মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ যে কারণে ইসলামিক শরিয়াহ বিরোধী | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

এই লেখাটি আমি প্রধানত তাঁদের উদ্দেশ্যে লিখছি যাঁরা ‘তাকলিদ’ বা অন্ধ অনুকরণের নীতিতে পুরোপুরি বিশ্বাসী। অর্থাৎ, সহজ কথায় যাঁরা মনে করেন পবিত্র কুরআন, হাদিস আর ইজমায় যা কিছু যেভাবে সুনির্দিষ্ট করা আছে, তার প্রতিটি বিধানকে আজীবন হুবহু মেনেই চলতে হবে—সেখানে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন, পরিমার্জন বা আধুনিকীকরণ করা যাবে না। স্থান, কাল কিংবা পাত্র যাই হোক না কেন, শরিয়াহর সেই প্রাচীন ও চিরন্তন রূপটিই তাঁদের কাছে একমাত্র ধ্রুব সত্য ও গ্রহণযোগ্য।

বলে রাখা ভালো, এই লেখাটি কিন্তু তথাকথিত “আহলে চয়েস” বা সুবিধাবাদী মুসলিমদের জন্য লেখা নয়; যাঁরা নিজেদের আখের গোছাতে সুবিধা অনুযায়ী কুরআন-হাদিসের কিছু অংশ মানেন, আর স্বার্থে আঘাত লাগলে তা কৌশলে এড়িয়ে যান। এমনকি আমার মতো যাঁরা মনে করেন—যুগের তাগিদে এবং সমাজের প্রয়োজনে ধর্মীয় আইনি নিয়মের কিছু কিছু সংশোধন প্রয়োজন, এই লেখাটি তাঁদের জন্যও নয়।

Table of Contents

মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ যে কারণে ইসলামিক শরিয়াহ বিরোধী

যাঁরা যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্বীনের আইনি বদলগুলোকে সানন্দে মেনে নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। তবে আমার বিস্ময়ের জায়গাটা একদম অন্যখানে। যাঁরা মুখে দাবি করেন যে শরিয়াহর আইনগত পরিবর্তনকে তাঁরা তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি অস্বীকার করেন, তাঁদের তো কোনোভাবেই ১৯৬১ সালের এই ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ মুখ বুজে মেনে নেওয়ার কথা ছিল না। অথচ রুক্ষ বাস্তবতা হলো, তাঁরা দিনের পর দিন এটি দিব্যি হজম করে নিয়েছেন এবং এই আইনটি নিয়ে এখন আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্যই করেন না! এর চেয়েও অনেক সস্তা বা তুচ্ছ ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে তাঁরা যেভাবে মাঠ গরম করেন, রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন—এত বড় একটা মৌলিক বিষয়ে তাঁদের সেই জোরালো প্রতিবাদের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। মূলত তাঁদের এই রহস্যময় নীরবতা আর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামিটাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই আমার এই লেখা।

আমার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন হচ্ছে—মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ যদি প্রচলিত ইসলামিক শরিয়াহর এত বড় লঙ্ঘন আর সরাসরি ‘শরিয়াহবিরোধী’ হয়েই থাকে, তবে ইসলামের এই প্রকাশ্য অবমাননার বিরুদ্ধে আপনারা কোনো ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক বা আইনি লড়াই করে এটি বদলানোর চেষ্টা করছেন না কেন? এত বড় একটা মৌলিক ইস্যু চোখের সামনে জ্বলজ্বল করার পরও, আপনারা কেন সেসব এড়িয়ে কেবলই সমাজ বা রাজনীতির একদম প্রান্তিক ও ফালতু বিষয়গুলো নিয়ে সস্তা আন্দোলন করে স্রেফ সময় পার করছেন? এই ভণ্ডামির জবাব কে দেবে?

১. ক্ষমতার সমীকরণ: বন্দুকের নলের সামনে আত্মসমর্পণ বনাম গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে বসা

ইতিহাস আর চারপাশের রূঢ় বাস্তবতাকে যদি আমরা একদম নির্মোহ চোখে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে আমাদের সমাজের তথাকথিত ‘শরিয়াহর অতন্দ্র প্রহরী’ দাবিদারদের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামি আর সুবিধাবাদের কুৎসিত রূপটা চোখের সামনে উন্মোচিত হয়।

১৯৬১ সালের এই বহুল আলোচিত ‘মুসলিম পারিবারিক আইনটি’ যখন পাস হয়েছিল, তখন কিন্তু পাকিস্তানের মসনদে কোনো নির্বাচিত বা গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না। ক্ষমতায় ছিলেন কট্টর সামরিক আইন প্রশাসক ও স্বৈরাচারী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। আইয়ুব খান কোনো রকম আলোচনা, সংসদীয় বিতর্ক কিংবা হুজুর-ওলামাদের সাথে কোনো আপস-মিমাংসার ধার ধারেননি। তিনি স্রেফ সামরিক ডিক্রি জারি করে, বুটের তলা দিয়ে প্রথাগত আলেমদের সমস্ত ফতোয়া আর তথাকথিত ধর্মীয় অনুভূতিকে এক ঝটকায় পিষে ফেলে এই অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন।

সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় এবং মজার বিষয় হলো—যে আলেম সমাজ ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ‘আল্লাহর আইনের একমাত্র ইজারাদার’ বলে দাবি করেন, তাঁরা আইয়ুব খানের সেই তপ্ত বন্দুকের নলের সামনে একটা টু শব্দ করারও সাহস পাননি! সামরিক জান্তার কঠোর চাবুক, জেল-জুলুম আর চড়া শাস্তির ভয়ে তাঁরা একদম সুবোধ বালকের মতো এই ‘লা-শরিয়তি’ আইনকে মুখ বুজে হজম করে নিয়েছিলেন। আজ দীর্ঘ ছয়টি দশক পার হয়ে গেলেও পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—কোনো দেশের কট্টরপন্থী ওলামা বা নামধারী ইসলামী দলগুলো এই আইন সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে রাজপথে কোনো গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, আর তা তোলার সাহসও দেখায়নি।

অথচ, এই একই গোষ্ঠীর চরিত্র মলাটের মতো সম্পূর্ণ বদলে যায় যখন কোনো ‘সফট’, উদারপন্থী বা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকে। যেহেতু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কম-বেশি নাগরিক অধিকার থাকে, মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকে এবং সরকার কথায় কথায় দমনপীড়ন না করে আলোচনার পথ বেছে নেয়—ঠিক তখনই এই মৌলভিরা সরকারের সেই ভদ্রতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর আইনি নমনীয়তাকে ব্ল্যাকমেইল করার পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। তারা তখন সরকারের ঘাড়ে চড়ে বসে!

