খেয়ালে জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানা | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার সেই অমোঘ মায়াজালের সাথে আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমার শ্রোতা-যাত্রার অন্যতম পথপ্রদর্শক আনিস মাহমুদ। এই গায়কীর গাম্ভীর্য এবং জটিল বুননের সাথে পরিচিত হওয়ার পর সঙ্গীতের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে। তাই তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অপরিসীম।

উন্নাসিক সম্রাট: ওস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ

এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ সাহেব (১৮৫৫–১৯৪৬) সম্পর্কে যখন প্রথম পড়েছিলাম, তাঁর প্রতি এক ধরণের তীব্র ক্ষোভ জন্মেছিল। মনে হয়েছিল, মানুষটা চরম অহংকারী এবং উন্নাসিক। সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর গায়কী নয়—এই জেদ থেকে তিনি কোনোদিন নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করতে দেননি। এমনকি নিজের ছেলের অকাল প্রয়াণে তাঁর বিলাপ ছিল এমন— “ছেলের সাথে আমার ঘরের দুইশ বছরের গায়কীও চলে গেল!” মনে হয়েছিল, একজন বাবার কাছে সন্তানের প্রাণের চেয়ে বুঝি তাঁর ঘরানার অহংকারই বড়!

গানের ব্যাকরণ বোঝার যোগ্যতা আমার সামান্যই। কিন্তু যখন এই ঘরানার সৃষ্টিগুলো শুনতে শুরু করলাম, তখন উপলব্ধি হলো—পৃথিবীতে এমন কিছু ক্ষ্যাপাটে প্রতিভার জন্ম হয়, যাদের শিল্পের উচ্চতা এতটাই বেশি যে তাঁদের ঐ ‘অহংকার’ বা ‘উন্নাসিকতা’টুকুও যেন এক ধরণের অলঙ্কার।

ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁর পারিবারিক শিকড় ছিল উত্তরপ্রদেশের আলিগড় জেলার আত্রাউলি গ্রামে, কিন্তু কর্মজীবনে তিনি রাজস্থানের জয়পুর রাজ্যের উনিয়ারা রাজদরবারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন; এই দুই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কারণেই এই বিশেষ ঘরানাটি ‘জয়পুর-আত্রাউলি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

খাঁ সাহেব জন্মসূত্রে এক ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদিয়া পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা বংশপরম্পরায় ধ্রুপদ ও ধামার গায়কীর চর্চা করতেন, যেখানে কণ্ঠের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে দীর্ঘক্ষণ আলাপ ও বিস্তারের রেওয়াজ ছিল। যৌবনে আল্লদিয়া খাঁ নিজেও একজন অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্রুপদ গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চৈঃস্বরে ধ্রুপদ গাইবার ফলে একসময় তাঁর কণ্ঠস্বর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি তাঁর স্বাভাবিক গায়কী ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেন।

এই শারীরিক সংকটই সংগীতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। কণ্ঠের সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে তিনি ধ্রুপদের সেই অতি-ভরাট ও গম্ভীর গায়কী ছেড়ে দিয়ে খেয়াল গায়কীর এক সম্পূর্ণ নতুন এবং জটিল ভঙ্গি বা ‘স্টাইল’ উদ্ভাবন করেন। তিনি এমন এক গায়কী তৈরি করেন যেখানে কণ্ঠের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়েও রাগের গাম্ভীর্য বজায় রাখা যায়। তিনি সরল তানের পরিবর্তে অত্যন্ত বক্র বা প্যাঁচানো তান এবং মধ্য-বিলম্বিত লয়ের এক গাণিতিক বিন্যাস প্রবর্তন করেন, যা ধ্রুপদের রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং খেয়ালের চপল অলংকরণের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর এই উদ্ভাবনী কৌশল পরবর্তীতে খেয়ালের দুনিয়ায় এক বিশাল বিপ্লব ঘটায় এবং জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানাকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কঠিন ঘরানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আল্লদিয়া খাঁ সাহেব তাঁর ঘরানার বিদ্যা বা ‘ঘরানাদার গায়কী’ সবাইকে শেখাতেন না। এমনকি তাঁর অন্যতম সেরা শিষ্যা কেশরবাঈ কেরকরকে শেখানোর আগে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, কেশরবাঈকে টানা পনেরো বছর অন্য কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়া বন্ধ রেখে কেবল তাঁর কাছে তালিম নিতে হবে। কেশরবাঈ সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন এবং খাঁ সাহেবের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে শিখেছিলেন।

আল্লদিয়া খাঁ সাহেবের জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে কোলহাপুরের মহারাজের আশ্রয়ে। সেখানে তাঁর এতটাই সম্মান ছিল যে, মহারাজ নিজে তাঁর তম্বুরা ধরে বসে থাকতেন। কোলহাপুরকে আজও জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এই শহর থেকেই মোগুবাঈ কুর্দিকরের মতো কিংবদন্তিরা উঠে এসেছেন।

বিদুষী মোগুবাঈ কুর্দিকর (কিশোরী আমোনকরের মা) যখন খাঁ সাহেবের কাছে শিখতে শুরু করেন, তখন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের অনেক বাধা ছিল। এমনকি কেশরবাঈ কেরকরের সাথে তাঁর এক ধরণের ঠান্ডা লড়াই ছিল বলে শোনা যায়—কে খাঁ সাহেবের কাছ থেকে বেশি ‘দুর্লভ রাগ’ শিখতে পারেন, তা নিয়ে এক নীরব প্রতিযোগিতা চলত। মোগুবাঈ এতটাই কঠোর সাধনা করেছিলেন যে, তিনি যখন গাইতেন, খাঁ সাহেব বলতেন, “মোগু আমার গায়কী হুবহু ধরে রেখেছে।”

এই ঘরানার শিল্পীরা সাধারণ রাগের চেয়ে ‘জোড়’ রাগ বা দুটি রাগের মিশ্রণে তৈরি জটিল রাগ গাইতে বেশি পছন্দ করেন। ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব বিশ্বাস করতেন যে, সহজ রাগ সবাই গাইতে পারে, কিন্তু দুটি রাগের প্রকৃতি বজায় রেখে তাদের মিলন ঘটানোই হলো আসল মুন্সিয়ানা। এরা তেমন যেসব গায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – বাসন্তী-কেদার, বসন্ত-বাহার, জৈতাশ্রী, নট-কামোদ বা ললিতা-গৌরী। ললিতা-গৌরীর ক্ষেত্রে ‘ললিত’ এবং ‘গৌরী’—এই দুটি রাগের চলন এত সূক্ষ্মভাবে মেশানো হয় যে তা সাধারণ শ্রোতার কাছে এক রহস্যময় সুরের জাল মনে হয়। সেজন্য এই ঘরানার শিল্পীরা যখন কোনো সংগীত সম্মেলনে (Conference) গাইতেন, তখন অন্য ঘরানার শিল্পীরা অবাক হয়ে শুনতেন। কারণ তারা এমন সব রাগ গাইতেন যা আগে কেউ শোনেনি। ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব অনেক পুরনো ও হারিয়ে যাওয়া রাগকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন। তাদের ওসব জোড় রাগ এই রাগগুলো তাদের ঘরানার বাইরে খুব কমই শোনা যায়।

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার গায়কীর প্রধানতম বৈভব হলো এর অবিচ্ছিন্ন লয় (Continuity of Laya)। কিরাণা বা গোয়ালিয়রের মতো ঘরানায় বিলম্বিত খেয়ালের বিস্তারের সময় শিল্পী অনেক সময় বিরতি নেন বা স্বর-বিস্তারের জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করেন, কিন্তু জয়পুর ঘরানায় সুরের প্রবাহ তালের প্রথম মাত্রা (সম) থেকে শেষ মাত্রা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলে। এই বিশেষ শৈলীর কারণে এদের গায়কীকে ‘স্থাপত্য সদৃশ’ বলা হয়। ঠিক যেমন একটি ইটের ওপর আরেকটি ইট নিখুঁতভাবে গেঁথে অটল দালান তৈরি হয়, এই ঘরানার শিল্পীরাও তেমনি একটি স্বরের রেশ না কাটতেই পরবর্তী স্বরের অলংকরণ শুরু করেন, যা শ্রোতার মনে এক অবিভাজ্য সুরের কাঠামো তৈরি করে।

এই অবিচ্ছিন্নতা বজায় রাখার জন্যই জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার শিল্পীরা সাধারণত ‘অতি-বিলম্বিত’ বা খুব ধীর লয়ে গান করেন না। তাঁরা মূলত ‘মধ্য-বিলম্বিত’ লয়কেই আদর্শ মনে করেন। তাঁদের মতে, লয় যদি অতিরিক্ত ধীর হয়ে যায়, তবে রাগের সঠিক রূপ বা চারিত্রিক চলন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই নির্দিষ্ট মধ্য-বিলম্বিত লয়ে থিতু থেকেই তাঁরা তাঁদের ঘরানার সিগনেচার স্টাইল—অর্থাৎ অত্যন্ত জটিল সব ‘বক্র তান’ এবং ‘বোল-তান’ প্রদর্শন করেন, যা একইসাথে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শ্রবণসুখকর হয়ে ওঠে।

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার শিল্পীরা তাঁদের তানপুরা বাঁধার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তারা তানপুরা তারগুলোকে এমনভাবে টিউন করেন যাতে তম্বুরার ঝংকার বা ‘রেজোনেন্স’ রাগের বাদী-সমবাদী স্বরগুলোকে সারাক্ষণ সাপোর্ট করে। বিশেষ করে অপ্রচলিত বা ‘জোড়’ রাগের ক্ষেত্রে তম্বুরার এই বিশেষ টিউনিং ছাড়া গানের সেই ‘স্থাপত্য’ ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।

আল্লদিয়া খাঁ সাহেব তাঁর শিষ্যদের গলার আওয়াজ তৈরির জন্য এক বিচিত্র পরামর্শ দিতেন। তিনি বলতেন, গলার স্বরকে খুব বেশি মিষ্টি বা পালিশ (Polished) করার দরকার নেই; বরং স্বরের মধ্যে একটা ‘খাঁজ’ বা ‘দানা’ থাকতে হবে। এই দানাদার আওয়াজই জয়পুর ঘরানার তানের জটিল প্যাঁচগুলোকে স্পষ্টভাবে শ্রোতার কানে পৌঁছে দেয়। এই কারণেই কেশরবাঈ বা মোগুবাঈয়ের কণ্ঠে এক ধরণের ধাতব ও বলিষ্ঠ ভাব লক্ষ্য করা যায়।

ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব নিজে কখনও গ্রামোফোন রেকর্ডিং করতে রাজি হননি। তাঁর ধারণা ছিল, মাত্র তিন-চার মিনিটের রেকর্ডে তাঁর ঘরানার রাগের বিশালতা এবং আধ্যাত্মিকতা ধরা সম্ভব নয়। এমনকি কেশরবাঈ কেরকরও শুরুতে রেকর্ডিংয়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীকালে এইচএমভি (HMV)-র অনেক অনুরোধে এবং মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি রাজি হন। এই কারণেই খাঁ সাহেবের নিজের কোনো অডিও রেকর্ড আজ পৃথিবীর কোথাও নেই। ১৯৭৭ সালে নাসা (NASA) যখন মহাকাশে ‘ভয়েজার’ (Voyager) মহাকাশযান পাঠিয়েছিল, তাতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীতের নমুনা হিসেবে বিদুষী কেশরবাঈ কেরকরের গাওয়া জয়পুর ঘরানার একটি গান (“জাত কাহাঁ হো”) পাঠানো হয়েছিল। এটিই ছিল মহাকাশে পাঠানো একমাত্র ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত।

জয়পুর ঘরানার গায়কী খুব বেশি মিহি বা কোমল নয়; বরং এটি বেশ বলিষ্ঠ এবং গম্ভীর। মোগুবাঈ কুর্দিকর বা কেশরবাঈ কেরকরের মতো নারী শিল্পীদের গায়কীতেও এক ধরণের রাজকীয় গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যেত, যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় মর্দানগি গায়কী বলা হয়।

 

Mallikarjun Mansur, Exponent of Jaipur Atrauli Gharana
পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর [ Mallikarjun Mansur, Exponent of Jaipur Atrauli Gharana ]

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার তান:

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার গায়কি তান নির্ভর। তাদের তানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর অবিচ্ছিন্নতা এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা। ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব যখন এই গায়কী প্রবর্তন করেন, তখন তিনি ধ্রুপদের গাম্ভীর্যকে খেয়ালের তানের মধ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন। এই ঘরানার তান কেবল আরোহ-অবরোহের খেলা নয়, বরং এটি রাগের প্রতিটি স্বরকে এক বিশেষ জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজানোর শিল্প। তানের প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি স্বরক্ষেপণ এমনভাবে করা হয় যাতে রাগের শুদ্ধতা ক্ষুণ্ণ না হয়ে বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই তানের চলন এতটাই জটিল যে একে আয়ত্ত করতে বছরের পর বছর কঠোর সাধনা বা ‘রেওয়াজ’ প্রয়োজন হয়।

বক্র তানের সর্পিল চলন

এই ঘরানার তানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারিগরি দিক হলো এর ‘বক্র’ বা প্যাঁচানো গতি। সাধারণ তানের মতো এখানে স্বরগুলো সরাসরি উপরে ওঠে বা নিচে নামে না। বরং স্বরগুলো সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে, যাকে সংগীতের ভাষায় ‘বক্র তান’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি সরল তান হয় ‘স র গ ম প’, তবে জয়পুর ঘরানায় তা হতে পারে ‘স-গ-র-ম-গ-প’। এই ধরণের বক্র গতির কারণে শ্রোতা কখনোই আগে থেকে অনুমান করতে পারেন না যে শিল্পী পরবর্তী কোন স্বরটি ছোঁবেন। এই অনিশ্চয়তা এবং বিস্ময়বোধই জয়পুর ঘরানার তানকে এক অনন্য উচ্চতা দান করে, যা একইসাথে রহস্যময় এবং শ্রুতিমধুর।

ওজস্বী ও ওজনদার স্বরক্ষেপণ

জয়পুর ঘরানার তানের প্রতিটি স্বর অত্যন্ত ভরাট এবং ওজনদার হয়। অনেক ঘরানায় দ্রুত তান করার সময় স্বরগুলো কিছুটা হালকা বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, কিন্তু জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানায় প্রতিটি স্বর যেন পাথরে খোদাই করা মূর্তির মতো স্পষ্ট। এই ঘরানার শিল্পীরা নাভি বা বুক থেকে স্বর প্রক্ষেপণ করেন (যাকে ‘মর্দানগি গায়কী’ বলা হয়), যার ফলে অত্যন্ত দ্রুত লয়েও প্রতিটি স্বরের পৃথক অস্তিত্ব এবং ওজন বজায় থাকে। তানের এই স্পষ্টতা এবং গাম্ভীর্যই প্রমাণ করে শিল্পীর গলার ওপর কতটা অমানুষিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

গুম্ফিত অলংকার: কণা ও মীড়ের কারুকাজ

জয়পুর ঘরানার তানের ভেতর যে কারুকার্য থাকে তাকে বলা হয় ‘গুম্ফিত’ অলংকার। ‘গুম্ফিত’ মানে হলো মালার মতো গেঁথে রাখা। দ্রুত গতির তানের মধ্যেও এই ঘরানার শিল্পীরা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ‘কণা’ (সহায়ক স্বরের স্পর্শ) এবং ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া) প্রয়োগ করেন। ফলে তানগুলো শুকনো বা যান্ত্রিক মনে হয় না, বরং অনেক বেশি রসালো ও প্রাণবন্ত মনে হয়। এই সূক্ষ্ম কাজগুলো দ্রুত তানের মধ্যে বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি কেবল দীর্ঘ বছরের সাধনার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এই অলংকারগুলোই তানের স্থাপত্যে প্রাণের সঞ্চার করে।

তালের সাথে তানের গাণিতিক মেলবন্ধন

তানের সাথে তালের যে গাণিতিক হিসেব, তা জয়পুর ঘরানায় এক নতুন মাত্রা পায়। এই ঘরানার শিল্পীরা তালের প্রতিটি মাত্রাকে সমান গুরুত্ব দেন এবং তানের মাঝেই বন্দিশের কথাগুলোকে এমনভাবে ভেঙে চুরে বসান, যাকে বলা হয় ‘বোল-তান’। তারা তানের ভেতরেই আড়, কুয়াড় বা বিয়াড় লয়ের (যেমন ১.৫ বা ১.৭৫ গুণ লয়) সূক্ষ্ম কাজ দেখান। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অতি-জটিল বক্র তানগুলো তালের যেকোনো অসম মাত্রা থেকে শুরু হলেও তা নিখুঁতভাবে গিয়ে তালের প্রথম মাত্রা বা ‘সম’-এ এসে শেষ হয়। তালের এই গাণিতিক বিশুদ্ধতা এবং তানের জটিলতা জয়পুর ঘরানাকে শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ঘরানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

মল্লিকার্জুন মনসুর: যাকে ঘরানার অন্যান্যরা দানব বলতো

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার গান আমি সবচেয়ে বেশি শুনেছি পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর-এর কণ্ঠে। শিল্পী হিসেবে কে বড় বা ছোট সেই বিচার করার স্পর্ধা আমার নেই, তবে ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় তিনি সবসময় শীর্ষে। তাঁর গায়কী ছিল অসম্ভব মিহি আর সাবলীল। গলার কাজগুলো যখন করতেন, মনে হতো যেন খুব আনমনে অতি সূক্ষ্ম কোনো ফুলের নকশা আঁকছেন।

পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর সম্পর্কে একটি অজানা তথ্য হলো, তিনি যখন ওস্তাদ মনজি খাঁ সাহেবের কাছে শিখতে যান, তখন ওস্তাদ তাঁকে প্রথম তিন মাস কেবল রাগ আদানা-র একটি ছোট বন্দিশ শিখিয়েছিলেন। মনজি খাঁ দেখতে চেয়েছিলেন মল্লিকার্জুনের ধৈর্য কতটুকু। মল্লিকার্জুন বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে তিন মাস ধরে প্রতিদিন সেই একই বন্দিশ গেয়েছিলেন। তিন মাস পর ওস্তাদ খুশি হয়ে বলেছিলেন, “এখন তুমি আমার ঘরানার আসল চাবিটি পেয়েছ।” এটা অবশ্য এই ঘরের সিলিসিলাও বটে। কারণ ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব তাঁর শিষ্যদের (বিশেষ করে কেশরবাঈ ও মোগুবাঈকে) শুরু বছরগুলোতে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, একটি রাগকে অন্তত এক বছর ধরে প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। অন্য কোনো রাগ ছোঁয়া নিষেধ ছিল। এই দীর্ঘমেয়াদী ‘একনিষ্ঠ সাধনা’র কারণেই জয়পুর ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠে প্রতিটি রাগের প্রতিটি স্বর পাথরে খোদাই করা মূর্তির মতো নিখুঁত হয়ে উঠত। যখন ওস্তাদ নিশ্চিত হতেন গায়কি তৈরি, তখন অন্য রাগগুলোর দরজা খুলে দিতেন।

পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করায় জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা ও বিস্ময় তৈরি হয়েছিল। ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেবের প্রথিতযশা শিষ্যা বিদুষী কেশরবাঈ কেরকর খাঁ সাহেবের কাছে মল্লিকার্জুন মনসুরের অদম্য প্রতিভা সম্পর্কে কিছুটা অনুযোগের সুরেই বলেছিলেন— ‘বাবা, আপনি এ কেমন এক দানবকে (জানওয়ার) সংগীতের ময়দানে ছেড়ে দিয়েছেন? ও তো আমাদের সবাইকে খেয়ে ফেলবে!’

কেশরবাঈ যখন এই মন্তব্যটি করেছিলেন, তখন তিনি জয়পুর ঘরানার একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। কিন্তু মল্লিকার্জুন মনসুরের গায়কীতে জয়পুর ঘরানার সেই অতি-জটিল ‘বক্র তান’ এবং ‘অপ্রচলিত রাগের’ ওপর অবিশ্বাস্য দখল দেখে তিনি রীতিমতো শংকিত হয়ে পড়েছিলেন। মল্লিকার্জুন মনসুরের শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ (Breath Control) ছিল অতিমানবীয়। তিনি তালের প্রতিটি মাত্রায় এমনভাবে স্বর বিন্যাস করতেন যে মনে হতো সুরের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। তাঁর এই অতিপ্রাকৃতিক গায়কী দক্ষতাকেই কেশরবাঈ ‘দানবীয়’ শক্তির সাথে তুলনা করেছিলেন। এই ঘটনার কথা জানাজানি হওয়ার পর মল্লিকার্জুন মনসুর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেছিলেন যে, কেশরবাঈয়ের মতো শিল্পীর মুখ থেকে এমন মন্তব্য তাঁর জন্য সবথেকে বড় আশীর্বাদ।

মল্লিকার্জুন মনসুর ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই এক বিচিত্র এবং নির্লোভ স্বভাবের মানুষ। তথাকথিত জাঁকজমক বা গায়কীর অহংকার তাঁর মধ্যে ছিল না। অনেকে তাঁকে ‘ফকিরি স্বভাবের’ মানুষ বলতেন কারণ সংগীত ছিল তাঁর কাছে স্রেফ বিনোদন নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা।

তাঁর আরও সব বিচিত্র কারবার ছিল। বড় আসরে তিনি জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানার অতি জটিল সব ‘বক্র তান’ বা অপ্রচলিত রাগের জাল বুনছেন। তখন হঠাৎই হয়তো তাঁর বিড়ি খাওয়ার তৃষ্ণা পেল। তিনি গানও থামাতেন না আবার বিড়ির নেশাটাকেও চেপে রাখতেন না। তিনি অত্যন্ত সহজভাবে সাগরেদদের সুর ধরে রাখতে বলে মঞ্চ থেকে নেমে যেতেন। বাইরে গিয়ে নিশ্চিন্তে কয়েক টান বিড়ি ফুঁকে এসে যখন আবার আসরে বসতেন। সেই মুহুর্তে সাগরেদদের কাছে তান যেমন আছে সেখান থেকেই শুরু করতেন। মাঝখানের এই বিরতি তাঁর সুরের ধ্যানে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাতে পারতো না—এটিই ছিল তাঁর অলৌকিক গায়কী ক্ষমতার প্রমাণ।

সংগীত সমালোচক এবং রসিকদের মতে, ওস্তাদ অল্লদিয়া খাঁ সাহেবের ঘরানাকে রেকর্ড বা আধুনিক যুগে সবথেকে সার্থকভাবে যিনি বহন করেছেন, তিনি হলেন মল্লিকার্জুন মনসুর। যদিও কেশরবাঈ কেরকর বা মোগুবাঈ কুর্দিকর অত্যন্ত শক্তিশালী শিল্পী ছিলেন, কিন্তু মল্লিকার্জুন মনসুর জয়পুর ঘরানার সেই অতি-জটিল ব্যাকরণকে যেভাবে এক সহজ ও সাবলীল ‘ভক্তি’র রূপ দিয়েছিলেন, তা ছিল অতুলনীয়। তাঁর কণ্ঠে জয়পুর ঘরানার গান কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যায়াম থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।

পণ্ডিত মনসুরের পরেই এই ঘরানায় আমার অসম্ভব প্রিয় কণ্ঠ হলো কিশোরী আমনকার। মোগুবাঈয়ের কন্যা কিশোরী আমোনকর এই ঘরানায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। জয়পুর ঘরানা মূলত ছিল ব্যাকরণনির্ভর এবং কিছুটা কাঠখোট্টা। কিশোরী জি অনুভব করেন যে, সংগীতে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা থাকলে হবে না, তাতে ‘ভাব’ বা ‘ইমোশন’ থাকতে হবে। তিনি তাঁর ঘরানার গায়কী ঠিক রেখে তাতে অন্যান্য ঘরানার (যেমন গোয়ালিয়র ও কিরানা) সৌন্দর্য মিশিয়ে এক নতুন মাত্রা দেন। শুরুতে কট্টরপন্থীরা এর সমালোচনা করলেও, পরে তাঁর এই ‘ভাব-প্রধান’ গায়কীই ঘরানাটিকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।

এই ঘরানার প্রবাদপ্রতিম শিল্পীগণ

মল্লিকার্জুন মনসুর ছাড়াও এই ঘরানাকে সমৃদ্ধ করেছেন একঝাঁক কিংবদন্তি:

  • কেসরবাই কেরকার: যাঁর কণ্ঠ মহাকাশযান ‘ভয়েজার’-এ করে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।
  • মঘুবাই কুর্দিকার: কিশোরী আমনকারের মা ও গুরু।
  • গজননরাও জোশী, লক্ষ্মীবাই যাদব, ধন্দুতাই কুলকার্নী, উমানরাও সাদোলিকার।
  • রাজশেখর মনসুর: পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের সুযোগ্য পুত্র।

 

জয়পুর-আত্রাউলি গায়কীর বৈশিষ্ট্য

১. লয়ের স্থিতাবস্থা (Medium-Slow Tempo)

সাধারণত অন্যান্য ঘরানায় (যেমন কিরাণা বা গোয়ালিয়র) গান শুরু হয় খুব ধীর গতির ‘বিলম্বিত’ লয়ে, যা ধীরে ধীরে দ্রুত লয়ের দিকে যায়। কিন্তু জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানায় গান শুরু হয় ‘মধ্য-বিলম্বিত’ লয়ে। পুরো গান জুড়ে এই লয়কে একদম স্থির রাখা হয়। এই স্থির লয়ের ওপর দাঁড়িয়ে জটিল তান ও অলঙ্কার প্রয়োগ করা গায়কের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।

২. যোদ-রাগ বা অপ্রচলিত রাগের প্রাধান্য

এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ সাহেব সাধারণ রাগের চেয়ে ‘যোদ-রাগ’ (দুটি রাগের মিশ্রণ) গাইতে বেশি পছন্দ করতেন। জয়পুর ঘরানার শিল্পীরা এমন সব রাগ পরিবেশন করেন যা অন্য ঘরানায় সচরাচর শোনা যায় না।

  • উদাহরণ: বাগীশ্বরী-বাহার, বসন্ত-বাহার, খট, রাইসা কানাড়া, বা শুক্ল বিলাবল। একই সাথে দুটি রাগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে গেয়ে যাওয়া এই ঘরানার শিল্পীদের বিশেষত্ব।

৩. বক্র ও সর্পিল তান (Spiral Taans)

এই ঘরানার তানের কাজকে বলা হয় ‘পেঁচিদা তান’ বা বক্র তান। এখানকার তানগুলো সোজা বা সরল রেখায় (যেমন: সা রে গা মা…) চলে না। বরং এগুলো অত্যন্ত প্যাঁচানো এবং সর্পিল গতিতে চলে। এই তানগুলো গাইতে গেলে গলার ওপর অসামান্য নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর যখন এই তানগুলো করতেন, তখন মনে হতো তিনি সুরের এক গোলকধাঁধায় খেলছেন।

৪. তালের অবিচ্ছেদ্য শাসন (Continuity of Rhythm)

জয়পুর গায়কীতে তালের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গায়ক যখন রাগের বিস্তার বা আলাপ করেন, তখন তালের প্রথম মাত্রা বা ‘সম’ (Sam)-এ ফেরার জন্য তিনি কোনো সহজ পথ বেছে নেন না। তালের প্রতিটি আবর্তনে (Cycle) নতুন নতুন ছন্দ তৈরি করে নিখুঁতভাবে ‘সম’-এ আসাই এই গায়কীর অনন্য অলঙ্কার। গায়কীর এই ধরনকে বলা হয় ‘লয়কারী’

৫. আকাশধর্মী ও অবিচ্ছিন্ন আলাপ (Vistar)

এই ঘরানার আলাপগুলো অনেকটা ‘আকাশ’ বা ‘মুক্ত’ প্রকৃতির। গায়ক প্রতিটি স্বরকে এমনভাবে অন্য স্বরের সাথে যুক্ত করেন যেন সুরের মাঝে কোনো বিচ্ছেদ বা গ্যাপ না থাকে। একে বলা হয় ‘অখণ্ড গায়কী’। কোনো অপ্রয়োজনীয় বিরতি ছাড়াই সুরের প্রবাহ এক স্বর থেকে অন্য স্বরে বয়ে চলে।

৬. কান (Kan) এবং মীড় (Meend) এর প্রয়োগ

জয়পুর গায়কীতে স্বরের অলঙ্করণ হিসেবে ‘কান’ (স্পর্শ স্বর) এবং ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া) অত্যন্ত সুচারুভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে এগুলো কখনো মূল সুরকে ছাপিয়ে যায় না, বরং সুরের গাম্ভীর্য বৃদ্ধি করে।

এই ঘরানা বিষয়ে সারিতা পাঠক এর বর্ণনা:

 

এই সিরিজের অন্যান্য আর্টিকেল সূচি:

Leave a Comment