রাগ মধুবন্তী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ মধুবন্তী উচ্চাঙ্গ সংগীতের একটি অত্যন্ত মেলোডিয়াস বা শ্রুতিমধুর রাগ। এর চলন এবং স্বরবিন্যাস শ্রোতার মনে এক ধরণের মিষ্টি অথচ গভীর আবেশ তৈরি করে।

রাগ মধুবন্তী

রাগ মধুবন্তী: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ মধুবন্তী (Madhuvanti) একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক রাগ। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীতের ‘ধর্মবতী’ রাগের হিন্দুস্তানি সংস্করণ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ এবং ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেবের মতো গুণী শিল্পীদের মাধ্যমে এই রাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর নামের সার্থকতা—’মধু’ মানে মিষ্টি। এটি একটি রোমান্টিক এবং ভক্তি রসাত্মক রাগ। এই রাগে তোড়ি ঠাটের মতো কড়ি মধ্যম এবং কোমল গান্ধার থাকলেও, এতে শুদ্ধ ঋষভ এবং শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়। এই স্বর বিন্যাস রাগটিকে একটি স্বতন্ত্র উজ্জ্বলতা ও মাধুর্য দান করে। এটি মূলত বিকেলের রাগ, যা পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণতাকে ছাপিয়ে এক ধরণের শান্ত ও রোমান্টিক আবহ তৈরি করে।

রাগের শাস্ত্র

রাগ মধুবন্তীর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রচলিত ঠাটের পূর্ণাঙ্গ রূপ নয়, তবে একে ‘তোড়ি’ ঠাটের একটি প্রকারভেদ বা ‘মুলতানি’ রাগের শুদ্ধ ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (অনেকে একে ‘কাফি’ ঠাটের বিকৃতিও বলেন)।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: নি সা গ্‌ ম্ প নি সঁ (এখানে গ্‌—কোমল, ম্—কড়ি। আরোহে রে ও ধ বর্জিত)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ প ম্ গ্‌ রে সা (এখানে নি, ধ, রে—শুদ্ধ; গ্‌—কোমল এবং ম্—কড়ি)।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), ধৈবত (ধ) ও নিষাদ (নি) হলো শুদ্ধ; গান্ধার (গ) হলো কোমল এবং মধ্যম (ম) হলো কড়ি বা তীব্র।
  • সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা অপরাহ্ণ (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা)।
  • প্রকৃতি: শৃঙ্গার (রোমান্টিক), ভক্তি এবং শান্ত রস প্রধান।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

মধুবন্তী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ মুলতানি: মুলতানির আরোহ ও অবরোহ মধুবন্তীর মতোই, কিন্তু মুলতানিতে ঋষভ ও ধৈবত কোমল ব্যবহৃত হয়, যা মধুবন্তীতে শুদ্ধ।
  • রাগ তোড়ি: তোড়ি এবং মধুবন্তীর মধ্যে কড়ি মধ্যম ও কোমল গান্ধারের মিল থাকলেও তোড়িতে ঋষভ ও ধৈবত কোমল এবং এটি ভোরের রাগ।
  • রাগ পতদীপ: পতদীপে শুদ্ধ মধ্যম ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মধুবন্তীতে কড়ি মধ্যম ব্যবহৃত হয়—এটিই এদের প্রধান পার্থক্য।
  • রাগ ভীমপলশ্রী: ভীমপলশ্রীতে শুদ্ধ মধ্যম ও কোমল নিষাদ থাকে, অন্যদিকে মধুবন্তীতে কড়ি মধ্যম ও শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়।

রাগ মধুবন্তী তার বৈচিত্র্যময় স্বর প্রক্ষেপণের মাধ্যমে বিরহ এবং মিলনের এক অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করে। কড়ি মধ্যমের তীক্ষ্ণতা এবং শুদ্ধ ধৈবতের মাধুর্য এই রাগকে অনন্য করে তুলেছে। এটি গায়ক ও বাদক উভয়ের জন্যই সৃজনশীলতার এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করে। বিকেলের শান্ত পরিবেশে মধুবন্তীর সুর শুনলে চিত্তে যে প্রশান্তি ও রোমান্টিকতার সৃষ্টি হয়, তা অতুলনীয়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রসারে মধুবন্তীর গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

২. ভারতীয় সংগীতের রাগ অভিধান — এ. এন. সান্যাল।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

৪. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সংগীত বিভাগের উচ্চাঙ্গ সংগীত পাঠ্যক্রম।

আরও দেখুন: