রাগ লঙ্কা দহন সারং | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন ও অপ্রচলিত বিরল রাগের তালিকায় পা রাখলে এমন কিছু রত্নের সাক্ষাৎ মেলে, যার নাম এবং সুরবিন্যাস—উভয়ই বিস্ময় উদ্রেক করে। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী, বিরল এবং পৌরাণিক ভাবসম্পন্ন রাগ হলো ‘রাগ লঙ্কা দহন সারং’ (বা সংক্ষেপে লঙ্কা দহন সারং)। সারং পরিবারের এই রূপটি সাধারণ মেহফিলে খুব কম শোনা গেলেও ধ্রুপদী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং প্রাচীন ওস্তাদদের খেয়াল ও ধ্রুপদ বন্দিশের ভাণ্ডারে এর এক বিশেষ আভিজাত্যময় মর্যাদা রয়েছে।

নামের দিক থেকে রামায়ণের মহাকাব্যিক ঘটনা ‘লঙ্কাদহন’-এর সাথে যুক্ত থাকায় এই রাগের ভেতরে এক ধরনের তীব্র বীর রস, ব্যাকুলতা এবং আগুনের রূপক জড়িয়ে রয়েছে বলে ধরা হয়।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গবেষক এবং পণ্ডিতদের মতে, ‘লঙ্কা দহন সারং’ রাগটি সারং অঙ্গ এবং কাফী/খামাজ অঙ্গের প্রভাবে গড়ে ওঠা এক বিশেষ প্রাচীন রূপ। পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে এবং পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধনের সঙ্গীতশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে এটিকে কাফী ঠাটের অন্তর্গত হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সারং পরিবারের সাধারণ রূপগুলোতে (যেমন বৃন্দাবনী সারং) গান্ধার স্বরটি সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয়। কিন্তু লঙ্কা দহন সারং-এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য হলো—এর অবরোহণে অত্যন্ত বক্র ও সূক্ষ্মভাবে কোমল গান্ধারের (জ্ঞ) প্রয়োগ করা হয়। এই বিশেষ কোমল গান্ধারের উপস্থিতিই রাগটিকে অন্যান্য সারং থেকে আলাদা করে এক নাটকীয় ও গম্ভীর মেজাজ দান করে।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কাফী ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হয়; অবরোহণে কোমল গান্ধার ও কোমল ধৈবতের বক্র স্পর্শের কারণে এটি সম্পূর্ণ রূপ নেয়)।
  • বাদী স্বর: র (ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও ধৈবত (দ) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (জ্ঞ – অবরোহে অতি সূক্ষ্ম ও বক্রভাবে), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), কোমল ধৈবত (দ – বক্র), শুদ্ধ ও কোমল নিখাদ (ন/ণ) এবং ষড়্‌জ (স)।
  • সময়: মধ্যাহ্নকাল বা দিনের দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, ব্যাকুল, বীর ও করুণ রসের এক অদ্ভুত সমাহার।
আরোহণ: স র ম প, ন র্স
অবরোহণ: র্স ণ দ প, ম প, জ্ঞ ম র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, ন র্স ণ দ প, ম প জ্ঞ ম র, স র নি স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

লঙ্কা দহন সারং রাগের প্রধান কারিগরি চাবিকাঠি ও গায়কি জটিলতা লুকিয়ে রয়েছে এর কোমল গান্ধার (জ্ঞ) ও কোমল ধৈবতের (দ) বক্র ব্যবহারের ওপর।

১. কোমল গান্ধারের বিশেষ কাজ: সাধারণ সারং-এর আরোহণ স র ম প এবং তারা সপ্তকের ন র্স স্পর্শ করার পর অবরোহণে যখন ম প জ্ঞ ম র স বা ম প জ্ঞ ম র টুকরোটি নেওয়া হয়, তখন কোমল গান্ধারের মিষ্টি অথচ তীব্র ছোঁয়া রাগটিতে এক ব্যাকুলতার সৃষ্টি করে।

২. মিঞাঁ কি সারং-এর সাথে পার্থক্য: অনেকে একে ‘মিঞাঁ কি সারং’-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেন। তবে মিঞাঁ কি সারং-এ কোমল গান্ধারের কাজ কানাড়া অঙ্গের প্রভাবে অনেক বেশি আন্দোলনভিত্তিক ও গম্ভীর। অন্যদিকে, লঙ্কা দহন সারং-এ কোমল গান্ধার খুব সামান্য ও দ্রুত মীড় আকারে স্পর্শ করে ঋষভে ফিরে আসা হয়।

৩. ধৈবতের প্রক্ষেপণ: অবরোহে পঞ্চমে নামার সময় র্স ণ দ প চালের সূক্ষ্ম প্রয়োগ রাগটির প্রাচীন রূপকে স্পষ্ট করে তোলে।

ধ্রুপদ এবং প্রাচীন ঘরানাদার খেয়াল বন্দিশে এই রাগের আসল মেজাজ ফুটে ওঠে। বিষ্ণুপুর ঘরানা এবং গোয়ালিয়র ঘরানার প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে লঙ্কা দহন সারং-এর কিছু ঐতিহাসিক ধ্রুপদ বন্দিশের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ বৃন্দাবনী সারং: সারং পরিবারের মৌলিক রূপ; তবে এতে কোমল গান্ধার বা ধৈবতের কোনো স্থান নেই, যা লঙ্কা দহন সারং-এ রয়েছে।
  • রাগ মিঞাঁ কি সারং: তানসেন প্রবর্তিত রূপ; লঙ্কা দহনের সাথে স্বরগত মেল থাকলেও মিঞাঁ কি সারং-এ কানাড়া অঙ্গের আন্দোলন অনেক বেশি স্পষ্ট।
  • রাগ সামন্ত সারং: এতে অবরোহে ধৈবত ও কোমল নিখাদের কাজ থাকে, কিন্তু কোমল গান্ধার ব্যবহৃত হয় না।
  • রাগ শুদ্ধ সারং: কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগ; এতে কড়ি মধ্যম ব্যবহৃত হয়, যা লঙ্কা দহন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাগ লঙ্কা দহন সারং হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অপ্রচলিত সাঙ্গীতিক ভাণ্ডারের এক মূল্যবান দলিল। প্রথাগত সারং রূপের বাইরে গিয়ে কোমল গান্ধারের এমন সুনিপুণ প্রয়োগ প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিতেরা স্বরের সামান্যতম ব্যবহারে কীভাবে একটি রাগের সম্পূর্ণ আবেগ ও মেজাজ বদলে দিতে পারতেন। দুর্লভ হলেও এই রাগের স্বরবিন্যাস শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সূক্ষ্ম ব্যাকরণ ও বৈচিত্র্য অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে (অপ্রচলিত ও বিরল রাগ সংকলন)।
২. রাগ বিজ্ঞান (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — কাফী ঠাট ও সারং অঙ্গের অপ্রচলিত রাগ বিবরণী।