সিম্ফনি (Symphony) হলো পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে মহিমান্বিত এবং জটিল কাঠামো। এটি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ অর্কেস্ট্রার জন্য রচিত দীর্ঘ সঙ্গীতকর্ম। ‘সিম্ফনি’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Symphonia’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসাথে ধ্বনিত হওয়া’। সিম্ফনি হলো সুরের মাধ্যমে লেখা একটি উপন্যাসের মতো, যেখানে বিভিন্ন চরিত্র (সুর) থাকে, তাদের মধ্যে সংঘাত হয় এবং শেষে একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।
সিম্ফনি । পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
সিম্ফনি কী?
সিম্ফনি (Symphony) হলো পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে মহিমান্বিত এবং জটিল কাঠামো। এটি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ অর্কেস্ট্রার জন্য রচিত দীর্ঘ সঙ্গীতকর্ম। ‘সিম্ফনি’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Symphonia’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসাথে ধ্বনিত হওয়া’। সিম্ফনি হলো সুরের মাধ্যমে লেখা একটি উপন্যাসের মতো, যেখানে বিভিন্ন চরিত্র (সুর) থাকে, তাদের মধ্যে সংঘাত হয় এবং শেষে একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।
সিম্ফনির সাধারণ কাঠামো (Structure)
পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে সিম্ফনি একটি দীর্ঘ সঙ্গীতকর্ম। এর পূর্ণাঙ্গ রূপটি একটি নির্দিষ্ট লিনিয়ার প্রগ্রেশন বা রৈখিক ধারা অনুসরণ করে, যা সাধারণত চারটি ভিন্নধর্মী ‘মুভমেন্ট’ (Movement) বা খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি মুভমেন্টের গতি বা টেম্পো (Tempo) এবং মানসিক মেজাজ আলাদা হলেও তারা একটি কেন্দ্রীয় থিম বা দর্শনের সুতোয় গাঁথা থাকে। এই কাঠামোগত বৈচিত্র্যই শ্রোতাকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও নাটকীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। একটি আদর্শ বা প্রথাগত সিম্ফনি সাধারণত ৪টি মুভমেন্ট বা খণ্ডে বিভক্ত থাকে। প্রতিটি খণ্ডের গতি (Tempo) এবং মেজাজ আলাদা হয়:
১. প্রারম্ভিক প্রগ্রেশন: সূচনা ও দ্বন্দ্ব (The Introduction & Conflict)
সিম্ফনির শুরুতেই সুরকার শ্রোতাকে একটি নির্দিষ্ট ‘কি’ (Key) বা স্কেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
স্টেপ ১ (Exposition): প্রথমে মেলডি-১ বা মূল সুরটি আসে। এর পরেই আসে মেলডি-২। টেকনিক্যালি, মেলডি-১ যদি বড় পর্দায় (Major Scale) থাকে, তবে মেলডি-২ সাধারণত তার পঞ্চম নোটে (Dominant Key) বা তার বিপরীত কোনো মুডে থাকে।
স্টেপ ২ (Harmonization): এই দুই মেলডির মাঝে একটি ‘ব্রিজ’ বা যোজক থাকে। এখানে হারমোনাইজেশন এমনভাবে করা হয় যেন শ্রোতা বুঝতে পারে সুরটি মূল ঘর থেকে অন্য কোথাও যাচ্ছে।
এখানে একটি অস্থিরতা বা ‘টেনশন’ তৈরি করা হয়, যা শ্রোতাকে পরবর্তী খণ্ডের জন্য ক্ষুধার্ত রাখে।
২. অন্তর্বর্তী প্রগ্রেশন: বিবর্তন ও জটিলতা (The Development)
এটি সিম্ফনির সবচেয়ে কারিগরি অংশ। এখানে সুরকার তার পাণ্ডিত্য দেখান।
স্টেপ ১ (Motif Fragmentation): সুরকার মূল মেলডিগুলোকে ছোট ছোট টুকরো বা মোটিফে (Motif) ভাগ করে ফেলেন।
স্টেপ ২ (Counterpoint & Layering): এই ছোট টুকরোগুলোকে অর্কেস্ট্রার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ধরুন, বেহালা মোটিফটি শুরু করল, তার ঠিক নিচ দিয়ে চেলো একটি কাউন্টার-মেলডি বাজানো শুরু করল। এভাবে অনেকগুলো সুরের স্তর বা লেয়ারিং তৈরি হয়।
স্টেপ ৩ (Modulation): এখানে হারমনি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। একে বলা হয় মডুলেশন। এটি শ্রোতার মনে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এটি সিম্ফনির সবচেয়ে জটিল অংশ (Technical Peak), যেখানে সুরের বুনন বা টেক্সচার অত্যন্ত ঘন হয়ে ওঠে।
৩. থিতু হওয়া এবং পরিবর্তন (The Slow Transition)
জটিলতার পর সুরকার শ্রোতাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে চান।
এখানে গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। অরকেস্ট্রেশন পরিবর্তন করে ভারী ব্রাস সেকশন থেকে সরিয়ে হালকা উডউইন্ডস (ফ্লুট বা ওবো) এ আনা হয়।
এখানে প্রধানত হোমোফোনিক টেক্সচার ব্যবহার করা হয়—অর্থাৎ একটি একক মেলডি প্রাধান্য পায় এবং বাকি যন্ত্রগুলো নিচু স্বরে তাকে সাপোর্ট দেয়। এটি মূলত প্রথম খণ্ডের উত্তেজনার পর একটি ‘ইমোশনাল রিলিজ’।
৪. ছন্দময় রূপান্তর (The Rhythmic Shift)
এখান থেকে সিম্ফনি আবার গতি পেতে শুরু করে, তবে এবার সেটি গম্ভীর নয়, বরং কিছুটা উৎসবমুখর।
প্রগ্রেশন: এখানে রিদম (Rhythm) বা তালের পরিবর্তন ঘটে। ৩/৪ তালের এই অংশে মেলডিগুলো খুব ছোট এবং পুনরাবৃত্তিমূলক (Repetitive) হয়।
কাউন্টার-মেলডি: এখানে বেহালা যখন নাচিয়ে সুর তোলে, তখন নিচ দিয়ে ড্রাম বা টিমপ্যানি একটি পাল্টা তাল (Counter-rhythm) তৈরি করে। এটি মূলত চতুর্থ খণ্ডের বিশাল বিস্ফোরণের জন্য শ্রোতাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
চূড়ান্ত পরিণতি: ফিনালে ও রেজোলিউশন (The Finale & Resolution)
এটি পুরো প্রগ্রেশনের শেষ ধাপ।
স্টেপ ১ (The Return): সিম্ফনির শুরুতে যে মেলডিগুলো আমরা শুনেছিলাম, সেগুলো আরও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসে। তবে এবার আর দ্বন্দ্ব থাকে না।
স্টেপ ২ (Coda/Grand Harmonization): সবশেষে আসে ‘কোডা’ (Coda)। এখানে সব বাদ্যযন্ত্র তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে একই হারমোনিক কর্ডে এসে থামে।
সব কাউন্টার-মেলডি এবং হারমনি মিলেমিশে একটি একক সুরে পরিণত হয়। একে বলা হয় রেজোলিউশন (Resolution)—অর্থাৎ সুরের সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাওয়া।
২. সিম্ফনির মূল উপাদানসমূহ
সিম্ফনি শোনার বা বোঝার সময় নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:
অর্কেস্ট্রেশন (Orchestration): শব্দের বর্ণিল বিন্যাস:
সিম্ফনি মূলত একটি বিশাল অর্কেস্ট্রার মিলিত কণ্ঠস্বর। এর সার্থকতা কেবল সুরের মাঝে নয়, বরং কোন যন্ত্র কোন সুরটি বাজাবে তার নিপুণ বণ্টনের ওপর নির্ভর করে। একটি আদর্শ অর্কেস্ট্রা চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত থাকে। স্ট্রিং সেকশন (ভায়োলিন, ভায়োলা, চেলো ও ডাবল বাস) সাধারণত সিম্ফনির মূল কাঠামো বা মেলডি বহন করে। উডউইন্ডস (ফ্লুট, ওবো, ক্লারিনেট) একক মেলডি বা লিরিক্যাল মাধুর্য যোগ করে। ব্রাস সেকশন (ট্রাম্পেট, ফ্রেঞ্চ হর্ন, ট্রোম্বোন) সুরের মধ্যে রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং শক্তি সঞ্চার করে। আর পারকাশন বা ঘাতযন্ত্র (টিমপ্যানি, ড্রামস) পুরো কম্পোজিশনের ছন্দময় ভিত্তি এবং নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স তৈরি করে। এই বিচিত্র যন্ত্রগোষ্ঠীর সম্মিলিত হারমোনাইজেশন একটি ত্রিমাত্রিক শব্দের টেক্সচার তৈরি করে, যাকে আমরা ‘সিম্ফনিক সাউন্ড’ বলি।
উন্নয়ন (Development) ও মোটিফ: সুরের বিবর্তন:
সিম্ফনি কোনো বিচ্ছিন্ন সুরের সমষ্টি নয়, বরং একটি গাণিতিক ও সৃজনশীল প্রগতি। এর প্রাণভোমরা হলো মোটিফ (Motif)—যা একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সুরের কণা (যেমন বিটোফেনের ৫ম সিম্ফনির বিখ্যাত চারটি নোট)। সুরকার এই ক্ষুদ্র মোটিফটিকেই মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে পুরো ১০-১৫ মিনিটের একটি দীর্ঘ অধ্যায় বা ‘মুভমেন্ট’ গড়ে তোলেন। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ডেভেলপমেন্ট। এখানে সুরকার মোটিফটিকে ভেঙে চুরমার করেন, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তা ছড়িয়ে দেন, কাউন্টারপয়েন্ট টেকনিকের মাধ্যমে একটির ওপর আরেকটি সুরের স্তর তৈরি করেন এবং ক্রমাগত মডুলেশন বা স্কেল পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রোতার মনে উত্তেজনা ধরে রাখেন। একটি সাধারণ বীজ থেকে যেমন বিশাল মহীরুহ জন্মায়, একটি ক্ষুদ্র মোটিফ থেকেও তেমনি সিম্ফনির বিশাল কাঠামো গড়ে ওঠে।
কন্ডাক্টর (Conductor): সুরের অদৃশ্য স্থপতি:
শত শত বাদ্যযন্ত্রের এই বিশাল সমুদ্রকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন কন্ডাক্টর। তার কাজ কেবল লাঠি নাড়ানো নয়, বরং পুরো অর্কেস্ট্রার ডাইনামিক্স (Dynamics) বা শব্দের তীব্রতা এবং টেম্পো (Tempo) বা সুরের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি নিশ্চিত করেন যেন ভায়োলিনের সুর ব্রাস সেকশনের শব্দের তলায় চাপা না পড়ে এবং প্রতিটি যন্ত্র যেন সঠিক সময়ে (Precision) তাদের সুর বা কাউন্টার-মেলডি শুরু করে। সুরকারের লেখা নীরব স্বরলিপিকে (Score) জীবন্ত সংগীতে রূপান্তর করার গুরুভার তার ওপর থাকে। একজন দক্ষ কন্ডাক্টর প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পুরো সিম্ফনিকে একটি নির্দিষ্ট আবেগীয় পরিণতির দিকে নিয়ে যান।
৩. সিম্ফনির বিবর্তন
সিম্ফনি সময়ের সাথে সাথে নিজের রূপ বদলেছে:
| বৈশিষ্ট্য | ধ্রুপদী যুগ (Classical) | রোমান্টিক যুগ (Romantic) |
| দৈর্ঘ্য | সাধারণত ২০-৪০ মিনিট। | ১ ঘণ্টা বা তারও বেশি হতে পারে। |
| যন্ত্রের সংখ্যা | ৩০-৫০ জন বাদক। | ১০০ জনের বেশি বাদকের বিশাল অর্কেস্ট্রা। |
| উদ্দেশ্য | কাঠামো এবং সুশৃঙ্খল সুর। | তীব্র আবেগ, গল্প বলা বা চিত্রায়ন। |
| উদাহরণ | মোৎসার্টের ৪০তম সিম্ফনি। | মাহলারের ২য় বা চাইকোভস্কির ৬ষ্ঠ সিম্ফনি। |
৪. কিছু মাইলফলক সিম্ফনি:
এই সিম্ফনিগুলো প্রথাগত ব্যাকরণকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। বিটোফেন এনেছিলেন কন্ঠস্বর ও তীব্রতা, আর বার্লিওজ যুক্ত করেছিলেন গল্প। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলোই আধুনিক পশ্চিমা সঙ্গীতের পথ প্রশস্ত করেছে।
১. লুদভিগ ফন বিটোফেন: ৫ম সিম্ফনি (সিম্ফনি অব ডেসটিনি) বিটোফেনের এই সৃষ্টিটি সিম্ফনির ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘মোটিফ’ (Motif) ব্যবহারের উদাহরণ। এর শুরুর সেই বিখ্যাত চারটি নোট (দা-দা-দা-দাম) কেবল একটি সুর নয়, বরং পুরো ৪টি মুভমেন্টের একটি গাণিতিক ভিত্তি।
বিটোফেন এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি ক্ষুদ্র তিন-নোটের ছন্দকে পুরো সিম্ফনির প্রতিটি লেয়ারে ডেভেলপমেন্ট করা যায়। এটি প্রথম সিম্ফনিগুলোর একটি যেখানে অর্কেস্ট্রাতে ‘পিকলো’ (Piccolo) এবং ‘ট্রোম্বোন’ (Trombone) ব্যবহার করে শব্দের তীব্রতা বা ডাইনামিক্স-কে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটি ধ্রুপদী যুগের শৃঙ্খলা থেকে রোমান্টিক যুগের আবেগের দিকে যাত্রার এক চূড়ান্ত নিদর্শন।
২. লুদভিগ ফন বিটোফেন: ৯ম সিম্ফনি (দ্য কোরাল সিম্ফনি) ১৮২৪ সালে পরিবেশিত এই সিম্ফনিটি ছিল তৎকালীন সঙ্গীত জগতের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। এটি প্রথাগত ‘ইনস্ট্রুমেন্টাল’ সিম্ফনির সীমানা ভেঙে দেয়।
এটি পৃথিবীর প্রথম ‘কোরাল সিম্ফনি’, যেখানে চতুর্থ মুভমেন্টে সুরকার অর্কেস্ট্রার বিশাল শব্দের সাথে চারজন একক কণ্ঠশিল্পী এবং একটি বিশাল সমবেত গায়কদল বা কয়ার (Choir) যুক্ত করেন। ফ্রেডরিখ শিলারের ‘ওড টু জয়’ (Ode to Joy) কবিতার সুরারোপিত এই অংশটি সিম্ফনির কাঠামোকে দীর্ঘায়িত ও মহিমান্বিত করে তোলে। এর মাধ্যমে বিটোফেন প্রমাণ করেন যে, সিম্ফনি কেবল বাদ্যযন্ত্রের খেলা নয়, এটি মানুষের কণ্ঠস্বরকেও একটি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
৩. হেক্টর বার্লিওজ: সিম্ফনি ফ্যান্টাস্টিক (Symphonie Fantastique) ১৮৩০ সালে রচিত এই সিম্ফনিটি ‘প্রোগ্রাম মিউজিক’ (Program Music) এর ধারায় এক অবিস্মরণীয় সংযোজন। এটি কোনো বিমূর্ত সুর নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গল্প বা আখ্যান বর্ণনা করে।
বার্লিওজ এখানে ‘ইদে ফিক্স’ (Idée fixe) নামক একটি নতুন ধারণা প্রবর্তন করেন। এটি এমন একটি নির্দিষ্ট মেলডি যা পুরো সিম্ফনি জুড়ে গল্পের প্রধান চরিত্রের মতো বারবার ফিরে আসে, তবে প্রতিটি মুভমেন্টে এর হারমোনাইজেশন এবং অরকেস্ট্রেশন পরিবর্তিত হয় (চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝাতে)। এক আফিমসেবী শিল্পীর হ্যালুসিনেশন বা দুঃস্বপ্নকে কেন্দ্র করে রচিত এই সিম্ফনিতে অর্কেস্ট্রাকে একটি গল্প বলার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
৪. জোসেফ হেইডন: সিম্ফনি নং ৯৪ (সারপ্রাইজ সিম্ফনি) হেইডনকে বলা হয় ‘সিম্ফনির জনক’, কারণ তিনি এই জনরার কাঠামো চূড়ান্ত করেছিলেন। তবে তার ৯৪তম সিম্ফনিটি তার রসবোধ এবং ডাইনামিক্সের কারিশমার জন্য বিখ্যাত।
এই সিম্ফনির দ্বিতীয় মুভমেন্টে অত্যন্ত ধীর এবং নিচু সুরের (Pianissimo) মাঝে হঠাৎ করে পুরো অর্কেস্ট্রার একটি তীব্র ও জোরালো শব্দ (Fortissimo) ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত করা হয়েছিল তন্দ্রাচ্ছন্ন শ্রোতাদের চমকে দেওয়ার জন্য। এর মাধ্যমে হেইডন দেখিয়েছেন কীভাবে ডাইনামিক্স বা শব্দের উচ্চতা পরিবর্তন করে সঙ্গীতের মেজাজ মুহূর্তেই বদলে দেওয়া যায়।
৫. উলফগ্যাং আমাদেউস মোৎসার্ট: সিম্ফনি নং ৪১ (জুপিটার) : এটি মোৎসার্টের শেষ এবং সবচেয়ে জটিল সিম্ফনি। একে বলা হয় ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল যুগের গাণিতিক পূর্ণতা।
এর চতুর্থ মুভমেন্টে মোৎসার্ট পাঁচটি আলাদা মেলডি বা সুরকে ‘কাউন্টারপয়েন্ট’ এবং ‘ফিউগ’ (Fugue) টেকনিকে এমনভাবে বুনেছেন যা মিউজিক থিওরির ইতিহাসে বিস্ময় হিসেবে দেখা হয়। এটি দেখায় কীভাবে পাঁচটি স্বাধীন সুর তাত্ত্বিকভাবে সঠিক থেকে একত্রে এক মহিমান্বিত ঐকতান তৈরি করতে পারে।
৬. আন্তোনিন ডভোরজাক: সিম্ফনি নং ৯ (ফ্রম দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড): চেক সুরকার ডভোরজাক যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন তিনি সেখানকার স্থানীয় লোকজ সুর এবং আফ্রিকান-আমেরিকান স্পিরিচুয়াল মিউজিক দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এটি রচনা করেন।
এটি ন্যাশনালিজম ইন মিউজিক-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি লোকজ সুরকে সিম্ফনির কঠোর কাঠামোর মধ্যে ইনজেক্ট করেছেন। এর দ্বিতীয় মুভমেন্টের ‘ইংলিশ হর্ন’-এর একক সুরটি (মেলডি) সিম্ফনির ইতিহাসে অন্যতম করুণ ও জনপ্রিয় সুর হিসেবে স্বীকৃত।
৭. ইয়োহানেস ব্রামস: সিম্ফনি নং ৪: ব্রামসকে বলা হয় ‘রক্ষণশীল বিপ্লবী’। তিনি পুরনো বারোক যুগের কঠোর গণিত এবং রোমান্টিক যুগের তীব্র আবেগের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।
এর শেষ মুভমেন্টটি একটি ‘পাসাকাগ্লিয়া’ (Passacaglia)। এটি একটি প্রাচীন টেকনিক যেখানে একটি নির্দিষ্ট আট-নোটের বেস লাইন বা হারমোনিক প্রগ্রেশন পুরো সময় ধরে বারবার বাজতে থাকে এবং তার ওপর ৩০টি ভিন্ন ভিন্ন ভেরিয়েশন বা সুর তৈরি করা হয়। এটি সুরকার হিসেবে ব্রামসের চূড়ান্ত কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ।
৮. গুস্তাভ মাহলার: সিম্ফনি নং ২ (রিসারেকশন) : মাহলার সিম্ফনিকে কেবল সঙ্গীত নয়, বরং ‘একটি মহাবিশ্ব’ হিসেবে দেখতেন। তার সিম্ফনিগুলো দৈর্ঘ্যে এবং যন্ত্রের সংখ্যায় ছিল বিশাল।
এই সিম্ফনিটি প্রায় ৯০ মিনিট দীর্ঘ। এতে বিশাল অর্কেস্ট্রার পাশাপাশি মানুষের কণ্ঠ (Solo & Choir) এবং মঞ্চের বাইরে (Off-stage) ব্রাস সেকশন ব্যবহৃত হয়। এটি শ্রোতাকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার অভিজ্ঞতা দেয়। মাহলারের অরকেস্ট্রেশন এতটাই ডিটেইলড যে তিনি একেকটি যন্ত্রের মেজাজ পরিবর্তনের জন্য আলাদা আলাদা নির্দেশিকা ব্যবহার করতেন।
সাধারণত সিম্ফনি ৪ মুভমেন্টের হলেও, শুবার্টের এই ২ মুভমেন্টের সৃষ্টিটি মেলডি এবং হারমোনির দিক থেকে এতই নিখুঁত ছিল যে একে অসম্পূর্ণ মনে করা হয় না। এটি রোমান্টিক যুগের লিরিকিজম বা কাব্যিক সুরের চূড়ান্ত উদাহরণ।
১০. পিয়োতর ইলিচ চাইকোভস্কি: সিম্ফনি নং ৬ (প্যাথেটিক): চাইকোভস্কি তার জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো এই সিম্ফনিতে ঢেলে দিয়েছিলেন।
প্রথাগত সিম্ফনি যেখানে দ্রুত লয়ে (Fast Finale) শেষ হয়, চাইকোভস্কি সেখানে একটি অত্যন্ত ধীর এবং বিষণ্ণ মুভমেন্ট (Adagio lamentoso) দিয়ে এটি শেষ করেন। এর ডাইনামিক্স (খুব নিচু স্বর থেকে হঠাৎ তীব্র চিৎকার) শ্রোতার মনে এক ধরণের হাহাকার তৈরি করে। এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণাকে সুরে রূপ দেওয়ার এক অসামান্য দলিল।
১১. ইগর স্ট্রাভিনস্কি: সিম্ফনি অফ সামস (Symphony of Psalms) : বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সুরকার স্ট্রাভিনস্কি সিম্ফনির প্রথাগত রোমান্টিক আবেগ বর্জন করে একে একটি যান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক রূপে নিয়ে যান।
তিনি অর্কেস্ট্রা থেকে ভায়োলিন এবং ভায়োলা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। পরিবর্তে দুটি পিয়ানো এবং ভারী উইন্ড সেকশন ব্যবহার করেছিলেন। এটি আধুনিক বা নিও-ক্লাসিক্যাল সিম্ফনির এক অনন্য উদাহরণ যেখানে তাল এবং মিটারের (Rhythm) জটিল ব্যবহার প্রধান হয়ে ওঠে।
আরও দিন: