রাগ তিলং হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত মধুর, চপল এবং জনপ্রিয় রাগ। এর সরল স্বরবিন্যাস এবং শ্রুতিমধুর চলনের কারণে এটি কেবল ধ্রুপদী সংগীত নয়, বরং ঠুমরি, দাদরা, ভজন এবং গজল গায়নেও প্রচুর ব্যবহৃত হয়।
রাগ তিলং
রাগ তিলং: পরিচয় ও বিশেষত্ব
রাগ তিলং (Tilang) খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এটি মূলত শৃঙ্গার (রোমান্টিক) এবং ভক্তি রসের সমন্বয়ে গঠিত। এই রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহে নিষাদ (নি) স্বরের প্রয়োগ। আরোহের সময় এতে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয় এবং অবরোহের সময় কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়। এই পরিবর্তনের ফলেই রাগটিতে এক ধরণের বৈচিত্র্যময় মাধুর্য তৈরি হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, তিলং একটি লোকজ সুর থেকে বিবর্তিত হয়ে শাস্ত্রীয় রূপ লাভ করেছে। এটি খুব বেশি গম্ভীর বা ভারী রাগ নয়, বরং এর মেজাজ বেশ হালকা এবং আনন্দময়। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীতেও একই নামে এই রাগের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতেও রাগ তিলং-এর ছায়ায় অনেক বিখ্যাত গান রচিত হয়েছে।
রাগের শাস্ত্র
রাগ তিলং-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: খাম্বাজ।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা গ ম প নি সঁ (এখানে ‘গ’ ও ‘নি’ শুদ্ধ)।
- অবরোহ: সঁ নি প ম গ সা (এখানে ‘নি’ কোমল এবং ‘গ’ শুদ্ধ)।
- বাদী স্বর: গান্ধার (গ)।
- সমবাদী স্বর: নিষাদ (নি)।
- বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: আরোহে শুদ্ধ নিষাদ (নি) এবং অবরোহে কোমল নিষাদ (নি) ব্যবহৃত হয়। গান্ধার (গ) সবসময় শুদ্ধ। বাকি স্বরগুলোও শুদ্ধ।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: চপল, মধুর এবং রোমান্টিক।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
তিলং রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ যোগ: যোগ রাগের আরোহ তিলং-এর মতো হলেও এর অবরোহে কোমল গান্ধার ব্যবহৃত হয়, যা তিলং-এ নেই।
- রাগ খাম্বাজ: খাম্বাজ ঠাটের মূল রাগ হওয়ার কারণে স্বরগত মিল থাকলেও খাম্বাজে সাতটি স্বরই (সম্পূর্ণ জাতি) ব্যবহৃত হয়।
- রাগ কাফি: কিছু তানের কাজের সময় তিলং-এর সাথে কাফির সাদৃশ্য পাওয়া যেতে পারে যদি কোমল গান্ধার স্পর্শ করা হয় (যা মূলত মিশ্র তিলং-এ ঘটে)।
- রাগ জলিণী: এটি তিলং-এর একটি বিরল প্রকারভেদ যেখানে স্বর প্রয়োগের সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে।
রাগ তিলং তার সরলতা এবং আবেদনময় সুরের জন্য সংগীত শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ঋষভ ও ধৈবত বর্জিত হওয়ার কারণে এর চলন অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং প্রাঞ্জল। শুদ্ধ ও কোমল নিষাদের খেলা এই রাগকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। এটি এমন একটি রাগ যা খুব সহজেই শ্রোতার মনে প্রশান্তি এবং আনন্দের সঞ্চার করতে পারে। শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে তিলং-এর একটি ছোট পরিবেশনাও পুরো পরিবেশকে স্নিগ্ধ ও সজীব করে তোলার ক্ষমতা রাখে।
তথ্যসূত্র (Sources)
নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:
১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ২) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।
৪. ভারতকোষ (সংগীত বিভাগ) — বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।
আরও দেখুন: