আহমেদ নাদিম কাসমি : পঞ্জাবের গ্রাম্য জীবনের গল্পকার | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

যদি কখনো কোনো অলস বা বিষণ্ণ বিকেলে তাঁর ‘পারমেশ্বর সিং’ গল্পটির পাতা উল্টে বসেন—যেখানে দেশভাগের নারকীয় তাণ্ডবের মাঝে এক শিখ গ্রামবাসী কুড়িয়ে পাওয়া এক মুসলিম শিশুকে পরম স্নেহে বুকে টেনে নেয় এবং তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে সীমান্তে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়—তবে আপনার বুকের গহীনে এক গভীর, নিঃশব্দ মোচড় অনুভব করবেন। বিধাতা আহমেদ নাদিম কাসমিকে আয়ু দিয়েছিলেন ৮৯ বছর, ৭ মাস এবং ২০ দিন (১৯১৬ – ২০০৬)। সেই দীর্ঘ প্রায় নয় দশকের জীবনে তিনি উর্দু কথাসাহিত্য ও কবিতাকে স্রেফ কাগজের শব্দে আটকে রাখেননি; তাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন পঞ্জাবের ভিজে মাটি, সোনালী খেত, সামন্তবাদী শোষণ এবং মানুষের অবিনাশী ভালোবাসার সাথে।

তিনি ছিলেন একাধারে গল্পকার, কবি, সাংবাদিক এবং উর্দু সাহিত্যের কালজয়ী সাময়িকী ‘ফনুন’-এর রূপকার। প্রগতিশীল লেখক সংঘের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী হয়েও কাসমির সাহিত্য কখনো শুষ্ক রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়নি। তিনি ছিলেন মূলত মানুষের হৃদয়ের কারিগর। পঞ্জাবের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি ধূলিকণা, কৃষকের ক্ষোভ, রক্তের বদলা এবং মানবিক অনুভূতির এমন গভীর চিত্রায়ন আর কোনো উর্দু সাহিত্যিকের গল্পে এত জীবন্তভাবে পাওয়া যায় না।

আজ এই মহাকাব্যিক গল্পকার ও সাহিত্যসাধকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ঋণ স্বীকার করেই আজকের এই আয়োজন।

আহমেদ নাদিম কাসমি

“Kudaura ho ya Parmeshar Singh, insani dil ki mithaas har nafrat se badi hoti hai… Adab ka kaam nafrat phailana nahi, balki nafrat ke tufaan mein muhabbat ka ek chhota sa diya jalaye rakhna hai.”

উর্দু আফসানা ও কাব্যজগতের এই প্রজ্ঞাবান পুরুষের চিরন্তন ভাবনার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—

“কুদৌরা হোক কিংবা পারমেশ্বর সিং, মানুষের হৃদয়ের গভীর স্নেহের শক্তি যেকোনো ঘৃণার চেয়ে বহুগুণ বড়… সাহিত্যের কাজ সমাজে ঘৃণা ছড়ানো নয়, বরং ঘৃণার উত্তাল ঝড়ের মধ্যেও ভালোবাসার এক টুকরো প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা।”

আজ থেকে বহু বছর আগে প্রগতিশীল আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দাঁড়িয়ে এই অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন আহমেদ নাদিম কাসমি। যিনি শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধকে কখনো হারিয়ে যেতে দেননি।

কাসমির ছেলেবেলা ও শাহপুর উপত্যকার বাতাস

১৯১৬ সালের ২০ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের পঞ্জাব প্রদেশের সারগোধা জেলার (শাহপুর) অন্তর্গত ‘আঙা’ নামের এক দুর্গম ও সুন্দর গ্রামে আহমেদ নাদিম কাসমির জন্ম। শৈশবেই পিতৃহীন হওয়ায় অত্যন্ত কঠিন অভাব ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশোর কেটেছে। তবে পঞ্জাবের সেই সোপান উপত্যকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের সাদামাটা জীবন তাঁর অবচেতন মনে সাহিত্যের এক গভীর বীজ বুনে দিয়েছিল।

বাহাওয়ালপুরের এস.ই. কলেজ থেকে ১৯৩৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর জীবিকার তাগিদে কাসমিকে নানা সরকারি চাকরি ও সাংবাদিকতায় নামতে হয়। লাহোরের সাহিত্যিক আড্ডায় যুক্ত হয়ে তিনি খুব অল্প বয়সেই কবিতা ও ছোটগল্পে নিজের অনন্য প্রতিভার সাক্ষর রাখেন।

প্রগতিশীল আন্দোলন ও পঞ্জাবের মেঠো সুর

১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রগতিশীল লেখক সংঘ (PWA)-এর সাথে যুক্ত হন কাসমি। পরবর্তীতে তিনি এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। প্রেমচন্দ, কৃষণ চন্দর এবং মান্টোর সমসাময়িক হলেও কাসমির গল্প বলার ভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তিনি শহুরে কফি হাউজের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার চেয়ে পঞ্জাবের মেঠো পথকে বেশি ভালোবেসেছিলেন:

  • গ্রামীণ মনস্তত্ত্ব: সামন্তপ্রভু (চৌধুরী ও জাঁহাবাজ) এবং সাধারণ মেহনতি কৃষকের মধ্যকার দ্বন্দ তিনি সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • অনুগল্প ও আফসানা: পঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কোন্দল, অনার কিলিং বা বংশগত শত্রুতার পেছনের আদিম আবেগ তিনি উন্মোচিত করেছেন।
  • কবিতা ও গদ্যের মেলবন্ধন: কবি হওয়ার সুবাদে তাঁর ছোটগল্পের গদ্য ছিল কাব্যিক লালিত্য ও সুগভীর অনুভূতিতে ভরপুর।

কাসমির গল্প: পঞ্জাবের ধুলোবালি, রক্ত ও নিবিড় মানবিকতা

আহমেদ নাদিম কাসমির অসংখ্য গল্পসংকলন উর্দু আফসানায় ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে, যার মধ্যে ‘চৌপাল’ (Chaupal), ‘গান্দাসা’ (Gandasa), ‘থল’ (Thal) এবং ‘কপাস কা ফুল’ (Kapas Ka Phool) অন্যতম।
‘পারমেশ্বর সিং’ (Parmeshar Singh):
দেশভাগের দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লেখা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক গল্প। দাঙ্গার আগুনে যখন চারপাশ জ্বলছে, তখন শিখ গ্রামবাসী পারমেশ্বর সিং কুড়িয়ে পায় এক হারিয়ে যাওয়া মুসলিম বালক মোস্তফাকে। নিজের নিখোঁজ ছেলের স্মৃতিতে সে মোস্তফাকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করে, তার নাম রাখে আখতার। কিন্তু সমাজ ও ধর্মীয় পার্থক্য যখন শিশুটিকে হুমকি দেয়, তখন পারমেশ্বর সিং তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে সীমান্তে নিয়ে যায় যাতে তাকে তার আসল মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। সীমান্তে পাকিস্তানি প্রহরীদের গুলিতে পারমেশ্বর সিং ঢলে পড়ে, কিন্তু প্রমান করে যায় ধর্মীয় বিভাজনের চেয়ে পিতৃত্বের টান অনেক বড়।
‘গান্দাসা’ (Gandasa):
পঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী অশুভ প্রতিশোধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রচিত গল্প। কাহিনীর নায়ক সুলতান তার বাবার হত্যার বদলা নিতে হাতে তুলে নেয় ‘গান্দাসা’ (পঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী এক ধরণের ধারালো অস্ত্র)। কিন্তু প্রতিশোধের চূড়ান্ত মুহূর্তে এক অবোধ শিশুর নিষ্পাপ হাসি তার হাতের অস্ত্রকে স্তব্ধ করে দেয়। (এই বিখ্যাত গল্পটির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে পঞ্জাবি চলচ্চিত্রের বিখ্যাত ‘মৌলা জাট’ ধারার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল)।
‘আল-হামরা’ ও ‘থল’ (Thal):
পঞ্জাবের শুষ্ক মরুময় এলাকা ‘থল’-এর মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল। প্রচণ্ড জলকষ্ট, সামন্তপ্রভুদের অত্যাচার এবং প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে লড়াই করেও পলিমাটির মানুষ কীভাবে নিজের স্বভিমান টিকিয়ে রাখে, কাসমি তা পরম মমতায় এঁকেছেন।

‘ফনুন’ সাময়িকী, কাব্যচর্চা ও জীবনের শেষ অধ্যায়

১৯৬৩ সালে আহমেদ নাদিম কাসমি ও হাবিব আশআর যৌথভাবে প্রকাশ করেন সাহিত্য সাময়িকী ‘ফনুন’ (Fanoon)। প্রায় চার দশক ধরে ‘ফনুন’ ছিল উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও প্রভাবশালী কাগজ। পারভীন শাকির, আমজাদ ইসলাম আমজাদ কিংবা মুস্তাক আহমেদ ইউসুফীর মতো সাহিত্যিকদের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশে ‘ফনুন’-এর অবদান ছিল ঐতিহাসিক।

কাসমি কেবল কথাসাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক উর্দু গজল ও নাজম সাহিত্যের এক শীর্ষপুরুষ। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ এবং ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করে। ২০০৬ সালের ১০ জুলাই, ৮৯ বছর বয়সে লাহোরের এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই প্রজ্ঞাবান ও দরদী সাহিত্যসাধক চিরতরে বিদায় নেন।

কাসমির প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়

আজ যখন বিশ্বজুড়ে মানুষে মানুষে হিংসা, ধর্মীয় উগ্রতা ও শ্রেণিবৈষম্যের দেয়াল উঁচু হচ্ছে, তখন আহমেদ নাদিম কাসমির ‘পারমেশ্বর সিং’ বা ‘কপাস কা ফুল’-এর মতো গল্পগুলো আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—অস্ত্রের বদলে ভালোবাসা দিয়েই মানুষের ভেতরের পশুত্বকে জয় করা সম্ভব।