ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অপূর্ব, জটিল ও বিরল জোড় রাগ (Compound Raga) হলো ‘ললিত গৌরী’। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি ললিত এবং গৌরী—এই দুটি ভিন্ন রাগের সংমিশ্রণে তৈরি। ললিত মূলত ভোরের রাগ (প্রাতঃকালীন সন্ধিপ্রকাশ) হলেও, সান্ধ্যকালীন গৌরী রাগের আশ্রয়ে ‘ললিত গৌরী’ সূর্যাস্তের সময় বা গোধূলি লগ্নে পরিবেশিত হয়। এটি একটি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ রাগ, যা দক্ষ শিল্পীর নিপুণ গায়কী ছাড়া সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।
রাগের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস ললিত এবং গৌরীর মিশ্রণ হওয়ায় এই রাগে উভয় রাগেরই স্বকীয়তা বজায় থাকে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে ললিতের মতো উভয় মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) পাশাপাশি প্রয়োগ ঘটে, আবার গৌরীর মতো পঞ্চম (পা)-এর সুস্পষ্ট উপস্থিতি থাকে। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:
- ঠাট: পূরবী বা ভৈরব (যেহেতু এটি মিশ্র রাগ, পণ্ডিতরা একে পূরবী বা ভৈরব ঠাটের আওতায় বিশ্লেষণ করেন, তবে এতে পূরবী ঠাটের প্রভাবই বেশি দেখা যায়)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ।
- আরোহ: ন্ সা রে গা, মা ক্ষা, ক্ষা গা, ক্ষা পা, ধা নি র্সা (স্বরলিপির সুবিধার্থে: রে ও ধা = কোমল, মা = শুদ্ধ মধ্যম, ক্ষা = তীব্র/কড়ি মধ্যম)।
- অবরোহ: র্সা নি ধা পা, ক্ষা মা গা, রে গা রে সা।
- পকড়: ন্ সা রে গা, মা ক্ষা মা গা, ক্ষা পা, ধা পা, ক্ষা মা গা, রে গা রে সা।
- বাদী স্বর: রে (কোমল ঋষভ)।
- সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয় (তবে আরোহণে অনেক সময় ‘ধা’ দুর্বল রাখা হয়)।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) কোমল ব্যবহৃত হয়। শুদ্ধ ও তীব্র—উভয় মধ্যম (মা ও ক্ষা) পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়। বাকি সমস্ত স্বর শুদ্ধ।
- সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা সূর্যাস্তের সময় (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত)। এটি একটি সান্ধ্যকালীন ‘সন্ধিপ্রকাশ রাগ’।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত ধীর, করুণ, বিষাদময় এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ললিত: ললিত রাগেও শুদ্ধ ও তীব্র মধ্যম পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়, তবে ললিতে পঞ্চম (পা) সম্পূর্ণ বর্জিত। অন্যদিকে, ললিত গৌরীতে ‘পা’-এর প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ললিত ভোরের রাগ, ললিত গৌরী সন্ধ্যার রাগ।
- রাগ গৌরী: মূল গৌরী রাগে কেবল তীব্র মধ্যম (ক্ষা) ব্যবহৃত হয়, কিন্তু ললিত গৌরীতে ললিতের প্রভাবে শুদ্ধ মধ্যমেরও (মা) প্রয়োগ ঘটে।
- রাগ পূরবী: পূরবীতে উভয় মধ্যম থাকলেও ললিত গৌরীর মতো ‘মা ক্ষা মা গা’ (উভয় মধ্যমের এমন মীড়যুক্ত পাশাপাশি ব্যবহার) চলন দেখা যায় না।
ললিত গৌরী অত্যন্ত বিলম্বিত লয়ে গাওয়ার রাগ। সূর্যাস্তের সময় প্রকৃতির যে শান্ত ও বিষণ্ণ রূপ, তা এই রাগের ‘ক্ষা মা গা’ এবং ‘রে গা রে সা’ চলনের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ ললিত গৌরী: এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের ও বিরল জোড় রাগ হওয়ায় নজরুলের গানে এর সরাসরি প্রয়োগ দেখা যায় না।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ ললিত গৌরী: রবীন্দ্রনাথের গানে ললিত বা গৌরীর আলাদা প্রভাব থাকলেও, জটিল ‘ললিত গৌরী’ রাগের প্রয়োগ নেই।
আধুনিক গানে রাগ ললিত গৌরী: রাগের গাম্ভীর্য ও জটিল চলনের কারণে আধুনিক লঘু সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
গজলে রাগ ললিত গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
ভজনে রাগ ললিত গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
ঠুমরিতে রাগ ললিত গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
যন্ত্রে রাগ ললিত গৌরী:সেতার ও সরদ: ১. যন্ত্রসঙ্গীতে কিছু উচ্চাঙ্গের শিল্পী এই রাগের আলাপ পরিবেশন করেছেন। (সুনির্দিষ্ট রেকর্ডিংয়ের তথ্য সংগ্রহ চলছে)।
খেয়াল: ললিত গৌরী মূলত খেয়াল গায়কীর জন্যই সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। এই রাগে ভারতের বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি শিল্পীর অমর পরিবেশনা রয়েছে: ১. জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার কিংবদন্তি পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর-এর কণ্ঠে ‘ললিত গৌরী’ খেয়ালটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অমূল্য রত্ন। ২. মেওয়াতি ঘরানার পণ্ডিত জসরাজ-এর গায়নে রাগ ললিত গৌরী অত্যন্ত জনপ্রিয়। ৩. বিদুষী কিশোরী আমনকারের কণ্ঠে এই রাগের অনবদ্য পরিবেশনা রয়েছে। ৪. পণ্ডিত উলহাস কশলকর-এর কণ্ঠে রাগ ললিত গৌরী।
টিউটোরিয়াল: যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। ১. পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের ললিত গৌরীর বন্দিশ শোনা এই রাগ বোঝার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায়। ২. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনলাইন আর্কাইভ।
তথ্যসূত্র: ১. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল ও পরিবেশনার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: মিশ্র রাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য। ৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ৪. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’: শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য। ৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণাব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী নিশ্চিতকরণের জন্য।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ললিত গৌরী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:


