সংখ্যালঘু অধিকার হরণ ও নির্যাতনে আমাদের তুলনা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করা চরম অযৌক্তিক। দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে সংখ্যালঘু অধিকার হরণ ও নির্যাতনে আমাদের প্রতিযোগিতার প্রকৃত মানদণ্ড ভারত নয়, বরং পাকিস্তান।

রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবচ্ছেদ:

পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভায় যেখানে ৪০ জন মুসলিম বিধায়ক দাপটের সাথে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেখানে বাংলাদেশের ৩০০ আসনের সংসদে মাত্র ২ জন হিন্দু জনপ্রতিনিধি এক করুণ নিঃসঙ্গতা। কলকাতার মেয়র পদে হিন্দুদের ভোটেই একজন মুসলিম আসীন হতে পারেন—এই যে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তার ছিটেফোঁটাও কি বাংলাদেশের কোনো সিটি কর্পোরেশনে দেখা যায়? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান কোনো রাজনৈতিক দল কোনো হিন্দু প্রার্থীকে নগরপিতার নমিনেশন দেওয়ার ‘ঝুঁকি’টুকুও নিতে পারেনি।

অধিকার বনাম রাজনৈতিক মূলা:

পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুরা কেবল ভোটার নন, তারা ক্ষমতার অংশীদার। তাদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়, কমিশন, বাজেট বরাদ্দ এবং সংরক্ষণ বিল (Reservation) রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক অদ্ভুত ছদ্মবেশে ঢাকা। এখানে রাজনীতিবিদরা প্রতিবছর ‘নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন না’ বলে এক সুস্বাদু ‘মূলা’ ঝুলিয়ে রাখেন। যেন এই মৌখিক আশ্বাসই সংখ্যালঘুর নাগরিক অধিকারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি! বাস্তবতা হলো, সারা দেশের সব রাজনৈতিক দল একাট্টা হয়েও ৪০ জন হিন্দুকে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার মানসিক ঔদার্য দেখাতে পারে না।

শীর্ষ পদের দুষ্প্রাপ্যতা:

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতে হিন্দু না হয়েও আপনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, প্রধান বিচারপতি কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান হতে পারবেন। তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী বিজেপির শাসনামলেও তারা রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল কিংবা মেয়রের পদ অলঙ্কৃত করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে কি এমন কোনো উদাহরণ সম্ভব? এখানে বড় পদগুলো তো দূরের কথা, ছোট কোনো দায়িত্বে কেউ আসীন হওয়া মানেই সেটা নিয়মের ব্যতিক্রম, নিয়মানুগ নয়।

পুরস্কারের পাল্লা ও পরিসংখ্যানের খেলা:

সংখ্যালঘু অধিকার হরণ বা নির্যাতনের জন্য আমাদের প্রকৃত তুলনা হতে হবে পাকিস্তানের সাথে। পাকিস্তান এক্ষেত্রে অনস্বীকার্যভাবে প্রথম পুরস্কারের দাবিদার। দেশভাগের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ১৪.০%, যা আজ ধুঁকতে ধুঁকতে ১.৬%-এ ঠেকেছে। তারা সবাইকে তাড়াতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু অবশিষ্টাংশকে সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরে নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ এক্ষেত্রে খুব বেশি পিছিয়ে নেই; আমরা দ্বিতীয় পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার। দেশভাগের আগে এ অংশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮.০%, যা আজ কমতে কমতে ৭.৯%-এ দাঁড়িয়েছে। আমরা একটি বিশাল অংশকে ‘সফলভাবে’ বিদায় করতে পারলেও এখনও যে ৭.৯% রয়ে গেছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা নাকি মহানুভবতা—তা নিয়ে গবেষণার অবকাশ আছে।

ভারত কেন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়?

এই ‘সংখ্যালঘু নিধন’ বা ‘অধিকার হরণ’-এর খেলায় ভারতের পারফরম্যান্স একেবারেই হতাশাজনক। দেশভাগের সময় ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৩.০%, যা কমার বদলে উল্টো বেড়ে বর্তমানে ১৪.৫% হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতভাগের সময় ভারতে হিন্দু ছিল ৮৩.০%, আজ তারা নিজেদের হার কমিয়ে ৮০% এর নিচে নামিয়ে এনেছে।

যে দেশ নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠের হার বজায় রাখতে পারে না এবং সংখ্যালঘুর হার বাড়িয়ে তোলে, তাদের সাথে আমাদের মতো ‘দক্ষ’ দেশগুলোর তুলনা চলে না। তাই সংখ্যালঘু ইস্যুতে আমরা পাকিস্তানের সহযাত্রী; ভারতের সাথে আমাদের কোনো তুলনাই হয় না।

আরও দেখুন: