেশি উদ্যোক্তাদের গল্প করতে হয়। স্টিভ জবস, এলন মাস্ক বা বিল গেটসের গল্পগুলো সন্দেহাতীতভাবে দারুণ রোমাঞ্চকর এবং অনুপ্রেরণায় ভরপুর।
কিন্তু সমস্যাটা হলো, আমাদের প্রেক্ষাপট আর তাদের প্রেক্ষাপট এক নয়। আমাদের পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—সবই তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে নবীনরা সেই পশ্চিমা গল্পের সাথে নিজের জীবনের লড়াইকে মেলাতে পারে না। সেসব গল্প ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে তা শুধুই ‘গল্প’ হয়ে থাকে; নিজের জীবনে প্রয়োগ করার মতো বাস্তব মডেল হয়ে ওঠে না। এই মাটির সাথে সংযোগ নেই বলেই কষ্ট করে বলা সেই গল্পগুলো থেকে আমরা আশানুরূপ ফল পাই না।
আকিজ উদ্দিন ও স্যামসন এইচ চৌধুরী
এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের সামনে তুলে ধরার মতো তেমন ‘দেশি উদ্যোক্তা তারকা’ নেই। অথচ আমাদের মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন এমন সব সফল মানুষ, যাদের সংগ্রাম আর অর্জন বিদেশের যেকোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।
মরহুম আকিজ উদ্দিন কিংবা স্যামসন এইচ চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের জীবনসংগ্রাম যদি আমরা সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারতাম, তবে তা বিশ্বমানের যেকোনো বায়োগ্রাফিকে হার মানাতো। তাদের সৃষ্টির পেছনের প্রতিটি মুহূর্ত শ্রোতাদের শিহরিত করতো। কিন্তু আমরা তাদের সেই প্রাপ্য মর্যাদা বা গ্ল্যামার দিতে ব্যর্থ হয়েছি।
তথাকথিত জীবনী বনাম বাস্তব অভিজ্ঞতা
আমাদের দেশে সফল মানুষদের নিয়ে যা কিছু লেখা হয়, তার বেশির ভাগই বড্ড একঘেয়ে। সেখানে প্রাধান্য পায়—‘সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম’, ‘দান-খয়রাত’ কিংবা ‘ছেলেমেয়ের সাফল্য’। অথচ একজন উদ্যোক্তার গল্পের আসল উপকরণ হওয়া উচিত ছিল—তার কাজের কৌশল, উদ্ভাবনী চিন্তা (Innovation), ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, ব্যর্থতার গ্লানি এবং পুনরুত্থানের অদম্য জেদ। সিনেমার মূল ‘অ্যাকশন’ দৃশ্য বাদ দিয়ে যেমন সিনেমা জমে না, তেমনি এই মানুষগুলোর সাফল্যের নেপথ্যের মূল কৌশল বা ‘ম্যাজিক’ আমাদের কাছে অজানাই থেকে গেছে। তাই তাদের জীবনীগুলো সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়নি, আর আজ নবীনদের জন্য সেখান থেকে শেখার মতো রসদও পাওয়া যাচ্ছে না।
পর্দার পিছনের তারকাদের গণমানুষের তারকা বানানোর রূপরেখা
যদি আমরা সত্যিই মানসম্মত উদ্যোক্তা ও পেশাজীবী তৈরি করতে চাই, তবে আমাদের নিজেদের ‘রোল মডেল’ নিজেদেরই গড়তে হবে। নেপথ্যের এই নায়কদের সামনে নিয়ে আসার জন্য আমাদের নিচের কাজগুলো করা জরুরি:
- সৃজনশীল উপস্থাপনা: তাদের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে মানসম্মত নাটক, চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারি নির্মাণ করতে হবে।
- আধুনিক বায়োগ্রাফি: তাদের জীবনীগ্রন্থগুলো কেবল জন্ম-মৃত্যুর সালতামামি হবে না; সেখানে ফুটে উঠবে তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, প্রতিকূলতায় ভেঙে না পড়ার গল্প এবং অভাবনীয় কর্মকৌশল।
- সাক্ষ্য বা টেস্টিমনি: তাদের সাথে কাজ করা কর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং ডায়েরি থেকে তথ্য নিয়ে জীবনচিত্র পূর্ণাঙ্গ করতে হবে।
- ডিজিটাল উপস্থিতি: ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ফ্যান-পেজ এবং উইকিপিডিয়াতে তাদের বিস্তারিত তথ্য ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে।
- একাডেমিক সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন বক্তা হিসেবে সফল উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাদের অভিজ্ঞতার নির্যাস নিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমাদের নিজেদের সফল মানুষদের নিয়ে আমাদের সত্যিই গর্বিত হতে শিখতে হবে। আপনাকে, আমাকে এবং পুরো জাতিকে তাদের কৃতিত্বকে ওন (Own) করতে হবে।
আমরা যদি আজ আমাদের নেপথ্যের নায়কদের আলোয় নিয়ে আসতে পারি, তবে প্রতিটি খাত থেকে নতুন নতুন তারকার জন্ম হবে। আর সেই হাজারো তারার জ্যোতিই হবে আগামীর লক্ষ কোটি তরুণের পথচলার প্রধান অনুপ্রেরণা।
======
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (বিআইআইসি)
আরও দেখুন:
