রাগ দেবগান্ধার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ দেবগান্ধার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং উচ্চমার্গের রাগ। এটি মূলত ভক্তি ও করুণ রসের সংমিশ্রণে তৈরি এক গম্ভীর প্রকৃতির রাগ।

রাগ দেবগান্ধার

রাগ দেবগান্ধার: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ দেবগান্ধার (Devgandhar) মূলত আসাবরী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। প্রাচীন সংগীত গ্রন্থগুলোতে এই রাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রাগটি গাওয়ার সময় রাগ আসাবরী এবং রাগ জৌনপুরীর ছায়া পাওয়া গেলেও, এর চলন এবং স্বর প্রয়োগ একে একটি স্বতন্ত্র রূপ দান করে। এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যম (ম) এবং পঞ্চম (প) স্বরের ব্যবহার এবং ঋষভ (রে) ও ধৈবত (ধ) স্বরের ওপর বিশেষ আন্দোলন। এটি মূলত শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির এবং এটি শুনলে মনে এক ধরণের আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা বা ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের ভাব জাগ্রত হয়। শিখ ধর্মগ্রন্থ ‘শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহেব’-এও এই রাগের উল্লেখ ও গুরুত্ব পাওয়া যায়।

রাগের শাস্ত্র

রাগ দেবগান্ধার-এর শাস্ত্রীয় রূপ ও নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: আসাবরী।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)। কোনো কোনো মতে এটি শাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি স্বর)।
  • আরোহ: সা রে ম প ধ নি সঁ (এখানে ধ ও নি কোমল)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ প ম গ রে সা (এখানে গ, ধ, নি — তিনটি স্বরই কোমল)।
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম)। (কোনো কোনো ঘরানায় ধৈবত-কে বাদী মনে করা হয়)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: সাধারণত কোনো স্বর বর্জিত নয়, তবে আরোহে গান্ধার (গ) বক্রভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (ম) ও পঞ্চম (প) শুদ্ধ; কিন্তু গান্ধার (গ), ধৈবত (ধ) ও নিষাদ (নি) কোমল।
  • সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তি রসাত্মক।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

দেবগান্ধার রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ আসাবরী: দেবগান্ধারের মূল ভিত্তি আসাবরী ঠাট থেকে আসা, তবে দেবগান্ধারে মধ্যমের প্রাধান্য বেশি।
  • রাগ জৌনপুরী: জৌনপুরীর সাথে এর স্বরগত মিল থাকলেও দেবগান্ধারের চলন অনেক বেশি ধীর এবং গম্ভীর।
  • রাগ গন্ধারী: দেবগান্ধার এবং গন্ধারী উভয়ই আসাবরী অঙ্গের রাগ হলেও এদের মীড় ও তানের কাজে পার্থক্য রয়েছে।
  • রাগ দরবারী কানাড়া: গম্ভীর প্রকৃতির হওয়ার কারণে অনেক সময় দেবগান্ধারে দরবারীর সামান্য ছায়া অনুভূত হয়, যদিও তাদের ঠাট ও চলন ভিন্ন।

 

রাগ দেবগান্ধার তার গাম্ভীর্য এবং সুক্ষ্ম স্বরবিন্যাসের কারণে উচ্চাঙ্গ সংগীতের দরবারে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এটি গায়ক বা বাদকের জন্য যেমন কঠিন সাধনার বিষয়, শ্রোতার জন্য তেমনই এটি আত্মিক প্রশান্তির আকর। ভক্তি ও করুণ রসের মাধ্যমে এই রাগটি মানুষের মনকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক জগতের স্বাদ দেয়। শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা বজায় রাখতে দেবগান্ধারের মতো রাগগুলোর চর্চা অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র (Sources)

এই নিবন্ধের তথ্যগুলো নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস ও শাস্ত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৪) – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

২. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

৪. ভারতীয় সংগীতের রাগ অভিধান – বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংগীত গবেষণা কেন্দ্র।

আরও দেখুন: