হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ চৈতি গৌরী । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগ-রাগিণীর বিশাল সমুদ্রে ‘চৈতি গৌরী’ একটি অত্যন্ত সুমধুর এবং ব্যতিক্রমী জোড় রাগ (Compound Raga)। সাধারণত গৌরী অঙ্গের রাগগুলো অত্যন্ত গম্ভীর ও বিষাদময় হলেও, উপশাস্ত্রীয় (Semi-classical) ‘চৈতি’ গায়কীর সাথে মিশ্রণের ফলে ‘চৈতি গৌরী’ রাগটি কিছুটা চঞ্চল, রোমান্টিক এবং শৃঙ্গার রসপ্রধান হয়ে ওঠে। বসন্তের শেষ বা চৈত্র মাসের প্রকৃতি এবং বিরহ-মিলনের যে আকুলতা, তা এই রাগের সুরে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।

রাগের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস চৈতি মূলত উত্তরপ্রদেশ ও বিহার অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় লোকজ সুর বা উপশাস্ত্রীয় গায়কী, যা চৈত্র মাসে গাওয়া হয়। এই চৈতির চঞ্চলতা ও লোকজ মাধুর্যের সাথে যখন শাস্ত্রীয় গৌরী রাগের কাঠামো যুক্ত হয়, তখন জন্ম নেয় চৈতি গৌরী। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট: মিশ্র (এটি মূলত খামাজ এবং ভৈরব বা পূরবী ঠাটের মিশ্রণে তৈরি উপশাস্ত্রীয় মেজাজের রাগ। গায়কী ভেদে ঠাটের প্রভাব পরিবর্তিত হয়)।
  • জাতি: বক্র-সম্পূর্ণ (আরোহ ও অবরোহণে বক্র চলন দেখা যায়)।
  • আরোহ: সা গা মা পা, ধা নি র্সা (স্বরলিপির সুবিধার্থে: রে ও ধা = কোমল, নি = অনেক ক্ষেত্রে উভয় নিষাদ ব্যবহৃত হয়)।
  • অবরোহ: র্সা নি ধা পা, ক্ষা মা গা, মা রে সা (অবরোহণে গৌরীর বিশেষ মীড় ও চৈতির চপলতা ব্যবহৃত হয়)।
  • পকড়: গায়কী ভেদে পরিবর্তিত হয়, তবে উপশাস্ত্রীয় অঙ্গের মীড় ও মুর্কির মাধ্যমে চৈতি ও গৌরীর মেলবন্ধন ঘটানো হয়।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (পা) বা ষড়জ (সা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা) বা পঞ্চম (পা)।
  • বর্জিত স্বর: নির্দিষ্ট কোনো স্বর বর্জিত নয়, তবে শিল্পী রাগের সৌন্দর্য বাড়াতে আরোহণে কিছু স্বর এড়িয়ে বক্র চলন তৈরি করেন।
  • ব্যবহৃত স্বর: শিল্পী ও ঘরানা ভেদে স্বরপ্রয়োগে বৈচিত্র্য দেখা যায়। তবে সাধারণত কোমল ঋষভ (রে), শুদ্ধ ও কোমল নিষাদ (নি) এবং উভয় মধ্যমের (মা ও ক্ষা) একটি সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়।
  • সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা সন্ধ্যা বেলা (তবে চৈতি অঙ্গের কারণে বসন্ত বা চৈত্র মাসের যেকোনো সময় গাওয়ার চল রয়েছে)।
  • প্রকৃতি: চঞ্চল, রোমান্টিক, শৃঙ্গার ও বিরহ রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ গৌরী: মূল গৌরী রাগের গাম্ভীর্য ও ধীর লয় চৈতি গৌরীতে থাকে না। মূল গৌরীর বিষাদ এখানে চৈতির প্রভাবে শৃঙ্গার বা রোমান্টিকতায় রূপ নেয়।
  • চৈতি (ধুন): চৈতি মূলত একটি ধুন বা উপশাস্ত্রীয় ফর্ম। চৈতি গৌরীতে সেই লোকজ সুরটিকে শাস্ত্রীয় গৌরীর কাঠামোতে বেঁধে একটি নির্দিষ্ট রাগের রূপ দেওয়া হয়।

চৈতি গৌরী সাধারণত মধ্য বা দ্রুত লয়ে গাওয়ার রাগ। এই রাগে শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যের চেয়ে উপশাস্ত্রীয় অলঙ্করণ (যেমন: খটকা, মুর্কি, ঠুমরি অঙ্গের মীড়) বেশি ব্যবহৃত হয়, যা শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত আনন্দ ও নস্টালজিয়া তৈরি করে।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ চৈতি গৌরী: উপশাস্ত্রীয় অঙ্গের এই রাগে নজরুলের গানে সরাসরি প্রয়োগ দুর্লভ হলেও, তাঁর কিছু লোকজ ও চৈতালি গানে এই রাগের মিশ্রণ বা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। (সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ চলছে)।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ চৈতি গৌরী: রবীন্দ্রনাথের গানে বসন্ত বা চৈত্র মাসের অনেক গান থাকলেও, সুনির্দিষ্ট ‘চৈতি গৌরী’ রাগের শাস্ত্রীয় প্রয়োগ দেখা যায় না।

আধুনিক গানে রাগ চৈতি গৌরী: আধুনিক বা লঘু সঙ্গীতে এই রাগের মেজাজটি (বিশেষ করে চৈতি অঙ্গটি) অনেক সুরকার ব্যবহার করেছেন, তবে রাগ হিসেবে এর নামোল্লেখ খুব একটা পাওয়া যায় না।

গজলে রাগ চৈতি গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)

ভজনে রাগ চৈতি গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)

ঠুমরিতে রাগ চৈতি গৌরী: চৈতি গৌরী মূলত ঠুমরি, দাদরা ও উপশাস্ত্রীয় গায়কীর জন্যই সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। ১. বেনারস ঘরানার কিংবদন্তি শিল্পীদের (যেমন: বিদুষী গিরিজা দেবী, সিদ্ধেশ্বরী দেবী) গায়কীতে চৈতি অঙ্গের এই পরিবেশনা অত্যন্ত জনপ্রিয়।

যন্ত্রে রাগ চৈতি গৌরী:সেতার ও সরদ: ১. যন্ত্রসঙ্গীতে অনেক সময় শিল্পীরা তাঁদের পরিবেশনার শেষাংশে (বিশেষ করে ঠুমরি বা ধুন বাজানোর সময়) চৈতি গৌরীর সুর লহরী তুলে থাকেন।

খেয়াল: যেহেতু এটি উপশাস্ত্রীয় বা ঠুমরি অঙ্গের রাগ, তাই এতে প্রথাগত বড় খেয়ালের চেয়ে ছোট খেয়াল বা বন্দিশ বেশি গাওয়া হয়। ১. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব বা তাঁর ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠে চৈতি ও গৌরীর মিশ্রণে তৈরি এই ধরনের উপশাস্ত্রীয় বন্দিশ শোনা যায়।

টিউটোরিয়াল: যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। ১. বেনারস ঘরানার শিল্পীদের গাওয়া ‘চৈতি’ এবং শাস্ত্রীয় ‘গৌরী’ আলাদাভাবে শুনলে এই দুইয়ের সংমিশ্রণটি (চৈতি গৌরী) অনুধাবন করা সহজ হবে। ২. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনলাইন আর্কাইভ।

তথ্যসূত্র: ১. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল ও পরিবেশনার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: উপশাস্ত্রীয় ও মিশ্র রাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য। ৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ৪. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’: শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য। ৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণাব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী নিশ্চিতকরণের জন্য।

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ চৈতি গৌরী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।