রাগের চলন । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে রাগের চলন (Chalan) বলতে বোঝায় কোনো রাগের স্বরগুলোর চলাচলের পূর্ণাঙ্গ ভঙ্গি বা গতিপ্রকৃতি। যদি বলা যায়—আরোহণ-অবরোহণ হলো রাগের কঙ্কাল, আর পকড় হলো তার পরিচয়চিহ্ন, তবে চলন হলো সেই রাগের সম্পূর্ণ অবয়ব বা জীবন্ত রূপ। অর্থাৎ, একটি রাগের স্বরগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে, কোন স্বর থেকে কোন স্বরে কীভাবে যাওয়া হবে, কোথায় থামা হবে, কোথায় দোলন (আন্দোলন), মীড় বা অলংকার ব্যবহার হবে—এই সবকিছুর সমন্বিত রূপই হলো চলন। চলনের মধ্য দিয়েই একটি রাগ ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং তার প্রকৃত রস ও মেজাজ শ্রোতার সামনে উন্মোচিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে রাগ ভৈরব (Bhairav)-এর চলন উল্লেখ করা যায়—
সা, গ ম প, ধ্ ধ্ প, ম গ ম ঋ ঋ সা
(Sa, Ga Ma Pa, Dha Dha Pa, Ma Ga Ma Re Re Sa)।
ভৈরব রাগের চলন অত্যন্ত শান্ত, গুরুগম্ভীর এবং ধীরস্থির। বিশেষ করে কোমল ধৈবত (ধ) থেকে পঞ্চম (প)-এ ফিরে আসার সময় এবং কোমল ঋষভ (রে)-এ থামার সময় যে সূক্ষ্ম দোলন বা আন্দোলন সৃষ্টি হয়, সেটিই এই রাগের চলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই দোলনের মাধ্যমে রাগটির গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।

অন্যদিকে রাগ ইমন (Yaman)-এর চলন হলো—
নি রে গ, রে সা, প ম^ গ রে, নি রে সা
(Ni Re Ga, Re Sa, Pa Ma♯ Ga Re, Ni Re Sa)।
ইমনের চলন সাধারণত মন্দ্র সপ্তক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মধ্য ও তার সপ্তকের দিকে বিকশিত হয়। এখানে কড়ি মধ্যম (তীব্র ম) এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে রাগটির উজ্জ্বল ও মাধুর্যময় আবহ ফুটে ওঠে। চলনের মধ্য দিয়ে ইমনের প্রশান্ত, নির্মল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত স্বভাব প্রকাশ পায়।

একইভাবে রাগ ভূপালী (Bhupali)-এর চলন—
সা রে গ, রে সা ধ প, সা রে গ প গ, রে সা
(Sa Re Ga, Re Sa Dha Pa, Sa Re Ga Pa Ga, Re Sa)।
ভূপালীর চলন অত্যন্ত সরল, নির্মল এবং ধীরগতির। এতে ব্যবহৃত পাঁচটি স্বর—সা, রে, গ, প ও ধ—এর মধ্যেই রাগটির সম্পূর্ণ রূপ প্রকাশ পায়। বিশেষ করে গ স্বরের উপর বারবার ফিরে আসা বা অবস্থান করা ভূপালীর মিষ্টতা ও প্রশান্ত ভাবকে আরও গভীর করে তোলে।

আসলে চলন কেবল স্বরের ধারাবাহিক বিন্যাস নয়; এটি রাগের স্বতন্ত্র গতিপথ বা হাঁটার ভঙ্গি নির্দেশ করে। অনেক সময় দুটি রাগের স্বর একই হলেও তাদের চলন ভিন্ন হওয়ায় রাগদুটি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ রাগ মারোয়া এবং রাগ পুরিয়া—এই দুটি রাগের স্বর অনেকাংশে মিল থাকলেও তাদের চলন ও স্বরচালনার ধরন আলাদা হওয়ার কারণে তারা পৃথক রাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

এবার কয়েকটি রাগের বিশেষ চলনের উদাহরণ দেখা যাক।

রাগ বৃন্দাবনী সারং (Brindabani Sarang)-এর চলন—
নি সা রে, ম প নি সা’, রে’ নি সা’, ন্ ধ প, ম রে, নি সা রে সা
সারং অঙ্গের রাগগুলোর চলন সাধারণত সোজা পথে না গিয়ে কিছুটা বাঁক নিয়ে এগোয়। এখানে অবরোহণে কোমল নি (ন্) ব্যবহারের সময় সুরে একটি বিশেষ বাঁক সৃষ্টি হয়, যা এই রাগের প্রাণ। চলনের মাধ্যমে শিল্পী দেখান কীভাবে শুদ্ধ নি এবং কোমল নি-এর ব্যবহারকে সূক্ষ্মভাবে আলাদা রাখা যায়।

রাগ কামোদ (Kamod)-এর চলন—
সা রে প, ম প ধ প, গ ম রে সা, রে প
কামোদ তার বক্র, অলংকারময় এবং কিছুটা রাজকীয় চলনের জন্য পরিচিত। এখানে ‘রে’ থেকে সরাসরি ‘প’ তে লাফ দেওয়া (রে-প) এবং এরপর ম-প-ধ-প-এর ঘূর্ণায়মান চলন রাগটির আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গি প্রকাশ করে। এই বিশেষ স্বরচালনই কামোদকে স্বতন্ত্র রূপ দেয়।

রাগ গৌড় সারং (Gaud Sarang)-এর চলন—
সা গ রে ম, গ প, ম ধ প, নি ধ সা’, রে’ নি ধ প, ম গ, রে ম গ, রে সা
এই রাগের চলন অত্যন্ত বক্র বা জিকজ্যাক প্রকৃতির। স্বরগুলো সরলভাবে না এগিয়ে কখনো সামনে, কখনো একটু পিছিয়ে আবার সামনে অগ্রসর হয়। এই লুকোচুরি ধরনের স্বরচালনই গৌড় সারং-এর আসল সৌন্দর্য।

আর রাগ হামীর (Hamir)-এর চলন—
সা রে গ ম, প ধ নি ধ সা’, সা’ নি ধ প, ম^ প ধ প ম প গ ম রে
হামীরের চলন বলিষ্ঠ, উজ্জ্বল এবং অনেক সময় মধ্য সপ্তক থেকে দ্রুত তার সপ্তকের দিকে ধাবিত হয়। এখানে কড়ি মধ্যম (ম^) এবং শুদ্ধ মধ্যম (ম)-এর দক্ষ ব্যবহার চলনটিকে বীরত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত রূপ দেয়।

সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়—
আরোহণ-অবরোহণ হলো কোনো শহরের প্রধান রাস্তা, পকড় হলো সেই শহরের পরিচিত ল্যান্ডমার্ক, আর চলন হলো সেই শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটার বাস্তব অভিজ্ঞতা। যখন আমরা কোনো ওস্তাদ শিল্পীর আলাপ, বন্দিশ বা খেয়াল দীর্ঘ সময় ধরে শুনি, তখন মূলত আমরা সেই রাগের চলনের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও বিকাশ উপভোগ করি।