তখন সামান্য কোনো পাঠ্যপুস্তকের শব্দবদল, কোনো ভাস্কর্য, কোনো কবির কবিতা কিংবা কোনো তুচ্ছ সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা দেশজুড়ে হরতাল, ভাঙচুর, রাজপথ অবরোধ আর জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো উগ্র ও মারমুখী তাণ্ডব শুরু করে দেয়।

নিজেদের ঘরের ভেতরে ১৯৬১ সালের আইনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কুরআন ও হাদিসের অকাট্য বিধানের যে তীব্র লঙ্ঘন বা ভায়োলেশন চলছে, তা নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ এরা খুব ভালো করেই জানে—ক্ষমতাশালী আর নিষ্ঠুর কোনো সামরিক শাসকের বন্দুকের নলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে, একটা সহনশীল ও নমনীয় গণতান্ত্রিক সরকারকে ব্লাকমেইল করা অনেক বেশি সহজ, নিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। এদের এই সুবিধাবাদী দ্বিচারিতাই দিনশেষে প্রমাণ করে যে—এদের ধর্মরক্ষা আসলে কোনো ঈমানী বা আদেশগত লড়াই নয়, বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক নোংরা ও ভণ্ড সমীকরণ মাত্র।

২. ঐতিহাসিক পটভূমি ও রাজনৈতিক মোটিফ (১৯৫৫-১৯৬১)

১৯৬১ সালের এই আইনের জন্ম কিন্তু কোনো আকস্মিক আইনি বা তত্ত্বগত গবেষণার ফসল ছিল না। এর পেছনে লুকিয়ে ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজ, সামরিক আমলাতন্ত্র আর শাসক শ্রেণীর এক গভীর ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকট। এই ইতিহাসের আসল গোড়াপত্তন হয় ১৯৫৫ সালে, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ার একটি চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।

প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ার দ্বিতীয় বিয়ে এবং সামাজিক তোলপাড়

১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া তাঁর প্রথম স্ত্রী হামিদা বগুড়াকে জ্যান্ত রেখে, তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট নিজের যুবতী সেক্রেটারি আলিয়া সাদ্দিককে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করে বসেন। এই ঘটনাটি তৎকালীন পাকিস্তানের পশ্চিমাঘেঁষা উচ্চবিত্ত সমাজ, বিশেষ করে অভিজাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নারীদের মধ্যে এক তীব্র ক্ষোভ আর আতঙ্কের জন্ম দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও প্রভাবশালী সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত প্রভাবশালী সংগঠন ‘অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (APWA – এপোয়া) এই বিয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও আন্দোলন শুরু করে।

এপোয়া-র এই আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল—মুসলিম পুরুষদের বহুবিবাহ করার যে অবাধ অধিকার শরিয়াহ দিয়েছে, আইন করে তা অবিলম্বে বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। তাঁরা মোহাম্মদ আলী বগুড়ার এই বিয়েকে কেন্দ্র করে প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নেমে আসেন এবং সরকারের ওপর তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। এই তীব্র আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের মুখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে একটি আইনি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।

জাস্টিস আব্দুর রশিদের ‘রশিদ কমিশন’ ও আমলাদের চাল

আন্দোলনের আগুন নেভাতে ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে ‘পারিবারিক আইন বিষয়ক সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ইতিহাসে ‘রশিদ কমিশন’ নামে পরিচিত। এই কমিশনের সাতজন সদস্যের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এবং আধুনিকতাবাদী ভাবাদর্শের কট্টর অনুসারী। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন প্রভাবশালী নারী সদস্য, যাঁরা প্রথম থেকেই ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

কমিশনের এই একপেশে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সাধারণ সাধারণ মুসলিম জনগণের ক্ষোভ এড়াতে আইওয়াশ হিসেবে তৎকালীন সময়ের অন্যতম প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও হানাফি ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত মাওলানা এহতেশামুল হক থানভীকে (বিখ্যাত আলেম আশরাফ আলী থানভীর ভাতিজা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রশিদ কমিশন ১৯৫৬ সালে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই রিপোর্টে কমিশনের ওই seis জন আধুনিকতাবাদী সদস্য পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিয়ে, তালাক ও মিরাসের নিয়মে বড় রকমের ওলটপালটের সুপারিশ করেন। তাঁরা দাবি করেন যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে শরিয়াহর নিয়মও বদলে ফেলা উচিত।

মাওলানা এহতেশামুল হক থানভীর ঐতিহাসিক ‘নোট অব ডিসেন্ট’

কমিশনের এই চরম আধুনিকতাবাদী এবং শরিয়াহর মূল ভিত্তি ওলটপালট করে দেওয়ার মতো সুপারিশ দেখে মাওলানা এহতেশামুল হক থানভী তীব্র আপত্তি জানান। তিনি কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের তৈরি করা মূল প্রতিবেদনের সাথে একমত হতে পরিষ্কার অস্বীকার করেনและ এর বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (Note of Dissent) বা ভিন্নমতের দলিল পেশ করেন।

মাওলানা থানভী তাঁর এই ভিন্নমতের দলিলে অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি ও ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর প্রতিটি ধারা সরাসরি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট লঙ্ঘনের শামিল। তিনি সতর্ক করে দেন যে, যদি এই সুপারিশগুলো আইনে রূপ দেওয়া হয়, তবে তা মুসলিম সমাজকে আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ থেকে বিচ্যুত করে এক চরম ফেতনার দিকে ঠেলে দেবে।

মাওলানা থানভীর কড়া অবস্থান এবং দেশজুড়ে আলেমদের প্রাথমিক প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক সরকারগুলো এই বিতর্কিত প্রতিবেদনটি আইনে রূপ দেওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই প্রস্তাবিত আইনটি আমলাতন্ত্রের ফাইলের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকে।

আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ডিক্রি জারি

১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির মাধ্যমে জোরপূর্বক পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। আইয়ুব খান নিজেকে একজন কট্টর আধুনিকতাবাদী ও প্রগতিশীল শাসক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে মরিয়া ছিলেন। তাঁর মূল রাজনৈতিক এজেন্ডাই ছিল—পাকিস্তানের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা থেকে আলেম সমাজের প্রভাব চিরতরে মুছে ফেলা।

আইয়ুব খান দেখলেন যে, আলেমদের আপত্তির কারণে झুলে থাকা রশিদ কমিশনের এই মরা ফাইলটিকে যদি তিনি ডিক্রি জারির মাধ্যমে আইনে রূপ দিতে পারেন, তবে তিনি একই সাথে পশ্চিমা দুনিয়ার বাহবা পাবেন এবং পাকিস্তানের প্রভাবশালী প্রগতিশীল ও নারীবাদী সংগঠনগুলোর পূর্ণ সমর্থন লাভ করবেন।

