বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত সকল চুক্তি । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠের একটা চেনা কৌশল খেয়াল করলে দেখবেন—একটা নির্দিষ্ট মহলের কাছে ‘ভারত বিরোধিতা’ শব্দটা বরাবরই এক মোক্ষম রাজনৈতিক পুঁজি। বিশেষ করে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ডানপন্থী দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আর স্রেফ সস্তা সেন্টিমেন্ট খাটিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এই ভারতবিরোধী কার্ডটিকে সবসময় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।

এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় চালবাজিটা হলো—বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা সমঝোতা হলেই তা নিয়ে অন্ধের মতো নেতিবাচক অপপ্রচার শুরু করা। সাধারণ মানুষের মনের খাঁটি দেশপ্রেমকে পুঁজি করে তারা এমন এক ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করে, যেন মনে হয় এই বুঝি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব শেষ হয়ে গেল!

কিন্তু সত্যি বলতে, বাস্তব চিত্রটা কিন্তু এর উল্টো। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে যাঁরা এই চুক্তিগুলোকে ঢালাওভাবে ‘গোলামি চুক্তি’ বা ‘অসম চুক্তি’ বলে মুখে ফেনা তোলেন, তাঁরা কিন্তু কখনোই চুক্তির মূল কপি বা দালিলিক সত্যটা সাধারণ মানুষের সামনে আনেন না। আমার স্পষ্ট চাওয়া—যাঁরা এই ধরণের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হন বা আসলেই সত্যটা জানতে আগ্রহী, তাঁরা অন্তত একবার নিজ দায়িত্বে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে হওয়া চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর (MoU) মূল পাঠ নিজে পড়ে দেখুন।

একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, এই চুক্তিগুলোর প্রতিটিই সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিতে তৈরি। যারা দিন-রাত এগুলো নিয়ে মিথ্যাচার করছে, তাদের অধিকাংশ দাবি যে কেবল ভিত্তিহীন নয়—বরং ডাহা মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা এই চুক্তিগুলো নিজে চোখে বিশ্লেষণ করলেই সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। অন্ধ বিশ্বাস বা সস্তা গুজবে কান না দিয়ে, দেশের প্রতিজন মানুষের উচিত এসব চুক্তির প্রকৃত তথ্য আর দালিলিক প্রমাণগুলো অন্তত একবার নিজে যাচাই করে নেওয়া।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২) বা ইন্দিরা মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২) বা ইন্দিরা মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত সকল চুক্তি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার (১৯৭২ – ১৯৭৫)

 

জিয়াউর রহমান সরকার (১৯৭৭ – ১৯৮১)

  • গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি (৫ বছর মেয়াদী): ৫ নভেম্বর, ১৯৭৭।
  • সরাসরি রেল যোগাযোগ সংক্রান্ত সমঝোতা: ১৮ মে, ১৯৭৮।
  • কৃষি গবেষণা ও সহযোগিতা সমঝোতা: ৪ জুলাই, ১৯৭৯।
  • অভ্যন্তরীণ জলপথ ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকল (নবায়ন): ৪ অক্টোবর, ১৯৮০।

 

এইচ এম এরশাদ সরকার (১৯৮২ – ১৯৯০)

  • তিনবিঘা করিডোর লিজ সংক্রান্ত চুক্তি: ৭ অক্টোবর, ১৯৮২।
  • মাদক ও সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ চুক্তি: ৮ মে, ১৯৯০।

 

আওয়ামী লীগ সরকার (১৯৯৬ – ২০০১)

  • ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি (৩০ বছর মেয়াদী): ১২ ডিসেম্বর, ১৯৯৬।
  • বাস সেবা সংক্রান্ত চুক্তি (ঢাকা-কলকাতা): ১৭ জুন, ১৯৯৯।

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৭ – ২০০৮)

  • যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল সমঝোতা (মৈত্রী এক্সপ্রেস): ১০ এপ্রিল, ২০০৮।

 

আওয়ামী লীগ সরকার (২০০৯ – ২০২৪)

  • বিদ্যুৎ খাত সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা: ১১ জানুয়ারি, ২০১০।
  • আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর ব্যবহার প্রটোকল: ২৭ মার্চ, ২০১০। (ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য ট্রানজিট সুবিধা)।
  • সীমান্ত হাট (Border Haat) স্থাপন চুক্তি: ২৩ অক্টোবর, ২০১০।
  • সুন্দরবন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সমঝোতা: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১১।
  • তীরবর্তী নদীসমূহে মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১১।
  • বিএসএফ-বিজিবি সমন্বয় প্রটোকল (CBMP): ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১১। (সীমান্ত হত্যা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ)।
  • প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty): ২৮ জানুয়ারি, ২০১৩।
  • সংশোধিত ভ্রমণ ব্যবস্থা (Revised Travel Arrangement): ২৮ জানুয়ারি, ২০১৩।
  • স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন (LBA Implementation): ৬ জুন, ২০১৫। (ছিটমহল সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান)।
  • উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি (Coastal Shipping Agreement): ৬ জুন, ২০১৫।
  • মাদক পাচার রোধে নতুন ও আধুনিক চুক্তি: ৬ জুন, ২০১৫।
  • ব্লু ইকোনমি ও সামুদ্রিক সহযোগিতা: ৬ জুন, ২০১৫।
  • শান্তিপূর্ণ মহাকাশ গবেষণা ও ব্যবহার: ৮ এপ্রিল, ২০১৭।
  • পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের রূপরেখা: ৮ এপ্রিল, ২০১৭।
  • প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখা: ৮ এপ্রিল, ২০১৭।
  • ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ডিজেল পাইপলাইন চুক্তি: ৯ এপ্রিল, ২০১৮। (সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানির জন্য)।
  • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা: ১ জুন, ২০১৮।
  • চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার চুক্তি: ২৫ অক্টোবর, ২০১৮।
  • কুশিয়ারা নদীর পানি উত্তোলন সংক্রান্ত সমঝোতা: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২।
  • বাংলাদেশ রেলওয়ে আধুনিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ সমঝোতা: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২।
  • ডিজিটাল পার্টনারশিপ (Shared Vision): ২২ জুন, ২০২৪।
  • গ্রিন পার্টনারশিপ (Shared Vision): ২২ জুন, ২০২৪।
  • সামুদ্রিক অর্থনীতি ও নৌ-সহযোগিতা (নবায়ন): ২২ জুন, ২০২৪।
  • রেল ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি সংক্রান্ত নতুন সমঝোতা: ২২ জুন, ২০২৪।
  • বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে যৌথ গবেষণা: ২২ জুন, ২০২৪।
  • ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম (UPI-Taka Pay): ২২ জুন, ২০২৪।
  • ইনস্পেস (IN-SPACe) ও ডাক-টেলিযোগাযোগ সমঝোতা: ২২ জুন, ২০২৪।
  • যৌথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সহযোগিতা: ২২ জুন, ২০২৪।

 

১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ‘ডিজিটাল ও গ্রিন পার্টনারশিপ’—ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গ্রাফটা খেয়াল করলে এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় বিবর্তন চোখে পড়ে। শুরুতে এই সম্পর্কের মূল ফোকাসটা ছিল কেবল নিরাপত্তা ও সীমান্ত কেন্দ্রিক; মাঝপথে তা গড়িয়েছে পানি বণ্টন ও স্থল সীমান্ত বিরোধ মীমাংসার মতো অত্যন্ত জটিল আইনি পথে। আর বর্তমানে এই সম্পর্ক স্রেফ প্রথাগত কূটনীতিতে আটকে নেই, এটি এখন ডিজিটাল কানেক্টিভিটি, হাই-টেক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির (Blue Economy) এক আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে।

এখানে একটা বিষয় সবার খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার—আমাদের রাজনৈতিক অপপ্রচারকারীরা প্রায়শই ‘চুক্তি’ (Treaty) এবং ‘সমঝোতা স্মারক’ (MoU)-এর সংখ্যার মারপ্যাঁচে ফেলে সাধারণ মানুষকে চরম বিভ্রান্ত করতে চায়। বিভিন্ন সময় আপনারা গণমাধ্যমে শুনবেন যে, ভারতের সাথে নাকি বাংলাদেশের প্রায় ৯৩টি বা তারও বেশি নথি সই হয়েছে! এই বিশাল সংখ্যার আড়ালে আসল সত্যটা কী জানেন? এর সিংহভাগই মূলত স্রেফ নিয়মিত প্রশাসনিক প্রটোকল, কারিগরি সমঝোতা কিংবা আগের কোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর নবায়ন মাত্র। এই বিশাল সংখ্যার পাহাড় দেখিয়ে ভয় দেখানোর কোনো সুযোগ নেই; এখানে মূল বা কৌশলগত পলিসি চুক্তির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত—যার প্রধান ৪৫টি নথি নিয়েই ওপরে আলোচনা করা হয়েছে। আর এই প্রধান চুক্তিগুলোর প্রতিটিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থকে শতভাগ সমুন্নত রেখেই করা হয়েছে।

সুতরাং, যাঁরা নিজেদের ‘রাজনৈতিক স্বার্থে’ এই বিষয়গুলোকে সবসময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন, তাঁদের সস্তা প্রচারণার বিপরীতে আসল দালিলিক সত্যটি হলো—এই প্রতিটি পদক্ষেপই একটি স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার জন্য অপরিহার্য অংশ। এই দীর্ঘ তালিকায় থাকা প্রতিটি নথি যদি আপনি নিজে বিশ্লেষণ করেন, তবে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাজপথ গরম করা অধিকাংশ অপপ্রচারই স্রেফ ভিত্তিহীন মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই ঐতিহাসিক বিবর্তনকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।