রাগ কেদার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ কেদার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি রাগ। হিন্দু পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুসারে, এই রাগের নামকরণ হয়েছে মহাদেব শিবের অপর নাম ‘কেদারনাথ’ থেকে। এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। কেদার রাগটি তার গঠনশৈলীর কারণে যেমন রাজকীয়, তেমনি এর চলন অত্যন্ত ভক্তিময় ও বীর রসপ্রধান। প্রায় সকল কিংবদন্তি শিল্পী—কণ্ঠ ও যন্ত্র উভয় মাধ্যমেই এই রাগের অমর সব রেকর্ডিং রেখে গেছেন। খেয়াল, ধ্রুপদ বা ধামারের পাশাপাশি উপ-শাস্ত্রীয় সংগীত যেমন ঠুমরি, দাদরা এবং চলচ্চিত্রের গানেও এই রাগের প্রয়োগ ব্যাপক ও জনপ্রিয়।

রাগ কেদার [ Raga Kedar, Kedara]

 

রাগ কেদার [ Raga Kedar, Kedara] সহজে রাগ চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট

 

বিশেষত্ব

কেদার রাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘বক্র’ চলন। এই রাগে সরাসরি এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার চেয়ে স্বরের ঘোরাফেরা বা বক্রতা বেশি। বিশেষ করে ষড়জ (সা) থেকে সরাসরি শুদ্ধ মধ্যমে (মা) যাওয়ার যে চমৎকারিত্ব (সা-মা), তা এই রাগের প্রাণ। এতে দুটি মধ্যমই ব্যবহৃত হয়; শুদ্ধ মধ্যম বাদী স্বর হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তীব্র মধ্যমটি পঞ্চমের সাথে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে (ক্ষা-পা) ব্যবহৃত হয়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
  • আরোহ: সা মা, মা পা, ধা পা, নি ধা সা। (অনেকে বক্রভাবে দেখান: সা মা, মা পা, ক্ষা পা ধা নি ধা সা)।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা, ক্ষা পা ধা পা মা, রে সা।
  • পাকড়: সা মা, মা পা, ধা পা মা, রে সা।
  • বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (মা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং গান্ধার (গা) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা), শুদ্ধ নিষাদ (নি)। অবরোহে কোনো কোনো ঘরানায় সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কোমল নিষাদের (ণি) সামান্য ছোঁয়া লাগানো হয়।
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, জাগ্রত এবং ভক্তিপ্রধান।

 

কেদার রাগিনী, রুকনুদ্দিন অঙ্কিত। বিকানির, সময়কাল আনুমানিক ১৬৯০-১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট।
কেদার রাগিনী, রুকনুদ্দিন অঙ্কিত। বিকানির, সময়কাল আনুমানিক ১৬৯০-১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

কেদার রাগের সাথে মিল থাকা বা অঙ্গগত সম্পর্ক থাকা রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ হামীর: কেদারের মতো হামীরেও দুটি মধ্যম ও ধা-পা সঙ্গতি আছে, তবে হামীরে ঋষভ (রে) অনেক বেশি প্রবল এবং আরোহে ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ কামোদ: কামোদেও কেদারের মতো ‘রে পা’ বা ‘মা পা’ সঙ্গতি থাকে, কিন্তু কামোদে ঋষভ ও পঞ্চমের প্রাধান্য কেদারের চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়।
  • রাগ শ্যাম কল্যাণ: এই রাগেও তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ মধ্যমের খেলা আছে, তবে এর অবরোহে শুদ্ধ মধ্যম অত্যন্ত দুর্বলভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ চাঁদনী কেদার: এটি কেদারের একটি প্রকারভেদ যেখানে কোমল নিষাদের প্রয়োগ আরও স্পষ্ট এবং যা রাত্রির গভীরতার অনুভূতি দেয়।
  • রাগ মালুহা কেদার: কেদারের সাথে অন্য রাগের মিশ্রণে তৈরি এই রাগে গান্ধার স্বরটি কেদারের তুলনায় বেশি স্পষ্ট হয়।

রাগ কেদার কেবল একটি সুরের কাঠামো নয়, বরং এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এর দুটি মধ্যম এবং পঞ্চমের বিশেষ চলন শ্রোতার মনে এক ধরণের দিব্য উন্মাদনা তৈরি করে। সা থেকে মা-এর সেই দীর্ঘ লম্ফ বা ‘ক্ষা পা ধা পা’ অংশের মাধুর্য এই রাগকে আভিজাত্যের শিখরে নিয়ে গেছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যাকরণ মেনে চললেও কেদার তার আপন মহিমায় যেকোনো সাধারণ শ্রোতার হৃদয়েও দাগ কাটতে সক্ষম। এটি ভারতীয় সংগীতের এক অমূল্য রত্ন যা যুগ যুগ ধরে সাধকদের অনুপ্রাণিত করে আসছে।

চলুন এত শাস্ত্র না কপচে গান বাজনা শোনা শুরু করি

কন্ঠে কেদার:

 

কাজী নজরুল ইসলাম

 

কাজী নজরুল ইসলামের গানে কেদার:

আমি এর আগে বারবার লিখেছি রাগের ছাঁচটা বোঝার জন্য নজরুলের গান ভালো। কারণ তিনি কোন রাগের উপরে গান বাঁধলে যতটা সম্ভব রাগের মধ্যে থাকতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেদারের মতো এত গুরুত্বপুর্ন রাগের নজরুলের গান খুঁজে পেয়েছি মাত্র একটি। বাঁকি গুলো মিশ্র রাগের। সেগুলোই আপনাদের জন্য তুলে দিলাম।

১. শুদ্ধ কেদারা ভিত্তিক গান

নজরুল সংগীতে বিশুদ্ধ কেদারার প্রয়োগ তুলনামূলক কম হলেও নিচের গানটি এর একটি সার্থক উদাহরণ:

  • স্বদেশ আমার জানি না তোমার (তাল: একতাল) – এই গানটিতে কেদারের সেই ‘সা-মা’ লম্ফ এবং শুদ্ধ মধ্যমের আভিজাত্য স্বদেশপ্রেমের সাথে মিশে এক অনন্য গাম্ভীর্য তৈরি করেছে।

২. কেদারা ও হাম্বীর মিশ্রিত গান (কেদারা-হাম্বীর)

কেদার এবং হাম্বীর দুটি রাগই কল্যাণ ঠাটের এবং এদের মধ্যে গভীর মিল থাকায় নজরুল এদের যুগলবন্দীকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন:

  • আজো কাঁদে কাননে কোয়েলীয়া (কেদারা/হাম্বীর) – পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠে এই গানটি এই মিশ্র রাগের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। বিরহের আকুলতা এখানে কেদারের বক্রতায় ফুটে উঠেছে।
  • আমার দুখের বন্ধু তোমার কাছে (তাল: ত্রিতাল) – এখানে কেদারের ভক্তি ও হাম্বীরের তেজস্বিতা মিলেমিশে একাকার।
  • কে এলো ওরে কে এলো (তাল: দ্রুত একতাল / দাদ্‌রা) – দ্রুত লয়ের এই গানে রাগের চঞ্চলতা ও আনন্দ প্রকাশ পেয়েছে।
  • ঝঞ্ঝার ঝাঁঝর বাজে ঝনঝন (তাল: কাওয়ালি) – এটি একটি বীর রসপ্রধান গান। কেদারা-হাম্বীর মিশ্রণে ঝড়ের তান্ডবকে এখানে সুরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৩. চাঁদনী কেদারা ভিত্তিক গান

চাঁদনী কেদার হলো কেদারের এমন একটি রূপ যেখানে কোমল নিষাদের (ণি) প্রয়োগ রাগের মধ্যে জ্যোৎস্নালোকিত এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে:

  • চাঁদিনী রাতে মল্লিকা লতা (তাল: ত্রিতাল) – রোমান্টিক নজরুল এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সাথে কেদারের কোমলতাকে মিলিয়ে দিয়েছেন।
  • তরুণ অশান্ত কে বিরহী (তাল: ত্রিতাল) – বিরহের এক গভীর হাহাকার এই গানে ধরা পড়ে।

৪. অন্যান্য মিশ্র রূপ

  • দুর্গম গিরি কান্তার মরু (রাগ: বৃহন্নট–কেদারা, তাল: একতাল) – নজরুলের বিখ্যাত এই দেশাত্মবোধক গানে বীরত্বের সুর আনতে ‘বৃহন্নট’ রাগের সাথে কেদারার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে, যা গানটিকে এক পাহাড়সম দৃঢ়তা দিয়েছে।

নজরুল তাঁর গানে কেদারের ‘সা মা’ (ষড়জ-মধ্যম) এবং ‘ক্ষা পা ধা পা’ (তীব্র মধ্যম-পঞ্চম-ধৈবত-পঞ্চম)—এই প্রধান দুটি অঙ্গকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে যখনই তিনি কোনো সাহসী বা গম্ভীর ভাব প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তখনই কেদারার আশ্রয় নিয়েছেন। হয়তো তাঁর মিশ্র রাগ ব্যবহারের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল সুরের একঘেয়েমি কাটানো এবং গানের বাণীর সাথে সুরের ইমোশন বা আবেগকে মিলিয়ে দেওয়া। আমার সাথে তো কথা হয়নি, তাই সবই আন্দাজ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | Rabindranath Tagore

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে কেদার:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি রাগের অনুশাসন মেনে গান বাঁধেননি, বরং “হৃদয়ের ভাব” প্রকাশের প্রয়োজনে রাগের রূপ বদলে দিয়েছেন।। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়। তার পরও কিছু তালিকা দিলাম।

১. একি গভীর বানী এলো ঘন – (স্বরলিপিতে লেখা হয়েছে রাগ: মিশ্র কেদারা, তাল: দাদরা)। “ঘন মেঘে” বলার সময়টা খেয়াল করে শুনতে হবে। দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া । রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গাওয়া । চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া।

কেদার রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সা মা’ (ষড়জ থেকে সরাসরি শুদ্ধ মধ্যম)। এই গানে “একি গভীর” অংশটিতে সেই শুদ্ধ মধ্যমের প্রবল উপস্থিতি গানটিকে কেদারের আভিজাত্য দিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ এখানে বিলাবল বা অন্য কোনো রাগের সামান্য ছোঁয়া মিশিয়েছেন।

দেবব্রত বিশ্বাস কণ্ঠে কেদারের সেই উদাত্ত ভাব এবং গলার বিশেষ ‘থ্রো’ দিয়ে গানটিকে কেদারের একটা অন্নরকম উচ্চতা দিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কেদারের কাঠিন্য কমিয়ে একে একটু মোলায়েম করেছেন। চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় মিড় ও মুরকির কাজ দিয়ে কেদারকে আরেকটু অন্যরকম ভাবে ফুটিয়েছেন।

২. রাখো রাখো রে জীবনে জীবনবল্লভে- স্বরলিপিতে বলা আছে এই রাগের নাম হবে শ্যাম-কল্যাণ। তবে বিষ্ণুপুর ঘরানায় “শ্যাম” নামে একটি রাগ এর বেশি কাছে, যেটার সাথে কেদারের অনেক মিল। উভয়েই কল্যাণ ঠাটের রাগ এবং উভয়েই তীব্র ও শুদ্ধ—দুই মধ্যম ব্যবহার করে। কেদারে ‘শুদ্ধ মধ্যম’ (মা) প্রধান, আর শ্যাম-কল্যাণে ‘নি ধা পা’ বা ‘সা রে মা পা’ চলনটি বেশি গুরুত্ব পায়।

মুল সুরের থেকে একটু সরে মূল কেদার ঘেঁষে গেয়েছেন ওস্তাদ রশিদ খান। তিনি তাঁর ধ্রুপদী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কেদার রাগের ‘সা মা’ এবং ‘মা পা ধা পা’ অঙ্গটিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর গায়কি রবীন্দ্রসংগীতের সরল কাঠামোকে ছাড়িয়ে শাস্ত্রীয় কেদারার গাম্ভীর্যে স্থিত হয়েছে।

 

দেবব্রত বিশ্বাস

 

আধুনিক গানে রাগ কেদার:

