বাঙালি মুসলিম সমাজে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষা, উদার মানবিক মূল্যবোধ আর পরমতসহিষ্ণুতার আলো ছড়িয়ে দিতে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ এক অনন্য বাতিঘর। ১৯৭৫ সালের ২২শে মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজ ২০১৫ সালে এসে, বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন গর্বের সাথে তার গৌরবময় ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে।

প্রতিষ্ঠার গল্প ও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা
ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কল্যাণে তখন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর খুব দরকার ছিল, যা হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও কল্যাণমুখী। দেশের সব ঘরানার আলেম-ওলামা যাতে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে এসে ইসলামের প্রকৃত খেদমতে শামিল হতে পারেন—সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁরই আন্তরিক ইচ্ছা ও দিকনির্দেশনায় তৈরি হয়েছিল ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট’। আজ চার দশক পেরিয়ে এসেও এই আইনটিই প্রতিষ্ঠানটির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সুদীর্ঘ পথচলার অর্জন ও সমাজের বুকে অবদান
গত ৪০ বছরের দীর্ঘ এই পথচলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন শুধু দেশের সীমানায় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অন্যতম একটি শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এর বহুমুখী কাজের পরিধি অনেক বড়, যার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো:
ইসলামী গবেষণা ও প্রকাশনা:
বাংলায় ইসলামের নানা বিষয়ে মৌলিক ও গবেষণামূলক বিশ্বকোষ, সিরাত এবং তাফসির গ্রন্থ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি এক অসামান্য বিপ্লব ঘটিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের সুন্দর বাণী যেমন সহজ ভাষায় পৌঁছে গেছে, তেমনি এটি সমৃদ্ধ করেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যকেও।
মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা:
একদম তৃণমূল পর্যায়ে নিরক্ষরতা দূর করতে আর শিশুদের মনে নৈতিকতার বীজ বুনে দিতে এই প্রকল্পটির অবদান আজ দেশজুড়ে প্রশংসিত। লাখ লাখ শিশু এখান থেকে প্রাক-প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষার আলো পাচ্ছে।
ইমাম প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়ন:
ইমামদের কেবল ধর্মীয় দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ না রেখে, তাঁদেরকে সমাজসেবক ও স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
জাকাত ফান্ড ও মানবিক সেবা:
সরকারি জাকাত ফান্ডের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অভাবী ও দুস্থ মানুষের পুনর্বাসন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোয় আগামী দিনের প্রত্যাশা
চার দশক পূর্তির এই আনন্দের ক্ষণে আমাদের একটাই চাওয়া—ইসলামিক ফাউন্ডেশন যেন তার মূল লক্ষ্য থেকে কখনো সরে না যায়। সমাজ থেকে উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ আর ধর্মান্ধতার অন্ধকার দূর করে শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত চেতনা, সহনশীলতা এবং সঠিক শিক্ষা প্রচারে প্রতিষ্ঠানটি আগামী দিনে আরও বেশি সাহসী ও কার্যকর ভূমিকা রাখুক। ইসলামের মানবিক আলো বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এই সুন্দর পথচলা চিরকাল অব্যাহত থাকুক।
