রাগ বৃন্দাবনী সারং | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুপুরের প্রখর রোদ্দুর আর উদাসীন ভূখণ্ডে পা রাখলে যে রাগটি তার ঋজু রূপ, স্নিগ্ধ চপলতা এবং এক অদ্ভুত ভক্তি ও তৃষ্ণার ভাব নিয়ে কানে বাজে, তা হলো ‘রাগ বৃন্দাবনী সারং’ (বা সংক্ষেপে বৃন্দাবনী সারং)। হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান ‘সারং অঙ্গ’-এর মূল প্রতিনিধি হিসেবে এই রাগটিকে গণ্য করা হয়। পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি প্রথমাংশের বৃন্দাবন এবং সেখানে গোপীদের ব্যাকুল আহ্বানের সাঙ্গীতিক প্রতীক হলো এই সুর। প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন বৃন্দাবনী সারং-এর সুরতরঙ্গ এক পরম শীতলতা ও আধ্যাত্মিক আবেশের সঞ্চার করে।

সঙ্গীত শাস্ত্রে অঞ্চল ও ঘরানাভেদে এটি ‘বৃন্দাবনী সারং’, ‘বৃন্দাবনী’ বা কেবল ‘সারং’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

সারং পরিবারের উৎপত্তি মূলত লোকসুর এবং ব্রজধামের ভক্তিমূলক সঙ্গীত ধারা থেকে। প্রাচীন সঙ্গীতগ্রন্থে বলা হয়েছে, মধ্যাহ্নের খটখটে রোদে যখন রাখাল বালকেরা বাঁশি বাজাত, তখন সেই মেঠো সুরের মার্জিত ও ব্যাকরণসিদ্ধ রূপটিই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বৃন্দাবনী সারং হিসেবে স্থান পায়।

এটি কাফী ঠাটের অন্তর্গত হলেও এর স্বর কাঠামো অত্যন্ত সরল ও সুনির্দিষ্ট। রাগটির প্রধান রস হলো শৃঙ্গার (প্রেম ও আকুলতা) এবং করুণ রস। দুপুরের তপ্ত আবহেও এই রাগ শ্রোতার মনে এক ধরণের গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কাফী ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: র (ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: গান্ধার (গ) এবং ধৈবত (দ) স্বর দুটি আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ নিখাদ (ন – কেবল আরোহে), কোমল নিখাদ (ণ – কেবল অবরোহে) এবং ষড়্‌জ (স)।
  • সময়: মধ্যাহ্নকাল বা দিনের দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: চপল, সজীব, উদাসীন অথচ গভীর ভক্তিভাবাপন্ন।
আরোহণ: স র ম প ন র্স
অবরোহণ: র্স ণ প ম র, র ম প র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
র ম প, ন র্স ণ প, ম র, স র ন স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

বৃন্দাবনী সারং-এর আসল পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে এর অতি সরল অথচ ধারালো স্বরচলনের ওপর। এই রাগে গান্ধার ও ধৈবত সম্পূর্ণ বাদ পড়ার কারণে এর সুর কাঠামো অত্যন্ত পরিষ্কার ও ঋজু।

১. দুই নিখাদের প্রয়োগ: এই রাগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর দুই নিখাদের ব্যবহার। আরোহণে সোজা শুদ্ধ নিখাদ (ন) ব্যবহার করে তারা সপ্তকের ষড়্‌জে যাওয়া হয়, আর অবরোহণে ফেরার সময় স্পষ্ট কোমল নিখাদ (ণ) স্পর্শ করে পঞ্চমে নামা হয় (র্স ণ প)।

২. ঋষভ ও পঞ্চমের জোর: বাদী স্বর ‘ঋষভ’ এবং সমবাদী ‘পঞ্চম’ হওয়ার কারণে সুরের বিস্তার মূলত মধ্য ও তারা সপ্তককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বিশেষ করে র ম প র স বাক্যাংশে ঋষভের ওপর খানিকটা দাঁড়িয়ে থাকা রাগটির চরিত্র ফুটিয়ে তোলে।

৩. সারং অঙ্গের টান: অবরোহে ম র বা ম প র স চলনে সারং পরিবারের সেই পরিচিত মিষ্টি মেঠো টানটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ধ্রুপদ, খেয়াল, সেতার, সারোদ ও বাঁশির পাশাপাশি সুগম সঙ্গীত, ভজন এবং লোকসঙ্গীতে বৃন্দাবনী সারং-এর বিপুল প্রযোগ রয়েছে। প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ওস্তাদদের বাঁশি কিংবা তারযুক্ত যন্ত্রে দুপুরের প্রহরে এই রাগের আলাপ পরিবেশন মেহফিলকে এক অপার্থিব শান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, মধ্যাহ্নকালের বৃন্দাবনী সারং রাগের সুরতরঙ্গ মানুষের ক্লান্তি, রক্তচাপ ও শারীরিক উত্তাপ প্রশমিত করতে সাহায্য করে। দুপুরের অলস সময়ে যখন মানুষের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, তখন এই রাগের পরিষ্কার স্বরপ্রক্ষেপণ মেজাজকে চাঙ্গা রাখতে এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ শুদ্ধ সারং: সারং পরিবারের আরেকটি প্রধান রাগ; এতে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ ধৈবতের কাজ থাকে, যা একে বৃন্দাবনী থেকে আলাদা করে।
  • রাগ মিঞাঁ কি সারং: মিঞাঁ তানসেনের প্রবর্তিত সারং রূপ; যেখানে কানাড়া বা মল্লার অঙ্গের প্রভাবে গম্ভীর ছায়াপাত ঘটে।
  • রাগ সামন্ত সারং: সারং অঙ্গের রাগ হলেও এতে অবরোহণে ধৈবতের সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়।
  • রাগ মেঘ: বৃন্দাবনী সারং-এর সাথে স্বরগত গভীর মিল রয়েছে (উভয়ই ঔড়ব-ঔড়ব এবং একই স্বর ব্যবহৃত হয়), তবে মেঘের গায়কি ও আন্দোলন বৃন্দাবনী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও গম্ভীর।

উপসংহার

রাগ বৃন্দাবনী সারং হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই কালজয়ী সৃষ্টি, যা দুপুরের শুষ্ক রোদ্দুরকেও সুরের জলে সিক্ত করে তুলতে পারে। কোনো জটিল অলঙ্কার বা ভারী স্বরবিন্যাস ছাড়াই কেবল পাঁচটি স্বরের নিখুঁত জাদুতে এটি মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। নির্জন দুপুরে যখন বাঁশির তান কিংবা খেয়ালের বন্দিশে বৃন্দাবনী সারং-এর ‘র ম প ন র্স’-র আহ্বান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে নিয়ে যায় এক মেঠো উদাসীন আধ্যাত্মিক সুরলোকে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — সারং অঙ্গ ও কাফী ঠাটের রাগ বিশ্লেষণ।