১. অখিলবন্ধু ঘোষের – আজ চাঁদনী রাতে গো (লেবেলে কোদার লেখা থাকলেও গানটি শোনার সময় আমার কিছু ‘চাঁদনী কেদার’-এর মতো মনে হয়েছে। সাধারণ কেদারের সাথে মনে হয়েছে কোমল নিষাদ (ণি)-এর একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মায়াবী ব্যবহার করেছেন।

গানের শুরুতেই “আজ…” শব্দটি যখন উচ্চ গ্রাম থেকে মধ্যমে নেমে আসে, তখন কেদারের সেই চিরচেনা ‘সা-মা’ অঙ্গটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অখিলবন্ধু তাঁর গায়কিতে কেদারের কাঠিন্যকে সরিয়ে একে অনেক বেশি রোমান্টিক ও মোলায়েম করে তুলেছেন। তাঁর ‘তান’ এবং ‘মুরকি’র কাজগুলো কেদার রাগের বক্রতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

২. জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামীর – জোছনা বিছানো ধরাতল : পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী (যিনি ‘জ্ঞানগোস্বামী’ নামে পরিচিত) ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার এক দিকপাল শিল্পী। তাঁর এই গানটি বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় কেদারার একটি আধুনিক সংস্করণ বলা যেতে পারে। এই গানটিতে কেদার রাগের গাম্ভীর্য ও তেজস্বিতা প্রধান। জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদের উদাত্ত কণ্ঠ এবং দীর্ঘ মিড়ের কাজ কেদারের বিশুদ্ধ রূপটিকে (সা মা, মা পা, ধা পা) বারবার মনে করিয়ে দেয়।

উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী হওয়ায় তিনি এই গানে ‘বক্র’ তানের যে কাজগুলো করেছেন, তা সাধারণ আধুনিক গানের চেয়ে অনেক বেশি ওজনদার। “জোছনা বিছানো…” বলার সময় তিনি কেদার রাগের ‘তীব্র মধ্যম’ (ক্ষা) এবং ‘পঞ্চম’ (পা)-এর যে জোরালো সংগতি ব্যবহার করেছেন, তা কেদার প্রেমীদের মুগ্ধ করবে। তাঁর গান শুনলে বোঝা যায় বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় রাগকেও আধুনিক গানের আধারে কতটা জনপ্রিয় করা সম্ভব।

 

পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর
পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর

 

ভজনে কেদার:

১. পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র ঘরানা): “যোগী ম্যায় তো চরণ কমল লোটানি” — মীরা বাঈয়ের এই ভজনটি কেদার রাগের গাম্ভীর্য ও ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন।

২. পণ্ডিত যশরাজ (মেওয়াতি ঘরানা): “গোকুল মে বাজাত” — শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও গোকুলের আনন্দোৎসব নিয়ে রচিত এই ভজনটি কেদার রাগের আভিজাত্যের এক প্রামাণ্য দলিল।

৩. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা): “ম্যায় তো তেরি শরণ আই রে” — ভক্তি রসে সিক্ত এই ভজনটিতে কেদার রাগের শুদ্ধ মধ্যম ও পঞ্চমের ব্যবহার অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।

৪. বিদ্বান বালমুরলী কৃষ্ণ (কর্ণাটকী/হিন্দুস্থানি): “ও রামজি তেরে শরণ ম্যায়” — তাঁর স্বকীয় গায়কি ও কেদার রাগের রাজকীয় চলন এই ভজনটিকে এক দিব্য উচ্চতা দিয়েছে।

৫. পণ্ডিত ডি. ভি. পলুস্কর (গোয়ালিয়র ঘরানা): “পায়ো জি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো” — মীরা বাঈয়ের এই অতি পরিচিত ভজনটি তিনি বিশুদ্ধ কেদারার চালে গেয়ে অমর করে গেছেন।

৬. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): “মেহরো রাখো জি মেহরাজ” — মীরা বাঈয়ের এই পদটি তিনি কেদার রাগের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মায়াবী কারুকার্যে পরিবেশন করেছেন।

 

অন্যান্য:

অমিতাভ ঘোষের কোদারের উপরে বাঁধা বাংলা ঘরানার “ঝরিয়ে ঝর ঝর আলোর ধারা”

 

ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, আগ্রা ঘরানা
ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, আগ্রা ঘরানা

 

খেয়ালে কেদার:

১. উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা): “ম্যায় তো তেরি শরণ আই রে” (দ্রুত তিনতাল) — আগ্রা ঘরানার বিশেষ ‘নৌম-তোম’ আলাপ এবং কেদার রাগের বীর রসের সার্থক প্রয়োগ এই রেকর্ডিংয়ে স্পষ্ট।

২. উস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা): “সুঘর চতুর বালামা” (বিলম্বিত একতাল) ও “কাহান করো ম্যায়” (দ্রুত তিনতাল) — তাঁর অতি ধীর লয়ের বিস্তার ও মন্দ্র সপ্তকের কাজ কেদারের আভিজাত্যকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৩. পণ্ডিত ডি. ভি. পলুস্কর (গোয়ালিয়র ঘরানা): “পায়ো জি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো” — মীরা বাঈয়ের এই অতি পরিচিত ভজনটি তিনি বিশুদ্ধ কেদারার চালে গেয়ে অমর করে গেছেন।

৪. পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র ঘরানা): “যোগী ম্যায় তো চরণ কমল লোটানি” — মীরা বাঈয়ের এই ভজনটি কেদার রাগের গাম্ভীর্য ও ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন।

৫. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব (স্বতন্ত্র শৈলী): “সাখি নিকেত নিরাতি” — প্রথাগত ঘরানার বাইরে গিয়ে কেদারের এক মরমী ও আধ্যাত্মিক রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।

৬. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা): “এক তানা সে জিয়ারা রাহা” (দ্রুত তিনতাল) — তাঁর দরাজ কণ্ঠের তান এবং কেদার রাগের শুদ্ধ মধ্যমের তীব্র প্রয়োগ এই রেকর্ডিংটিকে এক অনন্য প্রাণশক্তি দান করেছে। “ম্যায় তো তেরি শরণ আই রে” — ভক্তি রসে সিক্ত এই ভজনটিতে কেদার রাগের শুদ্ধ মধ্যম ও পঞ্চমের ব্যবহার অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।

৭. পণ্ডিত যশরাজ (মেওয়াতি ঘরানা): “গোকুল মে বাজাত” — শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও গোকুলের আনন্দোৎসব নিয়ে রচিত এই ভজনটি কেদার রাগের আভিজাত্যের এক প্রামাণ্য দলিল। শোনার সময় বিশেষ করে ‘ধা পা মা’ এবং ‘রে সা’-এর মীড়গুলো খেয়াল করলে কেদার রাগের আসল মাধুর্য খুঁজে পাওয়া যায়।

৮. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): “সজন ক্যায়সে কহুঁ” (মধ্যলয় তিনতাল) — তাঁর সূক্ষ্ম শ্রুতি ও মীড়ের কাজ কেদার রাগের বিরহ ও আকুলতাকে অত্যন্ত মায়াবীভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। “মেহরো রাখো জি মেহরাজ” — মীরা বাঈয়ের এই পদটি তিনি কেদার রাগের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মায়াবী কারুকার্যে পরিবেশন করেছেন।

৯. উস্তাদ রশিদ খান (রামপুর-সহসওয়ান ঘরানা): “কানহা রে নান্দ নন্দন” (দ্রুত একতাল) — তাঁর দরাজ কণ্ঠের পুকার এবং কেদারের বক্র চলনের নিখুঁত তানের কাজের জন্য এটি বিখ্যাত। রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর তানের স্বচ্ছতা এবং দরাজ কণ্ঠের পুকার। রশিদ খান যখন “কানহা রে…” বলে ডাক দেন, তখন কেদার রাগের সেই বিখ্যাত ‘সা-মা’ (ষড়জ-মধ্যম) লম্ফটি তাঁর কণ্ঠে দারুন ভাবে ফুটে ওঠে। এই রেকর্ডিংটিতে রশিদ খান কেদার রাগের বক্র চলনকে অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত দ্রুত এবং দানাদার তান প্রয়োগ করেছেন। কেদারে যেহেতু ঋষভ (রে) এবং গান্ধার (গা) বক্রভাবে বা অল্প ব্যবহৃত হয়, তাই সেই ফাঁকগুলো দিয়ে তানের গতি বজায় রাখা খুব কঠিন কাজ, কিন্তু তিনি অবলীলায় করেছেন।

 

একটু কণাটাকার কেদার শুনে নিন:

 

১. বিদ্বান বালমুরলী কৃষ্ণ (কর্ণাটকী/হিন্দুস্থানি): “মাধব মুরারি” (দ্রুত তিনতাল) — তাঁর স্বকীয় গায়কি এবং কেদার রাগের বক্র চলনের নিখুঁত কারুকার্য এই খেয়ালটিতে এক অপার্থিব মাধুর্য তৈরি করেছে। “ও রামজি তেরে শরণ ম্যায়” — তাঁর স্বকীয় গায়কি ও কেদার রাগের রাজকীয় চলন এই ভজনটিকে এক দিব্য উচ্চতা দিয়েছে।

 

ডাগর ভাইদের পরিবার

 

ধ্রুপদ-ধামারে কেদার:

রাগ কেদার বা কেদারা তার গম্ভীর এবং রাজকীয় প্রকৃতির কারণে ধ্রুপদ ও ধামার গায়কির জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত একটি রাগ।

১. উস্তাদ জহিরুদ্দিন ও উস্তাদ ফৈয়াজউদ্দিন ডাগর (ডাগর বাণী): “দেবন কে দেব মহাদেব” (ধ্রুপদ, চৌতাল) — ডাগর ঘরানার স্বকীয় শান্ত ও গম্ভীর আলাপের মাধ্যমে কেদার রাগের শিব-ভক্তি ও আভিজাত্য এই রেকর্ডিংয়ে মূর্ত হয়েছে।

২. পণ্ডিত বিদুর মল্লিক (দারভাঙ্গা ঘরানা): “নিকসত কুঞ্জ কুটির তে” (ধামার, ধামার তাল) — দারভাঙ্গা ঘরানার বিশেষ ‘খণ্ডার বাণী’র তেজস্বী গমক ও কেদার রাগের বক্র চলন এই ধামারটিতে অত্যন্ত স্পষ্ট।

৩. উস্তাদ ফহিমুদ্দিন ডাগর (ডাগর বাণী): “আদি দেব মহাদেব” (ধ্রুপদ, চৌতাল) — তাঁর মন্ত্রমুগ্ধকর গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং কেদার রাগের শুদ্ধ মধ্যমের (মা) অসামান্য প্রয়োগ এই ধ্রুপদটিকে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতা দিয়েছে।

৪. পণ্ডিত ঋত্বিক সান্যাল (ডাগর বাণী): “মহারুদ্র মহাদেব” (ধ্রুপদ, চৌতাল) — আধুনিক সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদিয়া হিসেবে তিনি কেদার রাগের শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা এবং লয়কারির সূক্ষ্ম কাজ এই রেকর্ডিংয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৫. পণ্ডিত রামচতুর মল্লিক (দারভাঙ্গা ঘরানা): “কেদার বন্দিশ” (ধামার, ধামার তাল) — তাঁর শক্তিশালী গায়কি ও দ্রুত লয়ের লয়কারি কেদার রাগের বীর রস এবং গাম্ভীর্যকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।

এই তালিকায় থাকা প্রতিটি ধ্রুপদ ও ধামার রেকর্ডিংই হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের কিছুটা আদি ও বিশুদ্ধ ধারার পরিচয় বহন করে। ধ্রুপদ গায়কির বিশেষত্ব হলো এর ‘আলাপ’, যেখানে কেদার রাগের ‘সা-মা’ (ষড়জ-মধ্যম) লম্ফটি অত্যন্ত ধীর লয়ে এবং গম্ভীরভাবে পরিবেশন করা হয়। এই রেকর্ডিংগুলো শুনলে কেদার রাগের রাজকীয় রূপটি পাওয়া যায়।

উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, ইমদাদখানি, ইটাওয়া ঘরানা
উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, ইমদাদখানি, ইটাওয়া ঘরানা

 

যন্দ্রে কেদার:

সেতারে কেদার:

১. পণ্ডিত রবি শঙ্কর (মাইহার ঘরানা): “রাগ কেদারা – আলাপ, জোড় এবং ঝালা” — তাঁর বিশ্ববিখ্যাত লাইভ রেকর্ডিং যেখানে কেদারের গাম্ভীর্য ও ‘সা-মা’ লম্ফটি অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে।

২. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানি/ইটাওয়া ঘরানা): “রাগ কেদারা – গৎ এবং দ্রুত লয়” — তাঁর নিজস্ব ‘গায়কি অঙ্গ’-এর বাদনে কেদার রাগের বক্রতা ও চপলতা এক অনন্য মাত্রা লাভ করেছে।

৩. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): “রাগ কেদারা – মসিদখানি এবং রজাখানি গৎ” — তাঁর অত্যন্ত ধীর ও গভীর আলাপের মাধ্যমে কেদার রাগের আধ্যাত্মিক দিকটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

৪. উস্তাদ শাহিদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানি ঘরানা): “রাগ কেদারা – বিলম্বিত ও দ্রুত ত্রিতাল” — বর্তমান সময়ের এই কিংবদন্তি শিল্পীর বাজনায় কেদারের তীব্র মধ্যম ও পঞ্চমের (ক্ষা-পা) সূক্ষ্ম কাজগুলো অত্যন্ত প্রামাণ্য।

৫. উস্তাদ রইস খাঁ (মেওয়াতি/ইমদাদখানি ঘরানা): “রাগ কেদারা – গৎ সিতানি” — তাঁর জাদুকরী তানের কাজ এবং কেদার রাগের বক্র চলন এই রেকর্ডিংটিকে সেতার শিক্ষার্থীদের কাছে একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, ইমদাদখানি, ইটাওয়া ঘরানা
উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, ইমদাদখানি, ইটাওয়া ঘরানা

 

সারদে কেদার:

সারদ একটি ‘ফ্রেটলেস’ (Fretless) যন্ত্র হওয়ায় কেদার রাগের ‘সা-মা’ লম্ফ এবং ‘ক্ষা-পা-ধা-পা’-এর মতো বক্র অংশগুলো বাজানো বেশ শ্রমসাধ্য।

১. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (গোয়ালিয়র ঘরানা): “রাগ কেদারা – ধ্রুপদ অঙ্গ গায়কি” — এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংয়ে প্রাচীন ঘরানার গম্ভীর ও শুদ্ধ কেদারার রূপ ফুটে উঠেছে।

২. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): “রাগ কেদারা – আলাপ, জোড় ও ঝালা” — তাঁর মায়াবী স্পর্শে কেদারের ‘সা-মা’ লম্ফ এবং শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগ এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।

৩. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): “রাগ কেদারা – দাদরা ও ত্রিতাল গত” — তাঁর দ্রুত তানের কাজ এবং কেদার রাগের বক্র চলনের নিখুঁত সমন্বয় এই রেকর্ডিংটিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে।

৪. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): “রাগ কেদারা – একতাল ও ত্রিতাল” — এই যন্ত্রসংগীতে তিনি কেদার রাগের শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা এবং রাগের প্রতিচ্ছায়া চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৫. ওস্তাদ আশীষ খাঁ (মাইহার ঘরানা): “রাগ কেদারা – লাইভ কনসার্ট রেকর্ডিং” — ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি কেদারে তীব্র ও শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগের এক আধুনিক ও গতিশীল রূপ দেখিয়েছেন।

 

পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, মাইহার ঘরানা

 

বাঁশিতে কেদার:

রাগ কেদার বা কেদারা তার গম্ভীর ও বক্র চলনের জন্য বাঁশিতে তোলা অত্যন্ত কঠিন এবং একই সাথে শ্রুতিমধুর। যোগ্য শিল্পীরা বাঁশির মিড় ও গিটকিরি এই রাগের অন্যরকম একটা আভিজাত্য আনেন। চলুন কিছু রেকর্ডিং শোনা যাক। আমি কপিরাইটের কারণে সাইটে রাখতে পারছি না। আপনি ইউটিউবে গিয়ে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। 

১. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া: “রাগ কেদারা – আলাপ, জোড় ও দ্রুত তিনতাল” — তাঁর বাঁশিতে কেদার রাগের সেই বিখ্যাত ‘সা-মা’ লম্ফ এবং শুদ্ধ মধ্যমের দীর্ঘ প্রয়োগ এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি তৈরি করে।

২. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ: “রাগ কেদার – বিলম্বিত ও দ্রুত লয়” — ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আধুনিক বাঁশির জনক হিসেবে তাঁর বাদনে কেদারের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য এবং বিশুদ্ধ ব্যাকরণ ফুটে উঠেছে।

৩. পণ্ডিত রঘিনাথ শেঠ: “রাগ কেদারা – বন্দিশ ও তান” — তাঁর বিশেষ গায়নশৈলীর প্রভাবে বাঁশিতে কেদার রাগের বক্র চলন এবং সূক্ষ্ম শ্রুতির কাজগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

৪. পণ্ডিত রনু মজুমদার: “রাগ কেদারা – ফিউশন ও ক্লাসিক্যাল মেজাজ” — মৈহার ঘরানার শিল্পী হিসেবে তাঁর বাদনে কেদার রাগের বীর রস এবং লয়কারির চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।

৫. শশাঙ্ক সুব্রহ্মণ্যম: “রাগ মোহনম্/কেদারা – হিন্দুস্থানি ও কর্ণাটকী শৈলী” — যদিও তিনি কর্ণাটকী বংশীবাদক, তবে তাঁর উত্তর ভারতীয় কেদারা বা মোহনম্ রাগের ফিউশন বাদন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

বাঁশি বাদকদের কাছে শুনেছি কেদার বাজানোর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘তীব্র মধ্যম’ (ক্ষা) থেকে ‘শুদ্ধ মধ্যম’ (মা)-এর সূক্ষ্ম রূপান্তরটি ফুটিয়ে তোলা। পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া-এর দীর্ঘ ফুঁ এবং কোমল মিড় কেদার রাগের শান্ত ও ভক্তিপ্রধান প্রকৃতিকে দেখিয়েছেন।

Raga Kedar, Kedara | রাগ কেদার
Raga Kedar, Kedara | রাগ কেদার

 

টিউটোরিয়াল:

যেকোনো রাগের ব্যাকরণগত শুদ্ধতা এবং স্বরের চলাফেরা (Chalan) আত্মস্থ করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি লক্ষণ-গীত শুনলে রাগের তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো (যেমন—বাদী, সমবাদী, বর্জিত স্বর) সুরের মাধ্যমে হৃদয়াঙ্গম করা সহজ হয়। লক্ষণ-গীত মূলত একটি গানের ছলে রাগের সম্পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে, যা ছোট খেয়ালের মতোই পরিবেশিত হয়। কিছু শিক্ষণীয় রিসোর্স (টিউটোরিয়াল) এর তালিকা করে দিলাম:

১. রাগ কেদারের স্বর-মালিকা (Swar-Malika): স্বর-মালিকার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন কীভাবে ‘সা’ থেকে সরাসরি ‘মা’-তে লম্ফ দিতে হয় এবং ‘ক্ষা পা ধা পা’ সংগতিটি কীভাবে বক্রভাবে প্রয়োগ করতে হয়। এটি রাগের গাণিতিক কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে।

২. এনসিইআরটি (NCERT) অফিশিয়াল টিউটোরিয়াল: ভারত সরকারের এনসিইআরটি-এর সংগীত শিক্ষা সিরিজে রাগ কেদারের ওপর অত্যন্ত সুললিত এবং ব্যাকরণসম্মত টিউটোরিয়াল রয়েছে। এটি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য রাগের আরোহ-অবরোহ ও পাকড় বোঝার এক প্রামাণ্য মাধ্যম।

৩. আলাপ মিউজিক একাডেমি (পণ্ডিত কুলদীপ সাগর): মেওয়াতি ঘরানার সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত কুলদীপ সাগরের টিউটোরিয়ালগুলো রাগের ‘ভাব’ এবং ‘ভাও’ বুঝতে সাহায্য করে। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে কেদারের সেই রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং সূক্ষ্ম মিড়গুলোর প্রয়োগ ব্যাখ্যা করেন।

 

তথ্যসূত্র (Sources):

১. রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. অভিনব গীতাঞ্জলি – পণ্ডিত রামাশ্রয় ঝা।

৪. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।

৫. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ কেদার [ Raga Kedar, Kedara]।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন: