মুন্সি প্রেমচাঁদ : ছোট মানুষের বড় গল্পকার | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

যদি কখনো নিঃশব্দ কোনো শীতের রাতে ‘পৌষ কি রাত’-এর কৃষক হালকু আর তার পোষা কুকুর জাবরার হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় চটের নিচে কুঁকড়ে শুয়ে থাকার গল্পটা পড়েন, কিংবা ‘কাফন’-এর ঘিসু আর মাধবের সেই চরম নিষ্ঠুর বুভুক্ষার মুখোমুখি হন—তবে পলিমাটির ভূখণ্ডের আসল রূপটা আপনার বুকের ভেতর চিরকালের জন্য গেঁথে যাবে। বিধাতা মুন্সী প্রেমচন্দকে আয়ু দিয়েছিলেন ৫৬ বছর, ২ মাস এবং ৮ দিন। এই সাড়ে পাঁচ দশকের সংক্ষিপ্ত জীবনকালে তিনি উপন্যাসে আর আফসানায় এমন এক রক্তমাংসের সাধারণ মানুষকে এঁকে গেছেন, যার সমকক্ষ বাস্তবতা গোটা উপমহাদেশের সাহিত্যে মেলা ভার।

তাঁর লেখা পড়লে কোনো অলীক রূপকথার সুবাস পাওয়া যায় না; বরং পাওয়া যায় ভিজে মাটির তিতা গন্ধ, মহাজনের চাবুকের চিহ্ন, আর ভুখা পেটের আকুল হাহাকার। প্রেমচন্দ ছিলেন সেই বিরল সাহিত্যসাধক, যিনি রাজপ্রাসাদ কিংবা অভিজাত ড্রয়িংরুমের গালিচা মাড়িয়ে সাহিত্যের সিংহাসনে বসেননি; বসেছিলেন গাঁয়ের কাদা-মাখা মেঠোপথে, চটের চাটাইয়ে।

আজ ৩১ জুলাই, প্রেমচন্দের জন্মতিথি। এই মহাকাব্যিক পথপ্রদর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের গহীনে চেপে রাখা অবদমিত ঋণ স্বীকারের বিনম্র প্রয়াসেই আজকের এই চেষ্টা।

মুন্সী প্রেমচন্দ

“Hamari kasauti par wah sahitya khara utrega jisme chintansheelata ho, swadhinata ki parampara ho, saundarya ka sar ho, srijan ki atma ho… Jo humme gatishilta, sangharsh aur bechaini paida kare, sulaaye nahi, kyunki ab sone ka waqt nahi hai.”

উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের অবিসংবাদিত পুরুষ মুন্সী প্রেমচন্দের এই ঐতিহাসিক বক্তব্যের সহজ বাংলা রূপান্তর করলে দাঁড়ায়—

“আমাদের কষ্টিপাথরে কেবল সেই সাহিত্যই টিকে থাকবে, যার মধ্যে চিন্তাশীলতা আছে, স্বাধীনতার চেতনা আছে, সৌন্দর্যের নির্যাস আছে আর আছে সৃষ্টির মূল আত্মা… যা আমাদের ভেতরে গতিশীলতা, সংগ্রাম ও অস্বস্তি তৈরি করবে—আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখবে না, কারণ এখন আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নয়।”

আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে সাহিত্যকে সস্তা বিনোদনের খোলস ছাড়িয়ে সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার এই আহ্বান জানিয়েছিলেন মুন্সী প্রেমচন্দ। যিনি সমাজকে কোনো কৃত্রিম সৌন্দর্য বা রোমান্টিকতার চাদরে ঢেকে দেখতেন না। গ্রামীণ ভারতের অনাহার, বর্ণপ্রথার বিষাক্ত ছোবল আর শোষণের নগ্ন রূপ তিনি তাঁর কলমের ডগায় তুলে আনতেন। আর এই অপরাধেই তাঁকে রাজরোষে পড়তে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে চরম অর্থকষ্ট আর ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু প্রেমচন্দ তাঁর মকসো করা ধারালো কলমকে কখনো থামতে দেননি।

ধনপৎ রায় থেকে ‘প্রেমচন্দ’

আমাদের ভাবনায় সাহিত্যিকদের নিয়ে যে আভিজাত্যের ছবি ভেসে ওঠে, প্রেমচন্দের জীবন ছিল তার ঠিক বিপরীত। ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই বারাণসীর কাছে লমহী গ্রামের এক অত্যন্ত দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন ধনপৎ রায় শ্রীবাস্তব—যাঁকে সাহিত্যজগৎ আজ ‘মুন্সী প্রেমচন্দ’ নামে চেনে। মাত্র সাত বছর বয়সে মাতৃহীন হওয়া, বাল্যকালে সৎমায়ের অবহেলা এবং বারো বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়া—অভাব আর নিঃসঙ্গতাই ছিল তাঁর শৈশবের নিত্যসঙ্গী।

সংসারের পেটের ভাত জোগাতে মাত্র পনেরো বছর বয়সে গৃহশিক্ষকতা শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই চরম দারিদ্র্যও তাঁর ভেতরের পড়ার তৃষ্ণাকে দমাতে পারেনি। কেরোসিনের ঝাপসা আলোয় বসে তিনি পড়ে ফেলতেন একের পর এক ফারসি, উর্দু আর বিশ্বসাহিত্যের সেরা সব বই। প্রথমে ‘নওয়াব রায়’ ছদ্মনামে উর্দুতে আফসানা লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্রথম গল্পসংকলন প্রকাশ হতেই শাসকশ্রেণীর সাথে তাঁর সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

‘সোজ-এ-ওয়াতন’ ও ব্রিটিশ রাজের আগুন

১৯০৮ সালে প্রকাশিত হয় নওয়াব রায়ের (প্রেমচন্দ) প্রথম উর্দু গল্পসংকলন ‘সোজ-এ-ওয়াতন’ (দেশের বেদনা)। পরাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও পলিমাটির মানুষের জাগরণের সেই গল্পগুলো ইংরেজ হামিরপুরের জেলা কালেক্টরের হাতে পৌঁছামাত্র তোলপাড় শুরু হয়। ইংরেজ শাসকরা এই গল্পগুলোকে চরম ‘রাজদ্রোহ’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

প্রেমচন্দকে তলব করা হয়। তাঁর চোখের সামনেই ‘সোজ-এ-ওয়াতন’-এর সাতশো কপি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় এবং কড়া নির্দেশ জারি করা হয়—অনুমতি ছাড়া নওয়াব রায় আর এক ছত্রও লিখতে পারবেন না। কিন্তু সত্যের কণ্ঠ কি আর আগুনে পুড়িয়ে মারা যায়? নওয়াব রায় রূপ বদলে আত্মপ্রকাশ করলেন ‘প্রেমচন্দ’ নামে। আর সেই নতুন নামেই উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যে রচিত হলো এক চিরভাস্বর ইতিহাস।

প্রেমচন্দের গল্প: নিঃস্ব মানুষের ক্ষত ও আদিম সত্য

প্রেমচন্দ বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের কাজ চোখ জুড়ানো নয়, বরং বন্ধ চোখগুলোকে ফুটিয়ে দেওয়া। গ্রামীণ ভারতবর্ষের মহাজনী শোষণ, ধর্মীয় ভণ্ডামি আর চরম দারিদ্র্যকে তিনি যেভাবে সাহিত্যের ক্যানভাসে এনেছেন, তা পাঠককে থমকে দিতে বাধ্য করে।

‘কাফন’ (Kafan):

উর্দু আফসানার ইতিহাসে সবচেয়ে শকিং ও বিতর্কিত গল্পগুলোর একটি। চরম দারিদ্র্য কীভাবে মানুষের ভেতরের মানবিক অনুভূতিগুলোকে একদম মেরে ফেলে, প্রেমচন্দ এখানে তা নির্মমভাবে দেখিয়েছেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ঘরের ভেতরে ব্যথায় কঁাদছে মাধবের স্ত্রী বুদ্ধিয়া, আর বাইরে বসে বাবা ঘিসু ও ছেলে মাধব কড়াইতে আলু সেদ্ধ করে খাচ্ছে—এই ভয়ে যে একজন উঠে গেলে অন্যজন সব আলু একা খেয়ে ফেলবে! বুদ্ধিয়া মারা যাওয়ার পর কাফনের কাপড় কেনার জন্য গ্রামবাসীর কাছ থেকে যে টাকা চাওয়া হয়, সেই টাকা দিয়ে কাফন না কিনে বাবা-ছেলে মিলে সরাইখানায় গিয়ে মদ, পুরি আর মাংস খেয়ে আনন্দ করে। প্রেমচন্দ দেখালেন, চরম অনাহার মানুষকে নীতি-নৈতিকতার উর্ধ্বে নিয়ে কীভাবে এক আদিম পশুতে পরিণত করে।

‘পৌষ কি রাত’ (Paus Ki Raat):

শীতের রাতে নিজের সামান্য এক টুকরো খেত পাহারা দিচ্ছে কৃষক হালকু আর তার পোষা কুকুর জাবরা। মহাজনের পাওনা মেটাতে গিয়ে গায়ের চাদর বিক্রি করে দেওয়ায় তার গায়ে কোনো গরম কাপড় নেই। খেতের পাশে পাতা পুড়িয়ে আগুন পোহাতে পোহাতে একসময় তন্দ্রা নেমে আসে। বুনো গোরুর দল যখন তার পুরো খেতের ফসল খেয়ে তছনছ করে দিচ্ছে, হালকু তা জেনেও শীতের ভয়ে আগুন ছেড়ে ওঠে না। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সে এক অদ্ভুত শান্তি পায়—কারণ কাল থেকে আর এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় খেত পাহারা দিতে আসতে হবে না! শোষিত কৃষকের এই করুণ মনস্তত্ত্ব প্রেমচন্দ ছাড়া কে আর এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারত?

‘ঈদ্গাহ’ (Idgah):

চার বছরের এতিম বালক হামিদের হৃদয়স্পর্শী গল্প। ঈদের মেলায় অন্য শিশুরা যখন খেলনা আর মিষ্টি কেনায় ব্যস্ত, তখন তিন পয়সার সম্বল নিয়ে হামিদ মেলায় গিয়ে কেনে একটা লোহার চিমটা! কারণ রুটি সেকার সময় তার বুড়ি দাদী আমিনার হাত আগুনে পুড়ে যায়। চার বছরের একটা শিশুর ভেতরের এই অকালপক্ব সহানুভূতি ও ভালোবাসা পড়ে চোখের জল ধরে রাখা অসম্ভব।

‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ (Shatranj Ke Khilari):

লখনউয়ের পতন ও দেশীয় অভিজাত শ্রেণীর দেউলিয়াত্বের এক অনন্য রাজনৈতিক দলিল। অযোধ্যার চারপাশে যখন ব্রিটিশ ফৌজ ঘেরাও করছে, দেশ ধ্বংসের মুখে, তখন লখনউয়ের দুজন নবাব মীর ও মির্জা নিজেদের ঘরের কোণে বসে দাবার চালে মগ্ন। বাস্তব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরাবাস্তব এক জগতে নিজেদের বুঁদ করে রাখা এই শাসকশ্রেণীর মানসিকতাই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরাধীনতার মূল কারণ।

‘গোদান’ (Godaan):

এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি ভারতীয় কৃষিজীবী সমাজের এক শোকগাথা। প্রধান চরিত্র হোরির একমাত্র স্বপ্ন ছিল একটি গাভী বা গরুর মালিক হওয়া। কিন্তু মহাজনী শোষণের চক্র, ধর্মীয় শাসন আর ঋণের জোয়ালে পিষ্ট হয়ে হোরির সেই সামান্য স্বপ্নটাও অধরা থেকে যায়। মৃত্যুর মুহূর্তে যখন পুরোহিত তার কাফনের বদলে ‘গোদান’ (গরু দান) করতে বলে, তখন হোরির স্ত্রী ধনিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে—ঘরে তো কোনো গরু নেই, এই দুটো পয়সাই তার জীবনের শেষ সঞ্চয়, এটাই গোদান হিসেবে মেনে নাও!

প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলন ও লখনউ ভাষণ

১৯৩৬ সালে লখনউতে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’ (PWA)-এর প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন। সেখানে উদ্বোধনী সভাপতি হিসেবে প্রেমচন্দ যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা ভারতীয় সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন: “হমে হাসন কা মেয়ার বদলনা হোগা” (আমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি বদলে ফেলতে হবে)। রূপ কেবল রূপসী নারীর সাজগোজের প্রসাধনে থাকে না; রূপ লুকিয়ে থাকে খেটে খাওয়া শ্রমিকের ঘামে, কৃষকের কাদা-মাখা হাতে আর অধিকার আদায়ের শান্ত চোখে।

শেষ দিনগুলো: অসম্পূর্ণ ‘মঙ্গলসূত্র’ ও প্রয়াণ

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে চরম শারীরিক অসুস্থতা আর অর্থনৈতিক অনটন প্রেমচন্দকে ছেঁকে ধরেছিল। পাকস্থলীর ক্ষয়রোগ ও লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর হাত থেকে কলম মেলেনি।

দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে করতেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর শেষ অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মঙ্গলসূত্র’। ১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে বারাণসীতে এই মহান কথাসাহিত্যিক চিরতরে চোখ বুজলেন। বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেমন সাধারণ মানুষের দরদী ছিলেন, উর্দু ও হিন্দিতে প্রেমচন্দ ছিলেন ঠিক তেমনি পলিমাটির মেহনতি মানুষের এক অবিনাশী প্রতিনিধি।

প্রেমচন্দের প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়

আজ প্রেমচন্দের প্রয়াণের প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যে কৃষক সংকট, যে সামাজিক বৈষম্য আর যে বুভুক্ষার কথা তিনি লিখে গিয়েছিলেন, তা আজও আধুনিক সভ্যতার গালে এক মস্ত বড় থাপ্পড় হয়ে টিকে আছে।

প্রেমচন্দ আমাদের শেখান—চকচকে ভাষার আড়ালে জীবনকে না ঢেকে, তার ক্ষতগুলোকে নির্ভয়ে সাহিত্যিক ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে হয়।

যতোই ভালোবাসুন, প্রেমচন্দকে যথেষ্ট ভালোবাসা যায় না, তাঁর পলিমাটির সুবাসের গভীরে পুরোপুরি পৌঁছানো যায় না।