যেহেতু তখন দেশে কোনো সংসদ ছিল না, কোনো গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ছিল না, তাই আলেম সমাজের কোনো ভয় আইয়ুব খানের মনে ছিল না। তিনি ওলামাদের সমস্ত ফতোয়া ও আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ১৯৬১ সালের ২রা মার্চ এক সামরিক অধ্যাদেশ বা ডিক্রির মাধ্যমে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১’ জারি করেন। এই ডিক্রির মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে কুরআন-সুন্নাহর প্রতিষ্ঠিত শরিয়াহ আইনকে বাইপাস করে এই আইন পাস করা হয়।

সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো—কুরআন-হাদিসের এত বড় অবমাননার পরেও কোনো আলেম বা তাদের সাগরেদেরা রাজপথে রক্ত দেওয়া, পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া বা ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি। নিজেদের জান বাঁচাতে সবাই টু শব্দটি না করে ঘরে বসে ছিলেন।

৩. উৎস ও দর্শনের সংঘাত (Jurisprudential Conflict)

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এবং প্রচলিত শরিয়াহর মধ্যকার সংঘাতটি কেবল ওপর ওপর কয়েকটি আইনি ধারার বৈসাদৃশ্য নয়; এটি মূলত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আইনি দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও উৎসের সংঘাত। প্রচলিত শরিয়াহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র (Islamic Jurisprudence) একটি সুনির্দিষ্ট, শৃঙ্খলিত এবং ঐশ্বরিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার মূল উৎস হলো চারটি: পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াস।

ইসলামী আইনশাস্ত্রে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং অকাট্য নীতি হলো—যখন কোনো বিষয়ে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ‘নস’ বা টেক্সট বিদ্যমান থাকে, সেখানে মানুষের বুদ্ধি খাটানো, মনগড়া আইন তৈরি করা কিংবা সেই সুনির্দিষ্ট মাত্রাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ থাকে না। ফিকহের পরিভাষায় একে বলা হয়—

(লা ইজতিহাদা মা’আন নাস — সুনির্দিষ্ট টেক্সটের উপস্থিতিতে কোনো নতুন গবেষণার অবকাশ নেই)।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং রশিদ কমিশনের আধুনিকতাবাদী সদস্যরা এই চিরন্তন ইসলামী আইনি কাঠামোকে সম্পূর্ণ অবমাননা ও বাইপাস করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মুসলিম সমাজকে আধুনিক করতে হলে ‘ইজতিহাদ’ বা নতুন গবেষণার প্রয়োজন। কিন্তু তাদের এই তথাকথিত ইজতিহাদ কোনো যুগান্তকারী মুজতাহিদ বা গভীর ইসলামী আইনবিদের মাধ্যমে হয়নি; বরং এটি হয়েছিল একটি সামরিক ডিক্রি এবং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু আমলা ও নারীবাদী নেত্রীদের রাজনৈতিক এজেন্ডার হাত ধরে।

শরিয়াহর দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বা शासকের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (সিয়াহ্ শারইয়্যাহ) অত্যন্ত সীমিত। শাসক কেবল এমন বিষয়ে প্রশাসনিক বা জনকল্যাণমূলক আইন করতে পারেন যা শরিয়াহর কোনো অকাট্য বিধানকে লঙ্ঘন করে না এবং যা জনসাধারণের সাধারণ কল্যাণে (মাসলাহাহ) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আইয়ুব খান তাঁর সামরিক ক্ষমতার জোরে এবং এই মৌলভিরা তাঁদের কাপুরুষোচিত নীরবতার মাধ্যমে এমন সব বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিলেন, যা সরাসরি আল্লাহর দেওয়া হালাল-হারামের সীমানাকে পুনর্নির্ধারণ করে।

এই দর্শনের সংঘাতই শরিয়াহ আইনের সাথে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের এক অলঙ্ঘনীয় ও চিরস্থায়ী প্রাচীর খাড়া করে দেয়, যা দেখেও আমাদের ‘তাকলিদপন্থী’ সমাজ আজ না দেখার ভান করে বসে থাকে। সবচেয়ে বড় কমেডি তখন হয়, যখন আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মুখে ফেনা তোলে—”আমরা কোনো কুরআন-হাদিস বিরোধী আইন করব না।” কিন্তু তারা একবারও বুক ফুলিয়ে বলে না—”আমরা কুরআন-হাদিস বিরোধী এই মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ বাতিল করব।”

৪. ধারা ৪-এর ব্যবচ্ছেদ: এতিম নাতির উত্তরাধিকার বনাম মিরাসের মূলনীতি

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারাটি দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামী আইন এবং ফিকহ শাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং তীব্রভাবে সমালোচিত একটি অনুচ্ছেদ। এই ধারার মাধ্যমে ইসলামের ১৪০০ বছরের প্রতিষ্ঠিত ‘মিরাস’ বা উত্তরাধিকার আইনকে এক কলমের খোঁচায় ওলটপালট করে দেওয়া হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার স্পষ্ট অবমাননা।

ক) আইনের বিধান ও এর পেছনের সস্তা আবেগ

অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে:

যদি কোনো ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার কোনো পুত্র বা কন্যা মারা যায়, তবে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি যখন বণ্টন করা হবে, তখন ওই মৃত পুত্র বা কন্যার সন্তানরা (অর্থাৎ এতিম নাতি-নাতনিরা) সমষ্টিগতভাবে ঠিক ততটুকুই সম্পত্তি পাবে, যতটুকু তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে পেতেন।

এই আইনটি করার পেছনে আধুনিকতাবাদীদের মানবিক যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল ও আবেগী। তারা সমাজে একটি করুণ চিত্র তুলে ধরলেন: এক ব্যক্তির তিন ছেলে। এর মধ্যে মেজো ছেলেটি তার বাবার জীবদ্দশাতেই মারা গেল এবং তার পেছনে কিছু নাবালক সন্তান (এতিম নাতি-নাতনি) রেখে গেল। কিছুদিন পর যখন দাদা মারা গেলেন, তখন প্রচলিত শরিয়াহ আইন অনুযায়ী জীবিত দুই চাচা সমস্ত সম্পত্তি পেয়ে যাচ্ছেন, আর এই অবুঝ এতিম নাতিরা পুরোপুরি শূন্যহাতে পথে বসছে। এই মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতেই আইয়ুব খান এই ধারাটি যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু আবেগ দিয়ে তো আর ঐশ্বরিক আইন বদলানো যায় না।

খ) সনাতন শরিয়াহ ও ফিকহ শাস্ত্রের অনমনীয় অবস্থান

আপাতদৃষ্টিতে এই ধারাটিকে অত্যন্ত মানবিক মনে হলেও, সনাতন শরিয়াহ এবং ইসলামের চার মাজহাবের (হানাফি, শাফিয়ি, মালিকি ও হাম্বলি) ফকীহদের মতে, এটি ইসলামের মিরাস ব্যবস্থার মূল কাঠামোর ওপর একটি বড় আঘাত।

