আঠারো শতকের দিকে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হলে দিল্লি কেন্দ্রিক রাজদরবারভিত্তিক সংগীতচর্চার কাঠামো ভেঙে যেতে থাকে। এর ফলে দরবারি সংগীতশিল্পীরা বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যে—যেমন গোয়ালিয়র, জয়পুর, লখনউ, রামপুর, হায়দ্রাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে—আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই ভৌগোলিক বিচ্ছুরণই মূলত ঘরানা পদ্ধতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিটি অঞ্চলে শিল্পীরা নিজস্ব পরিবেশ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং শিক্ষাপদ্ধতির প্রভাব নিয়ে গায়কির একটি স্বতন্ত্র রূপ গড়ে তোলেন। এইভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন গায়নশৈলী, রাগের বিস্তারের ধরণ এবং তানের অলংকরণভিত্তিক আলাদা পরিচয় তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ‘ঘরানা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
একটি ঘরানাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা পেতে সাধারণত অন্তত তিন প্রজন্মের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ শৈলী যদি গুরু থেকে শিষ্য হয়ে তার পরবর্তী প্রজন্মে টিকে থাকে এবং একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি করে, তবেই সেটি একটি স্বীকৃত ঘরানা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘরানা পদ্ধতি একদিকে যেমন সংগীতকে বৈচিত্র্যময় করেছে, অন্যদিকে প্রতিটি রাগের উপস্থাপনাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে সংরক্ষণ করতেও সাহায্য করেছে। ফলে একই রাগ ভিন্ন ঘরানায় ভিন্নভাবে পরিবেশিত হলেও তার নিজস্ব শুদ্ধতা বজায় থাকে।
গায়নশৈলীর ভিন্নতার ভিত্তিতে হিন্দুস্থানি কণ্ঠসংগীতের ঘরানাগুলোকে সাধারণভাবে তিনটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়—ধ্রুপদ, খেয়াল এবং উপ-শাস্ত্রীয় (যেমন ঠুমরি)। নিচে প্রতিটি ধারার ঘরানা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana)
ধ্রুপদ ঘরানা
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীনতম এবং শাস্ত্রনিষ্ঠ গায়নধারা হলো ধ্রুপদ। এর গায়কি গম্ভীর, সংযত এবং রাগের বিশুদ্ধ উপস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ধ্রুপদ কেবল একটি সংগীতধারা নয়, এটি দীর্ঘ সাধনা ও শৃঙ্খলার ফল।
ঐতিহাসিকভাবে ধ্রুপদের গায়নশৈলীগুলোকে ‘বাণী’ (Bani) নামে চিহ্নিত করা হতো। এই বাণীগুলো মূলত ভৌগোলিক অঞ্চল এবং পরিবেশন পদ্ধতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে এই বাণীগুলোর ধারাবাহিক রূপান্তর ঘটেই আধুনিক ধ্রুপদ ঘরানাগুলোর জন্ম হয়।
ধ্রুপদকে তাই শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়—কারণ এখান থেকেই পরবর্তী খেয়ালসহ অন্যান্য ধারার বিকাশ হয়েছে।
ধ্রুপদের মূল চারটি বাণী (The Four Banis)
আধুনিক ঘরানাগুলো বোঝার আগে ধ্রুপদের চারটি প্রাচীন বাণী সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। এগুলো ধ্রুপদ গায়নশৈলীর মূল ভিত্তি:
ডাগরবাণী (Dagarbani):
এটি ‘সাধারণী গীতি’ নামেও পরিচিত। দীর্ঘ, ধীর এবং গভীর আলাপ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। স্বরের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং ধীরগতির বিস্তারে এই বাণী বিশেষভাবে পরিচিত। বিস্তারিত জনুন : ডাগরবাণী (Dagar Vani), ডাগর ঘরনা ও ডাগর পরিবার
গওহারবাণী (Gauharbani):
শুদ্ধ স্বরপ্রয়োগ এবং সরল গায়কি এর বৈশিষ্ট্য। এতে অলংকারের ব্যবহার কম এবং রাগের সরল উপস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিস্তারিত জানতে : গওহারবাণী (Gauhar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana)
খণ্ডারবাণী (Khandarbani):
দ্রুত লয়, জটিল লয়কারী এবং শক্তিশালী তানের জন্য এই বাণী পরিচিত। গাণিতিক ছন্দ ও তালের কাজ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তারিত দেখুন : খণ্ডারবাণী (Khandar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana)
নওহারবাণী (Nauharbani):
স্বরবিন্যাসের বৈচিত্র্য এবং ঝংকারধর্মী গায়কি এর বৈশিষ্ট্য। এতে অলংকারের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বিস্তারিত দেখুন: নওহারবাণী (Nauhar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana)
ধ্রুপদ ঘরানার তালিকা: পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাণীগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধ্রুপদ ঘরানার বিকাশ ঘটে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ ঘরানাগুলোর পরিচয় দেওয়া হলো:
ডাগর ঘরানা (Dagar Gharana):
ডাগর পরিবারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই ঘরানাটি বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত ধ্রুপদ ধারাগুলোর একটি। এটি মূলত ডাগরবাণীর অনুসারী এবং দীর্ঘ, ধীরস্থির আলাপের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এই ঘরানার বিস্তারিত উপরে বর্ণনা করা হয়েছে।
বিষ্ণুপুর ঘরানা (Bishnupur Gharana):
বাংলার একমাত্র ধ্রুপদ ঘরানা। কীর্তন ঐতিহ্য এবং ধ্রুপদের সংমিশ্রণে এর সৃষ্টি। এখানে ধ্রুপদ ও খেয়ালের মিশ্র প্রভাব দেখা যায়। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে বিষ্ণুপুর ঘরানা (Bishnupur Gharana)
দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga Gharana):
বিহারের দরভাঙ্গা অঞ্চলে বিকশিত এই ঘরানা মূলত খণ্ডারবাণীর ধারক। এতে লয়কারী এবং জটিল তালের ব্যবহার বেশি গুরুত্ব পায়। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga Gharana)
বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana):
বিহারের প্রাচীন ঘরানাগুলোর একটি। এখানে নওহার ও খণ্ডার বাণীর সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana)
তলোয়ান্ডি ঘরানা (Talwandi Gharana):
পাঞ্জাব অঞ্চলে বিকশিত এই ঘরানাটি কঠোর শাস্ত্রনিষ্ঠ গায়কি এবং গম্ভীর উপস্থাপনার জন্য পরিচিত। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে তলোয়ান্ডি ঘরানা (Talwandi Gharana)
দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana):
বিহারের বক্সার অঞ্চলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানার বিকাশ ঘটে। এতে ধ্রুপদের একটি স্বতন্ত্র পরিবেশনরীতি গড়ে ওঠে। বিস্তারিত দেখুন: ধ্রুপদে দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana)
মেওয়াতি ঘরানা (Mewati Gharana):
প্রাথমিকভাবে খণ্ডারবাণী থেকে উদ্ভূত হলেও, পরবর্তীকালে এটি খেয়াল গায়কির জন্য বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে মেওয়াতি ঘরানা (Mewati Gharana)
কাল্পি ঘরানা (Kalpi Gharana):
উত্তরপ্রদেশের একটি প্রাচীন ধারা, যা মধ্যযুগীয় সংগীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে। বিস্তারিত দেখুন : ধ্রুপদে কাল্পি ঘরানা (Kalpi Gharana)
ধ্রুপদ ঘরানাগুলো আজও শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীন কাঠামো এবং বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ করে চলেছে। প্রতিটি ঘরানা রাগ উপস্থাপনার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে, যা ঐতিহ্যগতভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত হয়েছে।
খেয়াল ঘরানা
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতে খেয়াল গায়কি বর্তমানে সবচেয়ে বিস্তৃত এবং প্রভাবশালী ধারা। এই ধারার ঘরানা পদ্ধতি মূলত প্রাচীন গুরু-শিষ্য পরম্পরার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যার ঐতিহাসিক শিকড় ধ্রুপদের ‘বাণী’ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দিল্লির দরবারকেন্দ্রিক সংগীতচর্চা ভেঙে পড়ে। ফলে শিল্পীরা বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যে—যেমন গোয়ালিয়র, লখনউ, হায়দ্রাবাদ, পাতিয়ালা, রামপুর প্রভৃতি স্থানে আশ্রয় নেন। এই ভৌগোলিক বিস্তারই খেয়াল গায়নশৈলীর বৈচিত্র্য তৈরি করে এবং একাধিক ঘরানার জন্ম দেয়।
প্রতিটি খেয়াল ঘরানার নিজস্ব গায়কি বা উপস্থাপনার ধরন রয়েছে। একটি রাগ কীভাবে বিস্তার করা হবে, আলাপ কতটা দীর্ঘ হবে, বোল-আলাপ বা বোল-তান কতটা ব্যবহার করা হবে, তানের গতি ও ধরন কেমন হবে, কিংবা তাল ও লয়ের জটিলতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে—এই সব বিষয়ই ঘরানাভেদে পরিবর্তিত হয়। ফলে একই রাগ বিভিন্ন ঘরানায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্র ধারণ করতে পারে।
আধুনিক যুগে ঘরানার কঠোর সীমারেখা কিছুটা শিথিল হয়েছে। অনেক শিল্পী নিজ ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে অন্য ঘরানার উপাদানও গ্রহণ করছেন। তবে ঘরানাভিত্তিক শিক্ষা এখনো সংগীতের শাস্ত্রীয় কাঠামো রক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
পরিচিত খেয়াল ঘরানার তালিকা: বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়
নিচে খেয়াল গায়নশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ ঘরানাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো:
১. কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানা
আমির খসরুকে এই ধারার আদি প্রবর্তক হিসেবে ধরা হয়। খেয়ালের প্রাথমিক রূপ এই ধারার মধ্যেই বিকশিত হয়। আধ্যাত্মিক ভাব এবং রাগের বিস্তারে তুলনামূলক স্বাধীনতা এর বৈশিষ্ট্য। বিস্তারিত দেখুন: খেয়ালে কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানা (Qawwal Bacchon Ka Gharana)
২. দিল্লি ঘরানা (Delhi Gharana)
তানরস খাঁ ও মিয়াঁ সমতির মাধ্যমে বিকশিত। দ্রুত তান, সপাট তান এবং সূক্ষ্ম লয়কারীর জন্য পরিচিত।
৩. গোয়ালিয়র ঘরানা (Gwalior Gharana)
নথ্থন পীর বকশ এবং হাসু-হাদ্দু খাঁ এই ঘরানার প্রধান ব্যক্তিত্ব। এটিকে “সকল ঘরানার জননী” বলা হয়। সরল, সুশৃঙ্খল গায়কি এবং গমকযুক্ত তানের ব্যবহার এর মূল বৈশিষ্ট্য।
৪. আগ্রা ঘরানা (Agra Gharana)
ঘাগে খোদাবকশ ও ফৈয়াজ খাঁ এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। ধ্রুপদ অঙ্গের প্রভাব, শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং জটিল লয়কারীর ব্যবহার এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
৫. কিরানা ঘরানা (Kirana Gharana)
ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ ও আব্দুল ওয়াহিদ খাঁ এই ঘরানার প্রধান শিল্পী। বিলম্বিত লয়ে রাগের বিস্তার, স্বরের মাধুর্য এবং সরগমের সূক্ষ্ম ব্যবহার এর বৈশিষ্ট্য।
৬. জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা (Jaipur-Atrauli Gharana)
ওস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ প্রতিষ্ঠাতা। জটিল ও অপ্রচলিত রাগ, বক্র তান এবং গাণিতিক ছন্দ এই ঘরানার প্রধান বৈশিষ্ট্য। জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা বিস্তারিত দেখুন (জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানা | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ )
৭. পাতিয়ালা ঘরানা (Patiala Gharana)
আলী বকশ ও ফতেহ আলী খাঁ এই ধারার প্রবর্তক। দ্রুত তান, টপ্পা অঙ্গ এবং সরগমের চপলতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
৮. রামপুর-সহসওয়ান ঘরানা (Rampur-Sahaswan Gharana)
ওস্তাদ এনায়েত হোসেন খাঁ এই ঘরানার প্রধান শিল্পী। দীর্ঘ আকার তান এবং তারানা গায়নে দক্ষতা এর বৈশিষ্ট্য।
৯. ইন্দোর ঘরানা (Indore Gharana)
ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব প্রতিষ্ঠাতা। অতি-বিলম্বিত লয়, অন্তর্মুখী গায়কি এবং মেরুখণ্ড পদ্ধতির আলাপ এই ঘরানাকে স্বতন্ত্র করেছে।
১০. ভেন্ডিবাজার ঘরানা (Bhendi Bazaar Gharana)
ছাজ্জু খাঁ ও নজির খাঁ এই ধারার প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘ শ্বাসনিয়ন্ত্রণ, লম্বা তান এবং কর্ণাটকী সংগীতের প্রভাব এখানে লক্ষণীয়।
১১. মেওয়াতি ঘরানা (Mewati Gharana)
ঘাগে নজির খাঁ ও পরবর্তীতে পণ্ডিত জসরাজ এই ঘরানাকে জনপ্রিয় করেন। ভজনধর্মী গায়কি, সুরের লালিত্য এবং আধ্যাত্মিক আবহ এর বৈশিষ্ট্য।
১২. খুরজা ঘরানা (Khurja Gharana)
ওস্তাদ আজমত হোসেন খাঁ প্রতিষ্ঠাতা। দিল্লি ও আগ্রা ঘরানার মিশ্র প্রভাব এবং তানের বৈচিত্র্য এখানে দেখা যায়।
১৩. শাম চৌরাসিয়া ঘরানা (Sham Chaurasia Gharana)
মিয়াঁ চাঁদ খাঁ ও মিয়াঁ সূরজ খাঁ এই ধারার প্রধান ব্যক্তিত্ব। যুগলবন্দী গায়কি এবং দ্রুত লয়ের কাজের জন্য পরিচিত।
১৪. পঞ্চাক্ষর ঘরানা (Panchakshar Gharana)
পঞ্চাক্ষর গওয়াই ও পুত্তরাজ গওয়াই এই ঘরানার সাথে যুক্ত। আধ্যাত্মিক চর্চা এবং ব্রেইল স্বরলিপির মাধ্যমে সংগীত শিক্ষা এই ধারার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
১৫. কুয়র শ্যাম ঘরানা (Kuar Shyam Gharana)
গোস্বামী লালজি মহারাজ প্রতিষ্ঠাতা। মীড়-ভিত্তিক আলাপ এবং জটিল তানের বিন্যাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
১৬. হাপুড় ঘরানা (Hapur Gharana)
ওস্তাদ মুসা খাঁ এই ঘরানার প্রধান নাম। এটি একটি প্রাচীন ধারা, যা গোয়ালিয়র ঘরানার সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়েছে।
১৭. কপুরথালা ঘরানা (Kapurthala Gharana)
ওস্তাদ মীর নাসির আহমেদ এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। পাঞ্জাব অঞ্চলের প্রভাব এবং ধ্রুপদ-খেয়ালের সংমিশ্রণ এখানে দেখা যায়।
খেয়াল ঘরানাগুলোর এই বৈচিত্র্যই হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। প্রতিটি ঘরানা রাগ উপস্থাপনার একটি আলাদা পদ্ধতি তৈরি করেছে, যা সংগীতচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। যদিও বর্তমান সময়ে অনেক শিল্পী মিশ্র গায়কি ব্যবহার করছেন, তবুও এই ঘরানাগুলোর মৌলিক শিক্ষা এখনো শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
ঠুমরি ঘরানা
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যে ঠুমরি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপ-শাস্ত্রীয় (Semi-classical) গীতধারা। ধ্রুপদ বা খেয়ালের মতো এখানে রাগের কঠোর ব্যাকরণ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তুলনামূলকভাবে কম; বরং সুরের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশই এর মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে প্রেম, বিরহ, মান-অভিমান এবং শৃঙ্গার রস ঠুমরির প্রধান উপজীব্য।
ঠুমরির গায়নশৈলীতে ‘বোল-বনাও’—অর্থাৎ শব্দের অর্থকে সুরের অলংকরণ দিয়ে প্রকাশ করার কৌশল—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই লাইন বারবার গেয়ে তার ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন আবেগের প্রকাশ ঘটানো ঠুমরির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই কারণে ঠুমরি অনেক সময় খেয়ালের তুলনায় বেশি ব্যক্তিনির্ভর এবং অভিব্যক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
ঠুমরির বিকাশ মূলত উত্তর ভারতের আঞ্চলিক সংস্কৃতি, বিশেষ করে লখনউ ও বেনারস অঞ্চলের দরবার এবং লোকজ সংগীতের প্রভাবে ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন গায়নরীতি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে আলাদা ঘরানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ঠুমরি ঘরানার প্রধান ধারা: বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য
ঠুমরির ঘরানাগুলো মূলত গায়নশৈলী, আবেগপ্রকাশ এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ভিত্তিতে পৃথক হয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ ঘরানাগুলোর বিশদ পরিচয় দেওয়া হলো:
বেনারস বা বারাণসী ঘরানা (Benaras Gharana):
এই ঘরানাটি ‘পুরব অঙ্গ’ ঠুমরির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে শব্দের অর্থকে গুরুত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে সুরের অলংকরণ করা হয়, যা ‘বোল-বনাও’ শৈলীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
বেনারস ঘরানার গায়কি তুলনামূলকভাবে গম্ভীর এবং খেয়ালধর্মী। রাগের ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রেখে আবেগ প্রকাশ করা হয়। কণ্ঠে মাধুর্য, উচ্চারণে স্পষ্টতা এবং অলংকরণের সূক্ষ্মতা এই ঘরানার বৈশিষ্ট্য।
ঐতিহাসিকভাবে কীর্তনধর্মী সংগীতের প্রভাব এখানে লক্ষণীয়। আধুনিক যুগে গিরিজা দেবী, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, রসুলন বাঈ ও সবিতা দেবী এই ঘরানাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
লখনউ ঘরানা (Lucknow Gharana):
লখনউ ঘরানা মূলত তার ‘নজাকত’ (কমনীয়তা) এবং ‘আন্দাজ’ (স্টাইল) এর জন্য পরিচিত। এই ধারায় সুরের পাশাপাশি দেহভঙ্গি, অভিব্যক্তি এবং নৃত্যের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কথক নৃত্যের সঙ্গে ঠুমরির এই ঘরানার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গানের উপস্থাপনায় লাবণ্য, অলংকারের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং শৃঙ্গার রসের প্রকাশ এখানে প্রধান।
নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানার বিকাশ ঘটে। বিন্দাদিন মহারাজ ও লচ্ছু মহারাজ এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
পাতিয়ালা ঘরানা (Patiala Gharana)
পাতিয়ালা ঘরানার ঠুমরি গায়কি অন্য দুই প্রধান ঘরানা থেকে আলাদা। এখানে পাঞ্জাব অঞ্চলের টপ্পা গায়নশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। ফলে গায়কি তুলনামূলকভাবে দ্রুত, তাননির্ভর এবং কণ্ঠপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে।
এই ধারায় সরগম, তান এবং লয়ের কাজ বেশি গুরুত্ব পায়। আবেগ প্রকাশ থাকলেও তা মূলত কণ্ঠের কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ এই ঘরানাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলেন। আধুনিক সময়ে অজয় চক্রবর্তী এই ধারার অন্যতম ধারক।
গয়া ঘরানা (Gaya Gharana)
বিহারের গয়া অঞ্চলে বিকশিত এই ঘরানাটি একসময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। এর গায়নভঙ্গিতে স্থানীয় লোকসংগীতের প্রভাব লক্ষণীয় ছিল।
এই ঘরানার বিশেষত্ব ছিল এর স্বতন্ত্র ‘ঢঙ’ বা পরিবেশনার ধরণ, যা অন্য ঘরানার তুলনায় ভিন্ন ছিল। তবে বর্তমানে এই ঘরানাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।
ঐতিহাসিকভাবে ঢেলী বাঈ এবং গয়ার তওয়ায়েফরা এই ঘরানার ধারাকে জীবিত রেখেছিলেন।
কলকাতা বা সংমিশ্রিত শৈলী
উত্তর ভারতের শিল্পীরা যখন কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন, তখন বেনারস ও লখনউ ঘরানার সংমিশ্রণে একটি নতুন গায়নশৈলী তৈরি হয়। এটিকে অনেক সময় ‘বেঙ্গল ঠুমরি’ বলা হয়।
এই শৈলীতে বোল-বনাও এবং লালিত্য—উভয়েরই সমন্বয় দেখা যায়। ফলে এটি এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ গায়কি তৈরি করে, যেখানে আবেগ ও কারিগরি উভয় দিকই গুরুত্ব পায়।
ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ ও গিরিজা দেবীর কলকাতায় দীর্ঘ সময় অবস্থানের ফলে এই ধারাটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
ঠুমরির ঘরানাগুলোর মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য
ঠুমরির বিভিন্ন ঘরানাকে বোঝার জন্য তাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর পার্থক্য লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ।
বেনারস ঘরানা মূলত শব্দের অর্থ এবং আবেগ প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে ‘বোল-বনাও’ প্রধান ভূমিকা পালন করে। লখনউ ঘরানা গুরুত্ব দেয় লাবণ্য, দেহভঙ্গি এবং নৃত্যনির্ভর উপস্থাপনার ওপর। অন্যদিকে পাতিয়ালা ঘরানা কণ্ঠের ক্ষিপ্রতা, তান এবং সুরের দ্রুত চলনের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এই পার্থক্যগুলোই ঠুমরিকে একটি বহুমাত্রিক গীতধারায় পরিণত করেছে।