উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক উদ্যোগ

বিজ্ঞাপনের মায়াজাল : বিরক্তি না কি অবচেতন মনের বিনিয়োগ? | পেশা পরামর্শ সভা

উদ্যোক্তা সিরিজ বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গ

গতকালের উদ্যোক্তা আড্ডায় বিজ্ঞাপন বা অ্যাডভার্টাইজিং নিয়ে বেশ প্রাণবন্ত আলোচনা হলো। অনেকেরই একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল—দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের (TVC) আধিক্য। দর্শক হিসেবে আমরা যখন কোনো নাটক বা অনুষ্ঠান দেখি, তখন ঘনঘন বিজ্ঞাপনে বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই বিরক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক খেলা।

বিজ্ঞাপন কেন কাজ করে?

আমরা সারাদিন খবরের কাগজ, রাস্তার হোর্ডিং, পোস্টার কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় অগণিত বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে যাই। অনেক সময় এগুলো আমাদের বিরক্তির কারণ হয়, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যখন আমরা কোনো পণ্য কিনতে বাজারে যাই, তখন আমাদের অবচেতন মন সেই ব্র্যান্ডটিকেই বেছে নেয় যেটির বিজ্ঞাপন আমরা বারবার দেখেছি।

একাডেমিক জটিলতা বাদ দিয়ে সোজা বাংলায় বললে—বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার টার্গেট কাস্টমারকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া যে, “আপনার যা প্রয়োজন, তা নিয়ে আমরা তৈরি আছি।” বিজ্ঞাপন ক্রেতার মনে পণ্যের ‘জ্ঞানগত উপযোগ’ সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে দেয়। কেউ কি কখনও বলেছে— “অমুক কোম্পানি বেশি বিজ্ঞাপন দেয়, তাই তাদের সার্ভিস নিব না?” না, বরং যার পরিচিতি বেশি, মানুষ তার ওপরই ভরসা পায়।

ইনফোমার্শিয়াল: গল্পের ছলে বিপণন

উন্নত বিশ্বে আমরা ‘ইনফোমার্শিয়াল’ (Infomercial) নামক এক ধরণের বিজ্ঞাপন দেখি। এগুলো প্রথাগত ৩০ সেকেন্ডের টিভিসি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে একটি পণ্যের কার্যকারিতা, সুবিধা এবং বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার বা সেলিব্রিটিদের আলাপচারিতার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। আমাদের দেশেও ইদানীং রান্নার সরঞ্জাম বা ফিটনেস পণ্যের ক্ষেত্রে এমন প্রোগ্রাম দেখা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এটি প্রচারের আগে ‘এটি একটি বিজ্ঞাপন’—এমন সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি ক্রেতাকে সচেতন রাখে যে তিনি একটি ব্যবসায়িক প্রচারণা দেখছেন।

চলচ্চিত্রে ‘প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট’: শিল্পের আড়ালে বাণিজ্য

বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে স্মার্ট এবং শক্তিশালী মাধ্যম এখন চলচ্চিত্র। একে বলা হয় ‘প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট’। খেয়াল করে দেখবেন, সিনেমার নায়ক কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি চালাচ্ছেন, ল্যাপটপ ব্যবহারের সময় লোগোটি ক্যামেরায় কতক্ষণ ফোকাস হচ্ছে কিংবা রিংটোনে কোনো মোবাইল অপারেটরের থিমটোন বাজছে কি না। এগুলো মোটেও কাকতালীয় নয়।

একটি পরিসংখ্যান দিলে আপনারা চমকে যাবেন—কেবল ২০১৪ সালেই হলিউড সিনেমায় নিজেদের ব্র্যান্ড দেখানোর জন্য বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে! এটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বড় তারকারা অভিনয়ের চুক্তির বাইরেও ব্র্যান্ড প্রোমোশনের জন্য আলাদা সম্মানী দাবি করেন। ভক্তরা যদি প্রিয় নায়কের চুলের স্টাইল নকল করতে পারে, তবে শপিং মলে গিয়ে তার ব্যবহৃত ব্র্যান্ডটি কেন কিনবে না?

ইতিহাসের পাতায় বিজ্ঞাপন বিতর্ক

যারা চলচ্চিত্রকে খাঁটি শিল্প মনে করেন, তারা সবসময়ই এর বাণিজ্যিকীকরণে বিরক্ত ছিলেন। ১৯১৯ সালে ‘দ্য গ্যারাজ’ নামক একটি কমেডি ছবিতে ‘রেড ক্রাউন গ্যাসোলিন’ ব্র্যান্ড দেখানোর পর ‘হ্যারিসন’স রিপোর্ট’ নামক পত্রিকা প্রথম এর সমালোচনা করে। ১৯২০-এর দশকে করোনা টাইপরাইটার কোম্পানি বিভিন্ন সিনেমায় তাদের পণ্য ব্যবহারের চুক্তি করলে বেশ হৈচৈ শুরু হয়।

আবার অনেক সময় উল্টো ঘটনাও ঘটে। কোনো সিনেমায় যদি কোনো ব্র্যান্ডকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়, তবে ওই কোম্পানি নির্মাতাকে আইনি চাপে ফেলে সেই অংশ বাদ দিতে বাধ্য করে। এতে অনেক সময় নির্মাতাদের বড় আর্থিক ক্ষতিও গুণতে হয়।

জার্সির বিজ্ঞাপন: যখন আপনি নিজেই বিজ্ঞাপনের বাহক

ঢাকার রাস্তায় হাঁটলে দেখা যায় তরুণরা ইউরোপের বিভিন্ন নামী ক্লাবের জার্সি পরে ঘুরছে। হয়তো তাদের অনেকে কোনোদিন মাঠে গিয়ে ফুটবলই খেলেনি। খেয়াল করে দেখবেন, ওই জার্সির বুকে ক্লাবের চেয়ে স্পন্সর করা কোম্পানির (যেমন: Fly Emirates বা TeamViewer) নাম বড় করে লেখা থাকে।

এখানেই বিজ্ঞাপনের চরম সার্থকতা। ক্লাবগুলো তো স্পন্সরের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেই, কিন্তু একজন ভক্ত নিজের টাকা দিয়ে সেই জার্সি কিনছেন এবং বিনা পারিশ্রমিকে ওই ব্র্যান্ডের প্রচার করে যাচ্ছেন। কারণ লিওনেল মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ওই স্পন্সরের লোগো ছাড়া জার্সিতে দেখতে ‘বেমানান’ লাগে। এখানে বিজ্ঞাপন আর স্রেফ প্রচার নেই, এটি স্টাইল বা ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যতদিন কাস্টমারের সামনে অসংখ্য বিকল্প (Choice) থাকবে, ততদিন বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তা কমবে না বরং বাড়বে। প্রতিযোগিতার এই বাজারে নিজের পণ্যের গুণগান গাইতে বিজ্ঞাপনের চেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার আর নেই। তাই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বিজ্ঞাপনকে কেবল খরচ হিসেবে না দেখে, কাস্টমারের অবচেতন মনে জায়গা করে নেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

Leave a Reply

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।