ইসলামে মিরাস বা উত্তরাধিকারের বণ্টন কোনো মানুষের করুণা, আবেগ বা মানবিক অনুভূতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এটি পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১১, ১২ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং সুনির্দিষ্ট অঙ্কে ভাগ করে দিয়েছেন। এই আয়াতগুলোর শেষেই আল্লাহ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—”এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা” (তিলকা হুদুদুল্লাহ)।

ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের একটি মূল ও অকাট্য নীতি হলো: “আল-আকরাবু ফাল-আকরাব” বা “নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হয়” (The nearer in degree excludes the more remote)।

মৃত ব্যক্তির সাথে রক্তের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে এই অধিকার নির্ধারিত হয়। একজন দাদার সাথে তার নিজের জীবিত পুত্রের (চাচার) সম্পর্কের দূরত্ব হলো এক ডিগ্রি (সরাসরি সন্তান)। আর দাদার সাথে মৃত পুত্রের সন্তানের (নাতির) সম্পর্কের দূরত্ব হলো দুই ডিগ্রি (পুত্রের মাধ্যমে)। সুতরাং, রক্তের সম্পর্কের এই গভীরতার নীতি অনুযায়ী, জীবিত পুত্রের উপস্থিতিতে নাতি কোনোভাবেই সরাসরি ‘মিরাস’ বা উত্তরাধিকারী হতে পারেনা। সমস্ত সাহাবি, তাবেয়ি এবং চৌদ্দশত বছরের ফকীহদের এই বিষয়ে সুষ্পষ্ট ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্যমত রয়েছে।

গ) ১৯৬১ সালের ধারার আইনি ও যৌক্তিক ফাঁকফোকর

ইসলামী আইনবিদগণ ১৯৬১ সালের এই ৪ নম্বর ধারার ভেতরে কিছু চরম অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন:

  • কাল্পনিক জীবনের তত্ত্ব (Theory of Representation): এই আইনটি একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও কাল্পনিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনটি ধরে নেয় যে, মৃত পুত্র বা কন্যা যেন তাঁর বাবার মৃত্যুর সময়েও ‘কাল্পনিকভাবে জীবিত’ আছেন এবং সম্পত্তি তাঁর মাধ্যমে নাতি-নাতনিদের কাছে যাচ্ছে। ইসলামে মৃত ব্যক্তি কখনো সম্পত্তির মালিক বা মাধ্যম হতে পারে না। উত্তরাধিকারী হতে হলে মোরেস (মৃত ব্যক্তি) মারা যাওয়ার মুহূর্তে ওয়ারিশকে (উদ্ধারকারী) সশরীরে জীবিত থাকতে হবে।

  • চাচার চেয়ে নাতির বেশি সম্পত্তি পাওয়ার অসংগতি: এই কাল্পনিক তত্ত্বের কারণে সমাজে একটি অদ্ভুত বৈষম্য তৈরি হয়। ধরা যাক, এক ব্যক্তির এক ছেলে এবং এক মৃত ছেলের এক কন্যা (নাতনি) আছে। ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী, মৃত ছেলেটি জীবিত থাকলে পুরো সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পেত, সুতরাং তার এক মেয়েই বাবার পুরো হিস্যা অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ($2/3$) সম্পত্তি পেয়ে যাবে। আর মৃত ব্যক্তির নিজের আপন জীবিত পুত্র পাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ($1/3$) সম্পত্তি। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি একটি চরম বিকৃতি, যেখানে জীবিত আপন পুত্রের চেয়ে দূরবর্তী এক নাতনি দ্বিগুণ সম্পত্তি নিয়ে যাচ্ছে।

ঘ) শরিয়াহসম্মত সমাধান: ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ (Mandatory Will) এর গোঁজামিল

১৯৬১ সালের এই আইনের বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাদী আলেম ও মুফতিরা প্রায়ই মিশরের ‘আইন নং ৭১ (১৯৪৬)’-এর দোহাই দিয়ে ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ (Mandatory Will) বা বাধ্যতামূলক ওসিয়তের তত্ত্ব হাজির করেন। তারা দাবি করেন, এটি নাকি একটি চমৎকার শরিয়াহসম্মত সমাধান। কিন্তু তাদের এই দাবিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ওলামাদের নিজেদের তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব ও আইনি গোঁজামিলই প্রকাশ পায়।

পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮০ নম্বর আয়াতে ওসিয়ত করার সাধারণ তাগিদ রয়েছে এবং হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বেঁচে থাকতে তাঁর মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ($1/3$) এমন কারো নামে ওসিয়ত করতে পারেন, যিনি সরাসরি মিরাসের অংশীদার নন। আলেমদের যুক্তি হলো—যেহেতু দাদা মারা যাওয়ার পর এতিম নাতিরা সরাসরি কোনো অংশ পায় না, তাই রাষ্ট্র আইন করতে পারে যে, দাদা অলসতাবশত ওসিয়ত না করে মারা গেলেও আদালত ধরে নেবে দাদা ওসিয়ত করে গেছেন এবং দাদার মোট সম্পত্তি থেকে এক-তৃতীয়াংশ কেটে নাতিদের দিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আলেমদের এই সমাধানও কোনোভাবেই সরাসরি কুরআন অনুযায়ী হয় না। এটিও এক ধরণের মনগড়া আইনি জোড়াতালি। এর কারণগুলো হলো:

  • কুরআনের অকাট্যতার লঙ্ঘন: পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসায় মিরাসের যে বণ্টন এবং অংশীদারদের তালিকা আল্লাহ নিজে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, সেখানে এতিম নাতিদের কোনো অংশ রাখা হয়নি। এখন আলেমদের কথামতো রাষ্ট্র যদি ‘বাধ্যতামূলক’ বা জোরপূর্বক ওসিয়তের আইন বানিয়ে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে এক-তৃতীয়াংশ কেটে নেয়, তবে তা-ও কুরআনের বণ্টন প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের তৈরি আইনের এক প্রকার জোর জবরদস্তি।

  • ওসিয়তের মূল দর্শনের পরিপন্থী: ইসলামে ‘ওসিয়ত’ বা উইল হলো একজন মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বেচ্ছাধীন ইবাদত। মানুষ নিজের ইচ্ছায়, সওয়াবের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবদ্দশায় এটি লিখে যাবেন। কোনো ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করেই মারা যান, তবে রাষ্ট্র কাল্পনিকভাবে ধরে নিয়ে তাঁর সম্পদের ওপর ‘বাধ্যতামূলক’ ওসিয়ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার শরিয়াহর মূল কাঠামোতে কোথায় পেল?

  • আইয়ুব খানের আইনের সাথে অমিল কোথায়?: আইয়ুব খান যেমন সামরিক ডিক্রি দিয়ে কুরআনের বাইরে গিয়ে নাতিদের মিরাসের অংশীদার বানিয়েছেন, ঠিক তেমনি আলেমদের বাতলে দেওয়া মিশরের মডেলে রাষ্ট্র আইন করে মৃত ব্যক্তির সম্পদ জবরদখল করছে। দুটি প্রক্রিয়াই তো আল্লাহর আইনের সমান্তরালে মানুষের তৈরি আইনি হস্তক্ষেপ।

সুতরাং, modernists বা আধুনিকতাবাদীরা যেমন আবেগ দিয়ে কুরআন বদলাতে চেয়েছেন, তেমনি এই ওলামা সমাজও মিশরের আইনের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) করে কুরআনের বাইরে গিয়ে আরেকটি গোঁজামিলকে ‘ইসলামী সমাধান’ বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, আলেমদের নিজস্ব যুক্তি মতেই যদি আইয়ুব খানের আইনটি সরাসরি কুরআন বিকৃতির শামিল হয় এবং তাদের প্রিয় মিশরের ‘বাধ্যতামূলক ওসিয়ত’ আইনটিই একমাত্র বিকল্প হয়—তবে গত ৬০ বছর ধরে তারা এই বিকল্প আইনটি বাস্তবায়নের জন্যও বাংলাদেশে কোনো আন্দোলন করেননি কেন? রাজপথে রক্ত দেওয়া তো দূরের কথা, এই আইনি বৈপরীত্য দূর করার জন্য তারা কোনো জোরালো দাবিও তোলেননি। কিতাবের পাতায় কুরআন বিকৃতির ফতোয়া দিয়ে, আর বাস্তবে সেই বিকৃত আইনকেই আদালতের টেবিলে মুখ বুজে মেনে নিয়ে তারা যে দ্বিচারিতা দেখাচ্ছেন, তা তাদের চরম ভণ্ডামিরই বহিঃপ্রকাশ।

৫. ধারা ৬-এর ব্যবচ্ছেদ: বহুবিবাহের ওপর আইনি শিকল ও ‘তাহরিমুল হালাল’-এর ফিকহী অপরাধ

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৬ নম্বর ধারাটি মুসলিম সমাজে পুরুষের বহুবিবাহের অধিকারকে রাষ্ট্রীয় আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে। আইয়ুব খান এবং রশিদ Commissions-এর আধুনিকতাবাদী সদস্যরা দাবি করেছিলেন যে, এই ধারার উদ্দেশ্য হলো প্রথম স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং পুরুষদের অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহের প্রবণতা বন্ধ করে সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু শরিয়াহর আইনি দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারাটি আল্লাহর দেওয়া একটি বৈধ অধিকারকে সংকুচিত ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে শরিয়াহর সীমানায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে।

ক) আইনের বিধান ও এর কঠোর শর্তসমূহ

অধ্যাদেশের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর বর্তমান স্ত্রীর (বা স্ত্রীদের) উপস্থিতিতে আরেকটি বিয়ে করতে চান, তবে তাঁকে কয়েকটি কঠিন আইনি ধাপ পার হতে হবে:

১. শালিসী পরিষদের অনুমতি: পুরুষটিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নির্দিষ্ট ফিসহ একটি লিখিত আবেদন করতে হবে, যেখানে দ্বিতীয় বিয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ থাকতে হবে।

২. বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি: আবেদনের সাথে বর্তমান স্ত্রীর কাছ থেকে একটি লিখিত সম্মতিপত্র বা অনুমতিপত্র জমা দিতে হবে।

৩. শালিসী পরিষদের গঠন ও সিদ্ধান্ত: চেয়ারম্যান এরপর বর্তমান স্ত্রী ও স্বামীর পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ (Arbitration Council) গঠন করবেন। এই পরিষদ যদি মনে করে যে দ্বিতীয় বিয়েটি করা অত্যন্ত ‘প্রয়োজনীয় এবং জাস্ট্রিফাইড’, কেবল তখনই তারা বিয়ের অনুমতি দেবে।

শাস্তির বিধান:

যদি কোনো ব্যক্তি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে অর্থাৎ শালিসী পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে আইনত তাঁর সেই বিয়েটি বাতিল বা অবৈধ হবে না ঠিকই, কিন্তু তাঁকে দুটি বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে:

  • তিনি তাঁর বর্তমান স্ত্রীকে (বা স্ত্রীদের) তাৎক্ষণিকভাবে পুরো দেনমোহরের টাকা (তা মুআজ্জাল বা বিলম্বিত যাই হোক না কেন) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।

  • অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করার অপরাধে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা বিপুল অঙ্কের জরিমানা ভোগ করতে হবে।

খ) শরিয়াহর অকাট্য অবস্থান ও হুকুম

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের সাধারণ অনুমতি দিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:

“তবে তোমরা নিজেদের পছন্দমত নারীদের বিয়ে করে নাও—দুটি, তিনটি কিংবা চারটি। আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে সুবিচার (ইনসাফ) করতে পারবে না, তবে একটিই…”

ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) চার মাজহাবের ইমাম ও ফকীহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) হলো, ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতি একটি সাধারণ এবং মৌলিক অধিকার। এই অধিকারটি পাওয়ার জন্য বা দ্বিতীয় বিয়েটি বৈধ হওয়ার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক পরিষদের ছাড়পত্র পাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা শরিয়াহর মূল কাঠামোতে নেই।

ইসলাম বহুবিবাহের জন্য কেবল একটিই মৌলিক শর্ত আরোপ করেছে, আর তা হলো—স্ত্রীদের মধ্যে নিখুঁত সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা (আর্থিক, মানসিক এবং সময় বণ্টনের ক্ষেত্রে)। যদি কোনো পুরুষ ইনসাফ করতে না পারেন, তবে তাঁর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ বা গুনাহের কাজ। কিন্তু কোনো পুরুষ যদি ইনসাফ করতে সক্ষম হন, তবে তাঁর জন্য এই বিয়ে করা সম্পূর্ণ বৈধ বা ‘মুবা’। আর ইনসাফ করতে পারছে কি না, সেটা ওই পুরুষ নিজে নির্ধারণ করবে। তার জন্য কোনো বহিরাগত কর্তৃপক্ষ নেই।

গ) হালালকে হারাম করার ফিকহী অপরাধ এবং ওলামাদের ভণ্ডামির যোগসূত্র

ওলামা এবং ইসলামী আইনবিদগণ ১৯৬১ সালের এই ৬ নম্বর ধারাটিকে প্রধানত দুটি কারণে সম্পূর্ণ শরিয়াহবিরোধী ও অবৈধ বলে গণ্য করেন:

  • হালালকে হারাম বা সংকুচিত করার চেষ্টা: ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যে বিষয়টিকে মানুষের জন্য ‘হালাল’ বা ‘মুবা’ (বৈধ) ঘোষণা করেছেন, কোনো রাষ্ট্র বা শাসক আইনি ডিক্রি জারি করে সেই বৈধ বিষয়কে ‘অপরাধ’ বা ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করতে পারেন না। একে ফিকহের পরিভাষায় বলা হয়—”তাহরিমুল হালাল” (আল্লাহর হালালকে হারাম করা)। ১৯৬১ সালের আইনটি আল্লাহর দেওয়া একটি সাধারণ অনুমতিকে রাষ্ট্রীয় অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করে দিয়ে প্রকারান্তরে শরিয়াহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করেছে।

  • বিবাহিত জীবনের বৈধতা বনাম আইনি অপরাধের বৈপরীত্য: এই আইনটি নিজেই একটি বড় আইনি বৈপরীত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনটি বলছে, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিয়েটি ভেঙে যাবে না, অর্থাৎ বিয়েটি ধর্মীয় ও আইনত ‘বৈধ’ থাকবে। অথচ একই সাথে আইনটি বলছে, এই বৈধ কাজটি করার জন্য পুরুষটিকে ‘অপরাধী’ হিসেবে জেলে যেতে হবে। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি একটি চরম প্রহসন। যে কাজটি আল্লাহর দরবারে বৈধ এবং যার মাধ্যমে একটি নতুন পরিবার গঠিত হলো, সেই পবিত্র কাজের জন্য একজন মুসলিমকে রাষ্ট্র কীভাবে ‘অপরাধী’ গণ্য করে শাস্তি দিতে পারে?

এখানেই মৌলভিদের মুনাফেকির প্রমাণ স্পষ্ট: তারা যখন কোনো গণতান্ত্রিক বা উদারপন্থী সরকারের আমলে কোনো সাধারণ বা সামাজিক বিষয় দেখে, তখন “আল্লাহর দেওয়া হালালকে কেউ হারাম করতে পারবে না” বলে হুঙ্কার ছাড়ে, আন্দোলন করে দেশ অচল করে দেয়। অথচ আইয়ুব খানের সামরিক বুটের তলায় যখন পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার এই অকা্য স্বাধীন বিধানটিকে শেকল পরানো হলো এবং আল্লাহর হালাল করা কাজকে ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ’ বানিয়ে এক বছরের জেলের বিধান রাখা হলো, তখন এই আলেম সমাজ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সম্পূর্ণ আপস করে নিলো। তাদের এই সিলেক্টিভ বা সুবিধাবাদী শরিয়াহ প্রীতিই প্রমাণ করে যে, তারা বন্দুকের নলকে আল্লাহর হুকুমের চেয়ে বেশি ভয় পায়!

৬. ধারা ৭ ও ৮-এর ব্যবচ্ছেদ: তালাক ও ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশের গোলকধাঁধা

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ও ৮ নম্বর ধারাটি মুসলিম দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়—‘তালাক’ বা বিবাহবিচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। এই ধারা দুটির মাধ্যমে শরিয়াহর প্রচলিত তালাক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে এক চরম প্রশাসনিক গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে, যা মুসলিম পরিবারগুলোতে এক ভয়াবহ ধর্মীয় ও সামাজিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

ক) আইনের বিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

অধ্যাদেশের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একজন স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তবে তাঁকে নিম্নলিখিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে:

১. চেয়ারম্যানকে নোটিশ: স্ত্রীকে যেকোনো পদ্ধতিতে (মুখে বা লিখিতভাবে) তালাক দেওয়ার পর, স্বামীকে যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে একটি লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং স্ত্রীর কাছে তার একটি অনুলিপি পাঠাতে হবে।

২. শালিসী পরিষদ গঠন: নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষ-মীমাংসার উদ্দেশ্যে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ গঠন করবেন এবং দুই পক্ষকে আলোচনার জন্য ডাকবেন।

৩. ৯০ দিনের স্থগিতাদেশ: চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ঠিক ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত ওই তালাকটি কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। যদি এই ৯০ দিনের মধ্যে শালিসী পরিষদের মাধ্যমে তাদের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়ে যাবে।

খ) শরিয়াহর সুপ্রতিষ্ঠিত তালাক নীতি

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, বিবাহ যেমন একটি পবিত্র ধর্মীয় ও সামাজিক চুক্তি, তালাকও তেমনি একটি বিশেষ ও চূড়ান্ত আইনি অধিকার। পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন স্বামী যখন তাঁর স্ত্রীকে সচেতনভাবে এবং সুস্থ মস্তিস্কে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করে বা লিখে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তখন থেকেই তালাকের ধর্মীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

শরিয়াহর ফতোয়া অনুযায়ী, স্বামী মুখে এক বা দুই তালাক কিংবা চূড়ান্ত তিন তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীর ওপর সেই তালাকটি পতিত হয়ে যায়। এর জন্য কোনো সরকারি চেয়ারম্যান, আদালত বা কোনো তৃতীয় পক্ষের কাগজের নোটিশের ওপর তালাক হওয়া বা না হওয়া ঝুলে থাকে না। তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীর ‘ইদ্দতকাল’ (অপেক্ষার সময়) শুরু হয়, যা সাধারণত নারীর তিন ঋতুস্রাব কাল (কুরআনের ভাষায়: সালাসাতি কুরু)। এই ইদ্দতকালের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে কোনো নতুন বিয়ে ছাড়াই ফিরিয়ে নিতে পারেন (রুজু করা)। কিন্তু ইদ্দত পার হয়ে গেলে বা তিন তালাক দিলে তালাকটি চূড়ান্ত হয়ে যায়।

গ) সামাজিক জিনা বা ব্যভিচারের রাষ্ট্রীয় বৈধতা

ওলামাগণ এই ৭ নম্বর ধারাটিকে শরিয়াহর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকৃতি হিসেবে দেখেন, কারণ এটি মুসলিম দম্পতিদের অজান্তেই এক চরম ধর্মীয় গুনাহের (জিনা) দিকে ঠেলে দেয়। এর মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • তালাক কার্যকরের সময় নিয়ে চরম বিভ্রান্তি: ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীকে মুখে তিন তালাকও দেয় কিন্তু কোনো কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ না পাঠায়, তবে আইনের চোখে তাদের তালাক কার্যকর হয় না এবং তারা আইনত স্বামী-স্ত্রীই থেকে যায়। অথচ শরিয়াহর ফতোয়া অনুযায়ী, মুখে তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই তাদের বিয়ে ভেঙে গেছে এবং ইদ্দত শেষে তারা একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে। এই অবস্থায় যদি কোনো দম্পতি সরকারি আইনের ওপর ভরসা করে নোটিশ না দিয়ে বা চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেটের অপেক্ষায় বছরের পর বছর একসাথে বসবাস করতে থাকে, তবে শরিয়াহর দৃষ্টিতে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত ‘ব্যভিচার’ বা জিনা হিসেবে গণ্য হবে, যা একটি মুসলিম সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

  • গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল নিয়ে কুরআনের স্পষ্ট লঙ্ঘন: পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তালাকের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল বা তালাক চূড়ান্ত হওয়ার সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন—”আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত”। অর্থাৎ, কোনো গর্ভবতী নারীকে তালাক দিলে, সে যদি নোটিশ দেওয়ার দুইদিন পরেও সন্তান প্রসব করে, তবে শরিয়াহর নিয়মে সেদিনই তার ইদ্দত শেষ এবং তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। অথচ ১৯৬১ সালের এই ৭(৩) ধারাটি আল্লাহর এই স্পষ্ট আয়াতকে অমান্য করে ঢালাওভাবে আইন করেছে যে—গর্ভবতী নারী হোক বা সাধারণ নারী হোক, চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন পার না হলে কোনোভাবেই তালাক কার্যকর হবে না। এটি সরাসরি কুরআনের আক্ষরিক পাঠের বিকৃতি।

এই প্রশাসনিক গোলকধাঁধার কারণে হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষের জীবন ধর্মীয়ভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র যাকে স্ত্রী বলছে, ধর্ম তাকে পরনারী বলছে; রাষ্ট্র যাকে স্বাধীন বলছে, ধর্ম তাকে ইদ্দতের বন্ধনে আটকে রাখছে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো—হুজুরেরা গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে নারীদের সাধারণ পোশাক বা সহশিক্ষার মতো বিষয় নিয়ে বড় বড় আন্দোলন করলেও, ১৯৬১ সালের আইনের এই বিশাল ভায়োলেশন নিয়ে পুরো নীরব। কারণ তারা জানে, এই আইনের শেকড় সামরিক বুটের তলায় প্রোথিত ছিল! সেখানে গেলেই সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে, সেটা আলেম সমাজ ভালো করেই জানত।

৭. ধারা ৯-এর ব্যবচ্ছেদ: ভরণপোষণ ও বিচারিক ক্ষমতার বিচ্যুতি

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ নম্বর ধারাটি স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফকা) আদায়ের পদ্ধতি এবং তা নির্ধারণের এখতিয়ার নিয়ে আলোচনা করে। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ করেন, তবে স্ত্রী যেন সহজে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় তাঁর আর্থিক অধিকার আদায় করতে পারেন। কিন্তু এই সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষার আড়ালে আইনি কাঠামোটি তৈরি করতে গিয়ে শরিয়াহর নিজস্ব বিচারিক ব্যবস্থা এবং যোগ্যতার (Jurisdiction and Competence) মূলনীতিকে সম্পূর্ণ ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

ক) আইনের বিধান ও প্রশাসনিক এখতিয়ার

অধ্যাদেশের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী:

কোনো স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীকে পর্যাপ্ত ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন কিংবা একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে সমানভাবে ভরণপোষণ বণ্টন না করেন, তবে স্ত্রী (বা স্ত্রীরা) সরাসরি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করতে পারবেন।

আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ গঠন করবেন। এই পরিষদ বিষয়টি তদন্ত করে স্বামী কত টাকা ভরণপোষণ দেবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট অংক নির্ধারণ করে সার্টিফিকেট জারি করবে। যদি স্বামী নির্ধারিত সময়ে এই টাকা পরিশোধ না করেন, তবে তা ‘सरकारी বকেয়া’ (Public Demand) বা ল্যান্ড রেভিনিউ হিসেবে তাঁর সম্পত্তি ক্রোক বা অন্য কোনো আইনি উপায়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে আদায় করা হবে।

খ) শরিয়াহর বিচারিক পদ্ধতি ও কাজীর যোগ্যতা

ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী, ভরণপোষণ বা ‘নফকা’ কেবল একটি সাধারণ আর্থিক পাওনা নয়; এটি একটি অত্যন্ত জটিল ধর্মীয় ও দেওয়ানি বিষয়। শরিয়াহর মূলনীতি হলো—কোনো দম্পতির মধ্যে ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে, তার সমাধান করার একক এখতিয়ার কেবল ‘কাজী’ বা শরিয়াহ আদালতের সুনির্দিষ্ট বিচারকের (Family Court Judge)।

ইসলামে একজন বিচারক বা কাজী হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু ধর্মীয় ও একাডেমিক যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। শিশুকে বা বিচারককে কেবল স্বামীর আয় দেখতে হয় না, বরং শরিয়াহর আরও বহু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। যেমন—স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য (নাশেজাহ) কি না, স্ত্রী কোনো শরয়ী বা যৌক্তিক কারণ ছাড়া স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে গেছেন কি না, কিংবা স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামের পরিভাষায় ‘তাক্বদীরুল কিফায়াহ’ (পর্যাপ্ততার পরিমাপ) কতটুকু হওয়া উচিত—এসব ফিকহী সিদ্ধান্তের ওপর ভরণপোষণের বৈধতা নির্ভর করে।

গ) অ-আলেমদের হাতে বিচার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাসত্ব

১৯৬১ সালের এই ৯ নম্বর ধারাটিকে প্রধানত নিম্নলিখিত কারণে আমি শরিয়াহর পরিপন্থী বলে মনে করি:

  • অ-আলেম ও রাজনৈতিক প্রতিনিধির হাতে বিচারিক ক্ষমতা: এই আইনের মাধ্যমে শরিয়াহর গভীর ফিকহী বিচারিক ক্ষমতা একজন যোগ্য কাজীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। একজন ইউপি চেয়ারম্যান বা শালিসী পরিষদের সদস্যরা সাধারণ মানুষ; তাঁরা শরিয়াহ শাস্ত্র, ফিকহী সূক্ষ্মতা বা ইসলামী বিচার ব্যবস্থার কোনো প্রথাগত জ্ঞান রাখেন না। শরিয়াহর মূলনীতি অনুযায়ী, দ্বীনি বা শরিয়াহ সংক্রান্ত বিষয়ে ফয়সালা দেওয়ার অধিকার কোনো অ-আলেম বা অ-বিশেষজ্ঞের নেই।

  • একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ও নাশেজাহর বিধান উপেক্ষা: শরিয়াহ অনুযায়ী, স্ত্রী যদি কোনো শরয়ী কারণ ছাড়া স্বামীর অবাধ্য হন (নাশেজাহ), তবে স্বামী তাঁকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক চাপ বা আইনি অজ্ঞতার কারণে শরিয়াহর এই সূক্ষ্ম শর্তগুলো খতিয়ে দেখতে পারেন না। ফলে অনেক সময় অবাধ্য স্ত্রীর পক্ষে একপাক্ষিক রায় চলে আসে, যা স্বামীর প্রতি শরিয়াহসম্মত বিচারকে ব্যাহত করে। শরিয়াহর বিচারিক ক্ষমতাকে এভাবে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক রূপ দেওয়া ফিকহী দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এখানেই ওলামাদের সেই চেনা দ্বিচারিতা স্পষ্ট: শরিয়াহর একটি প্রধান বিচারিক স্তম্ভ হলো কাজী বা ইসলামী আদালতের সার্বভৌমত্ব। আইয়ুব খানের সামরিক ডিক্রি যখন কাজীর সেই পবিত্র বিচারিক আসনটিকে হরণ করে একজন অ-আলেম, ধর্মনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক চেয়ারম্যানের হাতে সঁপে দিল, তখন আমাদের ‘তাকলিদপন্থী’ আলেম সমাজ এই বিচারিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক বা আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। কিন্তু কোনো অ-সামরিক, গণতান্ত্রিক সরকার যখনই বিচার বিভাগ বা শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তখনই এই আলেমরাই কাজীর অধিকার হরণের ধুয়া তুলে রাজপথ অচল করতে দ্বিধা করেন না।

৮. উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রভাব ও বর্তমান আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

১৯৬১ সালের এই সামরিক অধ্যাদেশটি জারির পর থেকে গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার আইনি ও বিচারিক অঙ্গনে এক অবিরাম টানাপোড়েন চলছে। একদিকে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো এই আইনটিকে ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে শরিয়াহ সচেতন নাগরিক ও আলেম সমাজ কিতাবের পাতায় এর বিরোধিতা করলেও মাঠপর্যায়ে একে একপ্রকার নীরবেই হজম করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের উচ্চ আদালতগুলোতে এই দ্বন্দ্বের রূপটি ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ক) পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়ত কোর্টের ঐতিহাসিক রায়সমূহ

পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থায় একটি বিশেষ আদালত রয়েছে, যার নাম ‘ফেডারেল শরিয়ত কোর্ট’ (Federal Shariat Court – FSC)। এই আদালতের মূল কাজই হলো—দেশের কোনো আইন পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘर्षিক কি না, তা পরীক্ষা করা এবং রায় দেওয়া।

গত কয়েক দশকে এই ফেডারেল শরিয়ত কোর্টে ১৯৬১ সালের আইনের প্রায় প্রতিটি ধারা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিশেষ করে ৪ নম্বর ধারার (এতিম নাতির মিরাস) বিরুদ্ধে একের পর এক ঐতিহাসিক রায় এসেছে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, ৪ নম্বর ধারাটি যেভাবে সরাসরি মৃত ছেলের সন্তানকে জীবিত ছেলের সমান ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়, তা পবিত্র কুরআনের আয়াতের পরিপন্থী। আদালত এর বিকল্প হিসেবে মিশরের মডেলে ‘বাধ্যতামূলক ওসিয়ত’ (Mandatory Will) প্রবর্তনের তাগিদ দিয়েছে।

একইভাবে তালাক সংক্রান্ত ৭ নম্বর ধারার নোটিশের বাধ্যবাধকতা নিয়েও আদালত বলেছে যে, নোটিশ না দিলেও শরিয়াহ অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, পাকিস্তানের উচ্চ আদালতগুলোতে শরিয়াহর মূলনীতি রক্ষায় একটি বড় ধরণের বিচারিক সক্রিয়তা (Judicial Activism) দেখা গেছে, যা আইনের ভেতরের ত্রুটিগুলোকে বারবার সামনে এনেছে।

খ) বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনের ধারাবাহিকতা

পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীন বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ১৯৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’-কে একটি কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাকবচ এবং প্রগতিশীল আইন হিসেবেই দেখে আসছে। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট বা রায়ে এই আইনের প্রতিটি ধারাকে কঠোরভাবে বহাল রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের আদালতের মূল যুক্তি হলো—৪ নম্বর ধারাটি এতিম শিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয় এবং ৬ ও ৭ নম্বর ধারাটি নারীদের বহুবিবাহ ও খামখেয়ালি তালাকের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করে। আমাদের দেশে যদি কোনো স্বামী ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ না দিয়ে তালাক দেয়, তবে আদালত সেই তালাককে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ এবং ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে। অর্থাৎ, ধর্মের ফতোয়া যাই বলুক না কেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও আইনি ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টভাবে ১৯৬১ সালের সংবিধিবদ্ধ আইনকেই শ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র প্রয়োগযোগ্য আইন হিসেবে চেনে।

এখানেই আমাদের ‘তাকলিদপন্থী’ সমাজ আর ওলামাদের ভণ্ডামির শেষ অংকটি মঞ্চস্থ হয়। পাকিস্তানের ওলামারা অন্তত আদালতের বারান্দা পর্যন্ত লড়াইটা নিয়ে গেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ওলামারা কিতাবের পাতায় ফতোয়া জারি করেই খালাস! তাঁরা প্রতি শুক্রবারে খুতবায় বা ওয়াজ মাহফিলে কোর্টের এই রায়গুলোকে ‘কুরআন বিরোধী’ বলে গালমন্দ করেন, অথচ এই ওলামাদের নিজেদের ঘরের কোনো জমি-জমা বা পারিবারিক বিরোধ যখন তৈরি হয়, তখন তাঁরা ঠিকই হন্তদন্ত হয়ে দেশের এই ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানি আদালতেই ছোটেন এবং ১৯৬১ সালের আইনের অধীনেই নিজেদের হিস্যা বুঝে নেন। আদালতের টেবিলে জজের সামনে দাঁড়িয়ে এই আইন বাতিলের কোনো আইনি রিট বা লড়াই করার সাহস আজ পর্যন্ত কোনো বড় মুফতি বা ইসলামী দল দেখাতে পারেনি।

আদর্শিক দেউলিয়াত্ব বনাম সস্তা রাজনীতির দোকানদারি

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের এই দীর্ঘ ৬০ বছরের ইতিহাস আমাদের সামনে একটা সত্যকে সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার করে দেয়—আমাদের সমাজের প্রথাগত আলেম ও ‘তাকলিদপন্থী’ মৌলভিদের ইসলামপ্রিয়তা আসলে কোনো খাঁটি ঈমানী বা আদর্শিক বিষয় নয়; এটি হলো স্রেফ ক্ষমতার রাজনীতি আর সস্তা দোকানদারি।

পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার অকাট্য আয়াতগুলোর এমন প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি চোখের সামনে রেখেও যারা গত ছয় দশক ধরে নিশ্চুপ ঘুমে মগ্ন, তারা যখন রাজপথে এসে কোনো ভাস্কর্য বা পাঠ্যপুস্তকের একটা সাধারণ লাইন নিয়ে ঈমান গেল বলে চিৎকার করে, তখন বুঝতে হবে এদের আসল উদ্দেশ্য ধর্মরক্ষা নয়—বরং একটা দুর্বল গণতান্ত্রিক সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের political আখের গোছানো।

তারা বন্দুকের নলের সামনে কাপুরুষ, আর গণতন্ত্রের উদারতার সামনে উগ্র স্বৈরাচারী। এই মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামি আর সুবিধাবাদী দ্বিচারিতাকে যতক্ষণ না আমরা সমাজের সামনে নগ্ন করব, ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের নামে এই সস্তা সেন্টিমেন্টের ব্যবসা বন্ধ হবে না।

আরও দেখুন: