ইতিহাস কোনো জড়বস্তু নয়, ইতিহাস এক জীবন্ত আয়না। আর সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে কখনো কখনো রাজনীতির নামে এমন কিছু অন্ধকার ও কুৎসিত অধ্যায় উন্মোচিত হয়, যা মানবতাকে লজ্জিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভূখণ্ডে ‘জামায়াতে ইসলামী’ তেমনই এক চরম সুবিধাবাদী, মোনাফেক, চাটুকার এবং দেশদ্রোহী চরিত্রের নাম। ধর্মের পবিত্র আবরণে নিজেদের ঢেকে ক্ষমতার লোভে এরা কীভাবে বারবার রূপবদল করেছে, কীভাবে নিজের জন্মভূমি ও স্বজাতির সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে—তার প্রকৃত ইতিহাস আজকের এবং আগামী প্রজন্মের জানা অত্যন্ত জরুরি।
যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী একসময় তীব্র অহমিকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির বিরোধিতাকে ‘ফরজ’ জ্ঞান করেছিলেন, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘কাফের’ আখ্যা দিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের স্বপ্নকে ‘আহাম্মকের বেহেশত’ বলে উপহাস করেছিলেন; ঠিক সেই দলটির নেতারাই আবার ক্ষমতার মধু চাখতে সুর বদলে রাতারাতি পরম পাকিস্তানপ্রেমী বনে যান। ইসলামের দোহাই দিয়ে শুরু হওয়া এই দলটির পুরো ইতিহাস আসলে রাজনৈতিক ভণ্ডামি, চারিত্রহীনতা এবং রক্তপিপাসার এক দীর্ঘ উপাখ্যান।
বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ১৯৭১ সাল। স্বাধিকারের দাবিতে মরণপণ লড়াইয়ে নামা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর যখন পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন এই জামায়াতে ইসলামী ও তাদের কুখ্যাত ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ ধর্মের নামে কসাইয়ের ভূমিকা অবতীর্ণ হয়েছিল। গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদের মতো নরপিশাচেরা আল-বদর, আল-শামস আর রাজাকার বাহিনী গঠন করে এদেশের মুক্তিকামী মানুষ, নিরীহ নারী এবং মেধা ও মননের ধারক বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
দেশ স্বাধীনের পর যে মোনাফেকদের এদেশের মাটিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষাক্ত সুযোগ নিয়ে তারা আবার এই পবিত্র মাটিতে পুনর্বাসিত হয়। শুধু তা-ই নয়, যে লাল-সবুজের পতাকাকে তারা একসময় বুটের তলায় পিষে দিতে চেয়েছিল, কোটি বাঙালির আবেগের সেই জাতীয় পতাকা বীরদর্পে উড়িয়েছিল নিজেদের মন্ত্রিত্বের গাড়িতে!
ইতিহাসের সেই চরমতম নির্মমতা, রক্তের দাগ, রগকাটা সন্ত্রাসের অন্ধকার দিক এবং শেষ পর্যন্ত শাহবাগের গণজাগরণ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হয়ে এই কুখ্যাত চক্রের পতন—সবকিছুর একটি বস্তুনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো। এই মোনাফেক ও দেশদ্রোহীদের আসল রূপ চিনে রাখা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আজ অনিবার্য।
জামায়াতে ইসলামীর আমীরবৃন্দের তালিকা
একটি আদর্শিক দল হিসেবে শুরু হলেও কালক্রমে এর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শীর্ষ নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন:
- মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (১৯৪১–১৯৭২)
- মিয়া তোফায়েল মুহাম্মদ (১৯৭২–১৯৮৭; পাকিস্তানে)
- কাজী হুসাইন আহমদ (১৯৮৭–২০০৯; পাকিস্তানে)
- মওলানা আবদুর রহীম (১৯৫৫–১৯৫৬; পূর্ব পাকিস্তান শাখা)
- অধ্যাপক গোলাম আযম (১৯৬৯–২০০০; পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াত)
- মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (২০০০–২০১৬)
সংগঠনের পরিচিতি: জামায়াতে ইসলামী মূলত একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কভিত্তিক দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক দল। বর্তমানে এর মূল কেন্দ্রীয় কার্যালয় লাহোর, পাকিস্তানে অবস্থিত। অন্যদিকে, স্বাধীন বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ নামে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত।
ব্রিটিশ ভারত ও মওদুদীবাদ (১৯৩২–১৯৪৬)
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, যখন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে একদিকে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন এবং অন্যদিকে মুসলিম লীগের ‘পাকিস্তান’ আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছিল, ঠিক তখন এক ভিন্নধর্মী ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে হাজির হন মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী।
মতবাদের সূচনা (১৯৩২): মাওলানা মওদুদী তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের জন্য ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ‘মাসিক তরজুমানুল কুরআন’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল তাত্ত্বিক মুখপত্র।
আলীগড়ের সেই ভাষণ (১৯৪০): ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার পথ’ শীর্ষক এক দীর্ঘ বক্তৃতায় মওদুদী তৎকালীন মুসলিম লীগের ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে তাঁর তীব্র আদর্শিক মতপার্থক্য স্পষ্ট করেন। তিনি মনে করতেন, কেবল মুসলমানদের জন্য একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়, বরং একটি খাঁটি ‘ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
দলের আনুষ্ঠানিক জন্ম (১৯৪১): ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে আগস্ট লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মাত্র ৭৫ জন সদস্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে “জামায়াতে ইসলামী হিন্দ” গঠিত হয়। মাওলানা মওদুদী এর প্রতিষ্ঠাতা আমীর নির্বাচিত হন।
পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা: মজার ব্যাপার হলো, আজকের পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত এই দলটি জন্মলগ্নে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের নেতাদের ‘খাঁটি মুসলিম’ হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন মওদুদী। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘তরজুমানুল কুরআন’ পত্রিকায় তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছিলেন:
“পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা হবে আসলে ‘আহাম্মকের বেহেশত’ এবং ‘মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র’।”
পাঠনকোট সম্মেলন (১৯৪৫): ১৯৪২ সালে দলের কার্যালয় লাহোর থেকে গুরুদাসপুরের পাঠানকোটে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪৫ সালের ১৯–২১শে এপ্রিল সেখানে নিখিল ভারত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মওদুদী তাঁর সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক দলের ভিত্তি মজবুত করেন।
দেশভাগ ও রক্তাক্ত উপদলীয় দাঙ্গা (১৯৪৭–১৯৫৫)
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে জামায়াতে ইসলামীও ভৌগোলিক কারণে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। জন্ম নেয় ‘জামায়াতে ইসলামী ভারত’ এবং ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’।
কাশ্মীর যুদ্ধকে ‘হারাম’ ঘোষণা (১৯৪৭): পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধ শুরু হলে মাওলানা মওদুদী ফতোয়া দেন যে, পাকিস্তান সরকার যেহেতু ভারতের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তাই এই যুদ্ধ ‘জিহাদ’ নয় এবং এতে অংশগ্রহণ করা ‘হারাম’। এই ফতোয়ার কারণে পাকিস্তান সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে।
পূর্ব পাকিস্তানে আগমন (১৯৪৮): ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরে ইসলামি সংবিধানের দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে (আজকের বাংলাদেশ) জামায়াতের পূর্ব-পাকিস্তান শাখা খোলা হয়।
পাঞ্জাবের নির্বাচন ও প্রত্যাখ্যান (১৯৫১): ১৯৫০ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৫১ সালের পাঞ্জাব প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াত। কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ তাদের উগ্র তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে, ফলে নির্বাচনে দলটির চরম ভরাডুবি ঘটে।
ভাষার মর্যাদা নিয়ে উদাসীনতা (১৯৫২): ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা যখন নিজেদের মায়ের ভাষা ‘বাংলা’-র মর্যাদার জন্য রাজপথে বুক পেতে দিচ্ছিল, জামায়াতে ইসলামী তখন সেই ভাষা আন্দোলনের চরম বিরোধিতা করে একে ‘উর্দু বনাম বাংলা’র কৃত্রিম বিতর্ক এবং মুসলিম সংহতি বিনষ্টের চক্রান্ত বলে অভিহিত করে।
আহমদীয়া দাঙ্গা ও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ (১৯NT৩–১৯৫৫): ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে জামায়াত পাঞ্জাবে আহমদীয়া বা কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে এক উগ্র ও সহিংস আন্দোলন শুরু করে। মওদুদীর লেখা ‘কাদিয়ানী সমস্যা’ (Qadiani Problem) বইটি এই দাঙ্গার আগুন উস্কে দেয়। লাহোরে আহমদীয়াদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং নৃশংস গণহত্যায় প্রায় ১০,০০০ মানুষ (মতান্তরে কম-বেশি) প্রাণ হারায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সামরিক আইন (Martial Law) জারি করে এবং মাওলানা মওদুদীকে গ্রেফতার করে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের তীব্র কূটনৈতিক চাপে ১৯৫৫ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
পূর্ব পাকিস্তানে শেকড় গাড়ার চেষ্টা ও ছাত্রসংঘ (১৯৫৫–১৯৬৫)
জেল থেকে বের হয়ে মওদুদী বুঝতে পারেন, তরুণদের মগজ ধোলাই না করতে পারলে রাজনীতিতে থিতু হওয়া অসম্ভব।
- ইসলামী ছাত্রসংঘের জন্ম (১৯৫৫): ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (আজকের ছাত্রশিবির) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রথম আমীর হন মাওলানা আবদুর রহীম। এই বছরেই তৎকালীন এক তরুণ শিক্ষক, নাম গোলাম আযম, জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
- গোলাম আযমের উত্থান (১৯৫৭): ১৯৫৬ সালে ছাত্রসংঘ পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার পর, ১৯NT৭ সালের অক্টোবরে গোলাম আযমকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের ‘জেনারেল সেক্রেটারি’ বা সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়া হয়।
- আইয়ুব খানের নিষেধাজ্ঞা (১৯৫৮–১৯৬২): ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে জামায়াতসহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।
- নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা ও ক্ষমতার লোভ (১৯৬৪–১৯৬৫): ১৯৬৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আইয়ুব খান পুনরায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেন এবং মওদুদী ও গোলাম আযমসহ শীর্ষ নেতাদের জেলে পুরেন। তবে অক্টোবর মাসে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দল (COP) যখন কায়েদে আজম জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করে, তখন জামায়াত এক চরম আদর্শিক ভন্ডামির আশ্রয় নেয়। মওদুদী কিতাব লিখেছিলেন যে ‘ইসলামে নারীর নেতৃত্ব হারাম’, অথচ ক্ষমতার লোভে তারা ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়ে বসে। নির্বাচনে হেরে গিয়ে দলটি চরম কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বাঙালির স্বাধিকারের বিরোধিতা ও একাত্তরের নরমেধ যজ্ঞ (১৯৬৬–১৯৭১)
ষাট বা সত্তর দশকের এই অধ্যায়টি জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, রক্তাক্ত এবং নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে একটি আস্ত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরুদ্ধে গিয়ে জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে—তার চরম উদাহরণ একাত্তরের জামায়াত।
- ৬ দফার বিরোধিতা (১৯৬৬): ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ‘৬ দফা’ পেশ করলেন, জামায়াত তখন একে ‘পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় চক্রান্ত’ বলে প্রচার শুরু করে। এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে ১৯৬৭ সালে তারা পাল্টা ‘৫ দফা’ দাবি তোলে।
- আইয়ুবের চাটুকারিতা ও গোলাম আযমের পদোন্নতি (১৯৬৮–১৯৬৯): আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে যখন পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল, তখন মওদুদী ও গোলাম আযম আইয়ুব খানের স্বৈরতন্ত্রের তল্পিবাহক বনে যান। বাঙালিদের এই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে দমন করতে পাকিস্তানিদের সহায়তা করায় পুরস্কারস্বরূপ ১৯৬৯ সালে গোলাম আযমকে ‘পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর’ ঘোষণা করা হয়।
- ১৯৭০-এর নির্বাচন: ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে জামায়াত দেশজুড়ে ১৫১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চরমভাবে আছাড় খায়। পুরো পাকিস্তানে তারা মাত্র ৪টি আসন লাভ করে। বাঙালিরা ব্যালটের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেয়, জামায়াতের রাজনীতিকে তারা পরগাছা মনে করে।
১৯৭১: মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং খুনে বাহিনীর জন্ম
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিঃশব্দে ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করে, জামায়াতে ইসলামী সেই পৈশাচিকতাকে স্বাগত জানায়।
- শান্তি কমিটি গঠন (১১ই এপ্রিল): ঢাকা স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্তে ভাসছে, ঠিক তখনই গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামাত নেতারা টিক্কো খানের সাথে হাত মেলায় এবং ঢাকাসহ দেশজুড়ে ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ (Peace Committee) গঠন করে। এদের মূল কাজ ছিল গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দেওয়া, হিন্দুদের তালিকা তৈরি করা এবং পাকিস্তানি সেনাদের ধর্ষণের জন্য বাঙালি মা-বোনদের তুলে দেওয়া।
- খুনে বাহিনী ‘আল-বদর’ ও ‘রাজাকার’ সৃষ্টি: মে মাসে জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘের’ তৎকালীন প্রধান আশরাফ হোসাইন (জামালপুর) এবং পরবর্তীতে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বে তৈরি হয় এক খুনে স্কোয়াড, যার নাম ‘আল-বদর’। এছাড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে গঠিত হয় ‘রাজাকার’ ও ‘আল-শামস’ বাহিনী।
- দৈনিক সংগ্রাম: বিষাক্ত মুখপত্র: জামায়াতের নিজস্ব পত্রিকা ‘দৈনিক সংগ্রাম’ হয়ে ওঠে এই খুনিদের মুখপত্র। সেখানে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ ও ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যার উস্কানি দেওয়া হতো।
- প্রহসনের নির্বাচন ও শিক্ষামন্ত্রিত্ব: সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানিরা এক পুতুল প্রাদেশিক সরকার গঠন করে, যেখানে জামাত নেতা আব্বাস আলী খানকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়। অক্টোবর মাসে যুদ্ধের মাঝেই একটি প্রহসনের উপ-নির্বাচন দেখিয়ে জামায়াতের ১৪ জন সদস্যকে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
- বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড (ডিসেম্বর ১৯৭১): যখন জামায়াত ও পাকিস্তানিরা বুঝতে পারল যে ভারতের সহায়তায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করে ফেলছে, তখন তারা বাঙালি জাতিকে মেধা শূন্য করার এক নীল নকশা তৈরি করে। ১৪ই ডিসেম্বর বিজয়ের ঠিক দুই দিন আগে, মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে আল-বদর বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও লেখকদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর এর সাথে সাথেই তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা এই পবিত্র মাটিতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাদের শীর্ষ নেতারা, বিশেষ করে গোলাম আযম, ল্যাজেগোবরে হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয় পাকিস্তানে।
ওপার থেকে ষড়যন্ত্র ও নাগরিকত্ব বাতিলের কাল (১৯৭২–১৯৭৭)
দেশ স্বাধীন হলেও পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম এবং তাঁর সহযোগীরা পরাজয় মেনে নেয়নি। তারা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে কেন্দ্র করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ধ্বংস করার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত শুরু করে।
- পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি (১৯৭২): দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই গোলাম আযম পাকিস্তানে বসে মাহমুদ আলী ও খাজা খয়েরউদ্দীনের মতো দেশদ্রোহীদের সাথে মিলে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ (East Pakistan Restoration Committee) গঠন করেন। তিনি নিজেকে তখনো ‘পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর’ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং বিশ্বমঞ্চে প্রচার করতেন যে, ভারত জোর করে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে রেখেছে।
- লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের চক্রান্ত (১৯৭৩–১৯৭৪): ১৯৭৩ সালে লন্ডনে এবং ১৯৭৪ সালে ম্যানচেস্টারের বিভিন্ন ইসলামি সম্মেলনে গোলাম আযম বাংলাদেশবিরোধী তীব্র বক্তব্য দেন। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দিয়ে একটি ‘কনফেডারেশন’ গঠনের জন্য তিনি লবিং শুরু করেন।
- মুসলিম দেশগুলোকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ: ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে গোলাম আযম প্রায় সাতবার সৌদি আরবের বাদশাহর সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন। তিনি রিয়াদ ও মক্কায় গিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে অনুরোধ করেন যেন তারা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয় এবং কোনো প্রকার অর্থনৈতিক সাহায্য না করে।
- নাগরিকত্ব বাতিল (১৯৭৩): এই সমস্ত রাষ্ট্রদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এক সরকারি আদেশে গোলাম আযমসহ ৩৮ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর নাগরিকত্ব বাতিল করে।
পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন ও পুনর্বাসনের রাজনীতি (১৯৭৫–১৯৮০)
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। ক্ষমতার মঞ্চে আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই পটপরিবর্তন জামায়াতের জন্য এক সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করে।
- আইডিএল-এর ছদ্মবেশ (১৯৭৬): ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দল বিধি (পিপিআর) ঘোষণার মাধ্যমে ইনডেমনিটি বা দালাল আইন বাতিল হতে শুরু করলে জামাত নেতারা অন্ধকার থেকে আলোতে আসার সুযোগ পায়। সরাসরি জামাত নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় মাওলানা আবদুর রহীমের নেতৃত্বে তারা ‘ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ’ (IDL) নামক একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে এর ছদ্মবেশে রাজনীতিতে ফেরে।
- ছাত্রসংঘ থেকে ‘ছাত্রশিবির’ (১৯৭৭): ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক গোপন বৈঠকের মাধ্যমে একাত্তরের কুখ্যাত খুনে বাহিনী ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইসলামী ছাত্রশিবির’। এর প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি হন যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলী এবং সাধারণ সম্পাদক হন মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (উভয়েই পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিপ্রাপ্ত)।
- গোলাম আযমের অবৈধ প্রবেশ (১৯৭৮): ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের পরোক্ষ আনুকূল্যে পাকিস্তানি পাসপোর্ট এবং মাত্র তিন মাসের ‘ভিজিট ভিসা’ নিয়ে বাংলাদেশে আসেন গোলাম আযম। এর পর সেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি প্রায় ১৬ বছর (১৯৭৮-১৯৯৪) কোনো প্রকার বৈধ ভিসা বা নাগরিকত্ব ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থান করেন এবং নেপথ্যে থেকে জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
- স্বনামে আত্মপ্রকাশ (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে মে মাসে ঢাকার একটি কনভেনশনের মাধ্যমে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ স্বনামে আত্মপ্রকাশ করে। আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমীর করা হলেও প্রকৃত চাবিকাঠি ছিল গোলাম আযমের হাতেই। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে এই দলটির ৬ জন নেতা সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
প্রকাশ্য রাজনীতি ও ‘রগকাটা’ সন্ত্রাসের বিস্তার (১৯৮০–১৯৯০)
আশির দশকে এসে জামায়াত কেবল রাজনীতিতেই পুনর্বাসিত হয়নি, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের সহযোগী সংগঠন ‘ছাত্রশিবির’-এর মাধ্যমে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
- প্রথম প্রকাশ্য সম্মেলন (১৯৮০): ১৯৮০ সালে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত তাদের প্রথম প্রকাশ্য জনসভা করে।
- শহীদী ক্যাডার ও রগ কাটার রাজনীতি: এই দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ ছাত্র ও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ওপর রগচটা ও নির্মম হামলা শুরু করে ছাত্রশিবির। প্রতিপক্ষের রগ কেটে দেওয়া এবং হাত-পায়ের আঙুল কেটে নেওয়া তাদের রাজনৈতিক ‘ট্রেডমার্ক’ হয়ে দাঁড়ায়।
- এরশাদ আমল ও কৌশলগত জোট (১৯৮৬–১৯৯০): জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের সাথে জামায়াত এক চতুর দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ১০টি আসন লুফে নেয়, আবার ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হলে গণ-অসন্তোষের ভয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাথে এক যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হয়।
গোলাম আযমের আমীর হওয়া এবং শহীদ জননীর ‘গণ-আদালত’ (১৯৯১–২০০০)
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জামায়াতের ঔদ্ধত্য আকাশ স্পর্শ করে, যা বাঙালি জাতির অবদমিত ক্ষোভকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।
- গোলাম আযমের প্রকাশ্য ঘোষণা (১৯৯১): ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির পরোক্ষ সহযোগিতায় জামায়াত ১৮টি আসন লাভ করে। বিজয়ের পর, ১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর জামায়াত এক প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তিতে নাগরিকত্বহীন, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে তাদের আনুষ্ঠানিক ‘আমীর’ ঘোষণা করে। এই ঘটনাটি পুরো বাংলাদেশের আত্মমর্যাদায় এক প্রচণ্ড আঘাত হিসেবে দেখা দেয়।
- শহীদ জননী ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (১৯৯২): গোলাম আযমের এই ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসেন বীর শহীদ শাফী ইমাম রুমীর মা, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারি গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’।
- ঐতিহাসিক গণ-আদালত (২৬শে মার্চ, ১৯৯২): ১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে এক ঐতিহাসিক ‘গণ-আদালত’ অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতীকী আদালতে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, কাদের মোল্লাসহ ৮ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের রায় ঘোষণা করা হয়। এই আন্দোলনটি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
- উচ্চ আদালতের রায় ও নাগরিকত্ব লাভ (১৯৯৪): ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালতের এক বিতর্কিত রায়ে কারিগরি ও আইনি মারপ্যাঁচে গোলাম আযম তাঁর জন্মসূত্রের নাগরিকত্ব ফিরে পান। এর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তারা মাত্র ৩টি আসন পায়।
৪-দলীয় জোট ও গাড়িতে লাল-সবুজের পতাকা (২০০০–২০০৮)
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে জামায়াত বাংলাদেশের মূলধারার ক্ষমতার রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক বা ‘কিংমেকার’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
- ৪-দলীয় জোট গঠন (১৯৯৯): আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হয় ৪-দলীয় জোট, যার অন্যতম প্রধান শরিক ছিল জামায়াত। ২০০০ সালে মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন।
- জাতীয় পতাকার অবমাননা (২০০১–২০০৬): ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৪-দলীয় জোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং জামায়াত ১৮টি আসন পায়। এবার বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে। একাত্তরে যে মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আল-বদর বাহিনী গঠন করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলেন, তাঁরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
যে লাল-সবুজের পতাকাকে চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল আল-বদররা, একাত্তরের সেই খুনিদের সরকারি গাড়িতেই সগৌরবে উড়তে থাকে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই জাতীয় পতাকা। এই দৃশ্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বুকে এক গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়।
শাহবাগ গণজাগরণ এবং ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচার (২০০৮–২০১৩)
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইশতেহার ছিল—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তরুণ প্রজন্মের বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার ২০০৯ সালে সংসদে এই বিচার প্রক্রিয়ার প্রস্তাব পাস করে।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (২০১০): ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ গঠিত হয় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। এর পর একে একে গ্রেফতার করা হয় গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানকে।
- কাদের মোল্লার রায় ও শাহবাগ আন্দোলন (২০১৩): ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ আল-বদর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে মিরপুরের ‘কসাই’ হিসেবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই রায়ে খুনিদের আঙুল উঁচিয়ে হাসিমুখের ছবি দেখে সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে লাখো তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ‘শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ’। ‘কসাই কাদেরের ফাঁসি চাই’—এই এক দাবিতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কেঁপে ওঠে। এই আন্দোলনের চাপে সরকার আইন সংশোধন করে এবং ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারিক ফাঁসির খাতা খোলে।
ইতিহাসের অমোঘ নিয়তি
পরবর্তী সময়ে একে একে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (২০১৫), আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (২০১৫), মতিউর রহমান নিজামী (২০১৬) এবং মীর কাশেম আলীর (২০১৬) ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। আর ৯০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযম ২০১৪ সালে প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
১৯৪১ সালে যে দলটির জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করে, ১৯৭১ সালে যারা সেই পাকিস্তানেরই চাটুকার সেজে বাঙালি নিধনে মেতে উঠেছিল, এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে যারা ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছিল—ইতিহাস তাদের রেহাই দেয়নি। ট্রাইব্যুনালের এই ঐতিহাসিক বিচার কেবল কয়েকজন ব্যক্তির ফাঁসি ছিল না, বরং তা ছিল একটি স্বাধীন দেশের বুকে একাত্তরের পরাজিত ও কুখ্যাত ঘাতকাদর্শের বিরুদ্ধে মানবতার এক ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত বিজয়।
আরও দেখুন:
