অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাওয়া মওলানা আজাদের ১৩টি ভবিষ্যৎবাণী: পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নিয়তি | ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

ইতিহাসের কিছু কিছু বাঁক এমন কিছু দূরদর্শী মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যাঁদের সমসাময়িক সমাজ ‘উন্মাদ’ বা ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ ভাবলেও সময় তাঁদের প্রতিটি শব্দকে নিখুঁত সত্য হিসেবে প্রমাণ করে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে তেমনই এক ক্ষণজন্মা ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ। যখন ভারতজুড়ে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর উন্মাদনা এবং মুসলিম লীগের ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ এক আবেগময় তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই অবিসংবাদিত ইসলামী চিন্তাবিদ, বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন। তিনি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের এই আবেগকে কেবল সাময়িক মোহের সাথে তুলনা করেননি, বরং এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ও তার অনিবার্য করুণ পরিণতি দেখতে পেয়েছিলেন নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।

১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাস। ভারতবর্ষের ভাগ্য নির্ধারণে তখন দিল্লিতে চলছে ঐতিহাসিক ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান’-এর টানটান উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা। দেশভাগের ঠিক এক বছর আগের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে, দিল্লির এক শান্ত পরিবেশে টানা দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ভোরবেলা (ফজরের নামাজের পর) মওলানা আজাদের মুখোমুখি বসেছিলেন লাহোর-ভিত্তিক বিখ্যাত উর্দু ম্যাগাজিন ‘চাতান’ (Chattan)-এর সম্পাদক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক শূরিশ কাশ্মীরি (Shorish Kashmiri)। সেই নিভৃত ভোরে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া, কেবল ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকে মওলানা আজাদ এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার দেন।

এই সাক্ষাৎকারে তিনি নবগঠিত হতে যাওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়তি নিয়ে এমন কিছু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, যা তৎকালীন মুসলিম লীগের সমর্থকেরা কল্পনাও করতে পারেনি। মওলানা আজাদের সেই অবিকৃত সাক্ষাৎকারটি পরবর্তীতে শূরিশ কাশ্মীরির বিখ্যাত উর্দু গ্রন্থ ‘Abul Kalam Azad’ এবং লাহোরের ‘মাতবুয়াত-ই-চাতান’ থেকে প্রকাশিত দাপ্তরিক নথিতে হুবহু সংকলিত হয়। আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে করা তাঁর সেই বিশ্লেষণগুলো পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙন ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, পাকিস্তানে বারবার সামরিক স্বৈরাচার, বর্তমান চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা এবং উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের রূপ ধারণের মধ্য দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

যেহেতু মূল উর্দু সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বইয়ের কয়েক ডজন পৃষ্ঠা-ব্যাপী বিস্তৃত, এত পড়ার ধৈর্য কারও হবে না, তাই পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ঐতিহাসিক মূল ভাব ও দালিলিক সত্যতা শতভাগ অক্ষুণ্ণ রেখে—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি ভবিষ্যৎবাণী ও প্রামাণ্য প্রশ্ন-উত্তর আকারে নিচে উপস্থাপন করলাম।

পরে সময় পেলে আরও দীর্ঘ অনুবাদ দেব।

যদি নাস্তালিখে উর্দু পড়তে পারেন, তবে শোরিশ কাশ্মীরির উর্দুতে লেখা ‘মওলানা আবুল কালাম আজাদ’ বইটি দিয়ে দিলাম; ডাউনলোড করে নিতে পারেন। – Abul Kalam Azad by Shorish kashmiri, Urdu Version

Table of Contents

মওলানা আজাদের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার: সংক্ষিপ্ত হাইলাইটস

১. দেশভাগের ভিত্তি এবং পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল আশঙ্কা

শূরিশ কাশ্মীরি (Shorish Kashmiri) প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Musalmanon ke mustaqbil ke mutaliq aap ka asal khadsha kya hai? Kya partition se Musalmanon ka masla hal nahi hoga?”

বাংলা অনুবাদ: “মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার আসল আশঙ্কা কী? দেশভাগ (পার্টিশন) হলে কি মুসলমানদের সমস্যার সমাধান হবে না?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ (Maulana Azad) জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Mera khadsha yeh hai ke Pakistan ka qiyam Musalmanon ke liye koi mustaqil hal nahi hai. Is se na sirf Hindustan ke Musalman takseem honge, balki jo naya mulk banega, woh khud bohot se masail mein ghir jayega. Jinnah sahab Musalmanon ko ek aisi raah par le ja rahe hain jahan aage chalkar andhera hi andhera hai. Yeh partition nafrat par qaim ho raha hai, aur jo riyasat nafrat par qaim hoti hai, woh sirf tab tak chalti hai jab tak nafrat baqi rahe.”

বাংলা অনুবাদ: “আমার আশঙ্কা হলো, পাকিস্তান সৃষ্টি মুসলমানদের জন্য কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এর দ্বারা কেবল হিন্দুস্তানের মুসলমানরাই বিভক্ত হবে না, বরং যে নতুন দেশ তৈরি হবে, সেটি নিজেই বহু সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়বে। জিন্নাহ সাহেব মুসলমানদের এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছেন যার সামনে কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার। এই দেশভাগ ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে, আর যে রাষ্ট্র ঘৃণার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তা কেবল ততদিনই টিকে থাকে যতদিন সেই ঘৃণা বজায় থাকে।”

২. দুই পাকিস্তানের (পূর্ব ও পশ্চিম) ভৌগোলিক দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Lekin Quaid-e-Azam ka kehna hai ke Islam dono hisson ko ek rakhne ke liye kafi hai. Is par aap ka kya khayal hai?”

বাংলা অনুবাদ: “কিন্তু কায়েদে আজমের (জিন্নাহ) দাবি হলো, দুই অংশকে (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) এক রাখার জন্য ইসলামই যথেষ্ট। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Islam ke naam par siyasat karna alag baat hai, lekin geography aur culture ko nazar-andaz nahi kiya ja sakta. Mashriqi Pakistan (East Bengal) aur Maghribi Pakistan ke darmayan hazar meel ka fasla hai. Unka rehna-sehna, zabaan aur shaqafat sab alag hain. Jinnah aur Liaquat Ali Khan ke baad, koi choti si chingaari bhi dono hisson ko alag kar degi. Mashriqi Pakistan zyada der tak sath nahi reh sakega aur alag ho jayega.”

বাংলা অনুবাদ: “ইসলামের নামে রাজনীতি করা এক জিনিস, কিন্তু ভূগোল ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা যায় না। পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে হাজার মাইলের দূরত্ব। তাদের জীবনযাত্রা, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর, কোনো ছোটখাটো স্ফুলিঙ্গও দুই অংশকে আলাদা করে দেবে। পূর্ব পাকিস্তান বেশিদিন একসাথে থাকতে পারবে না এবং আলাদা হয়ে যাবে।”

৩. ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার ও ধর্মীয় উলামাদের ভূমিকা

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Kya Pakistan mein Islami nizam (Islamic system) qaim nahi hoga? Ulema toh yahi keh rahe hain.”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তানে কি ইসলামী শাসন কায়েম হবে না? উলামারা (ধর্মীয় নেতারা) তো সেটাই বলছেন।”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Aap Islam ka naam ek aise maqsad ke liye istemal kar rahe hain jo Islamic standards par sahi nahi hai. Musalmanon ki tareekh gawah hai ke jab bhi mazhab ko siyasat ke liye istemal kiya gaya, uske nateeje kharab nikle. Pakistan mein ulema ka kirdar siyasat mein barh jayega lekin Islam ki asli rooh gum ho jayegi. Log mazhab ke naam par larenge aur iqtedar ke bhooke log mazhab ko apna hathaer banayenge.”

বাংলা অনুবাদ: “আপনারা ইসলামের নাম এমন একটি উদ্দেশ্যের জন্য ব্যবহার করছেন যা ইসলামী মানদণ্ডে সঠিক নয়। মুসলমানদের ইতিহাস সাক্ষী যে, যখনই ধর্মকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তার পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। পাকিস্তানে উলামাদের রাজনৈতিক ভূমিকা বৃদ্ধি পাবে ঠিকই, কিন্তু ইসলামের আসল আত্মা হারিয়ে যাবে। মানুষ ধর্মের নামে লড়বে এবং ক্ষমতার লোভী মানুষরা ধর্মকে নিজেদের হাতিয়ার বানাবে।”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

৪. সামরিক একনায়কত্ব ও অযোগ্য নেতৃত্ব

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Kya Pakistan ke naye hukkam (rulers) mulk ko tarraqi ki raah par nahi le ja sakenge?”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তানের নতুন শাসকরা কি দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে পারবেন না?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Pakistan ko shuru mein jo siyasi qayadat (political leadership) milegi, woh jald hi khatam ho jayegi ya na-ahal sabit hogi. Jab siyasi log iqtedar sambhalne mein nakaam honge, toh fauj ke liye raasta hamwar ho jayega. Fauji amriyat (military dictatorship) mulk par qabza kar legi aur jamhooriyat (democracy) ka janaza nikal jayega. Siyasi istehkam (political stability) na hone ki wajah se har naya hukmaran pehle se zyada kamzoor sabit hoga.”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তান শুরুতে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাবে, তা দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাবে অথবা অযোগ্য প্রমাণিত হবে। যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্ষমতা সামলাতে ব্যর্থ হবে, তখন সামরিক বাহিনীর জন্য রাস্তা সুগম হবে। সামরিক একনায়কত্ব দেশ দখল করে নেবে এবং গণতন্ত্রের জানাজা বের হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকার কারণে প্রতিটি নতুন শাসক পূর্ববর্তীদের চেয়ে বেশি দুর্বল প্রমাণিত হবে।”

৫. আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের দাসত্ব ও ঋণের ফাঁদ

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Agar aisi haalat hui, toh Pakistan apni hifazat aur maashi (economic) baqa kaise karega?”

বাংলা অনুবাদ: “যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তবে পাকিস্তান নিজের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব কীভাবে টিকিয়ে রাখবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Pakistan apni baqa ke liye bairuni taaqaton (foreign powers) ka mohtaj ho jayega. Woh America ya digar bari taaqaton se madad mangege. Is ke nateeje mein, bairuni karzon (foreign debt) ka ek bhari bojh Pakistan ke sar par hoga. Pakistan ki kharija policy (foreign policy) azad nahi rahegi, balki unhi taaqaton ke isharon par chalegi jo use qarz aur imdad dengi. Woh apni azaadi bech kar sirf zinda rehne ki koshish karenge.”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তান নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বহিরাগত পরাশক্তিদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে। তারা আমেরিকা বা অন্যান্য বড় শক্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। এর ফলে, বৈদেশিক ঋণের একটি ভারী বোঝা পাকিস্তানের মাথায় চেপে বসবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন থাকবে না, বরং যারা তাদের ঋণ ও অনুদান দেবে, তাদের ইশারাতেই চলবে। তারা নিজেদের স্বাধীনতা বিক্রি করে কেবল বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।”

৬. নব্য ধনী ও পুঁজিপতিদের দ্বারা দেশের সম্পদ লুটপাট

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Mulk ke andar ki maashirat (society) aur sarmayadari ka kya nateoja hoga?”

বাংলা অনুবাদ: “দেশের অভ্যন্তরে সমাজ ও পুঁজিবাদের পরিণতি কী হবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Mulk mein ek naye ameer tabqe aur jageerdaron (feudal lords/industrialists) ka kabza hoga. Yeh log qoumi daulat ko berehmi se lootenge. Aam aadmi ghareeb se ghareeb-tar hota chala jayega. Is istehsaal (exploitation) ke nateeje mein tabqati jang (class war) ka khadsha paida hoga. Jab aam log dekhnge ke chand khandan poore mulk ki daulat par qabza kiye baithe hain, toh unme andaruni shorish (internal rebellion) paida hogi.”

বাংলা অনুবাদ: “দেশে এক নব্য ধনী শ্রেণী এবং বড় বড় শিল্পপতি ও জায়গিরদারদের কব্জা প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যক্তিরা জাতীয় সম্পদ নির্মমভাবে লুট করবে। সাধারণ মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকবে। এই শোষণের ফলে তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের আশঙ্কা তৈরি হবে। যখন সাধারণ মানুষ দেখবে যে মাত্র গুটিকয়েক পরিবার পুরো দেশের সম্পদ দখল করে বসে আছে, তখন তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের আগুন জ্বলবে।”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

৭. প্রতিবেশীদের সাথে শত্রুতা ও চিরস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Kya Pakistan aur Hindustan ke darmayan azaadi ke baad ache taalluqat qaim nahi ho sakenge?”

বাংলা অনুবাদ: “স্বাধীনতার পর পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের মধ্যে কি সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে না?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Hargiz nahi. Pakistan ki kharija policy (foreign policy) ka bunyadi satoon (pillar) hi Hindustan se dushmani par qaim hoga. Dono mulkon ke darmayan har waqt jangaah (armed conflict) aur kashidgi ka khadsha rahega. Pakistan apne qudrati masail se tawajjo hatane ke liye hamesha ‘Khatre mein Islam’ aur Hindustan ke khof ko zinda rakhega. Is jangi junoon (war hysteria) ki wajah se dono mulk apni daulat taraqqi par kharch karne ke bajaye asleha (weapons) par barbaad karenge.”

বাংলা অনুবাদ: “একেবারেই নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভই হিন্দুস্তানের সাথে শত্রুতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। দুই দেশের মধ্যে সবসময় যুদ্ধাবস্থা এবং তীব্র উত্তেজনার আশঙ্কা থাকবে। পাকিস্তান তার অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে সবসময় ‘ইসলাম বিপন্ন’ এবং হিন্দুস্তানের ভীতিকে বাঁচিয়ে রাখবে। এই যুদ্ধোন্মাদের কারণে দুই দেশই তাদের সম্পদ উন্নয়নের পেছনে খরচ না করে অস্ত্র কেনার পেছনে অপচয় করবে।”

৮. পাকিস্তানের যুবসমাজের ধর্মবিমুখতা

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Agar hukmaran Islam ka naam lete rahenge, toh kya awam aur naujawan mazhab se mutasir nahi honge?”

বাংলা অনুবাদ: “শাসকরা যদি ইসলামের নাম নিতেই থাকেন, তবে কি সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে না?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Nateoja iske bilkul ulat hoga. Jab hukmaran tabqa (ruling class) apni na-ahali, corruption aur zulum ko chupane ke liye Islam ka naam istemal karega, toh naye daur ke parhay-likhay naujawan mazhab se hi mutanaffir (repelled) ho jayenge. Woh samjhenge ke mazhab sirf iqtedar hasil karne aur awam ko dhoka dene ka ek hathaer hai. Is ke nateeje mein Pakistani naujawanon mein ghair-mazhabi (secular/irreligious) tehreekon aur communist khayalat ko farogh milega.”

বাংলা অনুবাদ: “পরিণতি এর সম্পূর্ণ উল্টো হবে। শাসক গোষ্ঠী যখন নিজেদের অযোগ্যতা, দুর্নীতি এবং জুলুম ঢাকা দিতে ইসলামের নাম ব্যবহার করবে, তখন নতুন যুগের শিক্ষিত যুবসমাজ ধর্মের প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে। তারা ভাববে যে ধর্ম কেবল ক্ষমতা অর্জন ও জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার একটি হাতিয়ার। এর ফলে পাকিস্তানি তরুণদের মধ্যে ধর্মবিমুখ এবং কমিউনিস্ট চিন্তাধারার প্রসার ঘটবে।”

৯. অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংঘাত (প্রাদেশিক কোন্দল)

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Mashriqi Pakistan ke alawa, kya baqi subon (provinces) mein koi ittehad (unity) baqi rahega?”

বাংলা অনুবাদ: “পূর্ব পাকিস্তান ছাড়া, বাকি প্রদেশগুলোর মধ্যে কি কোনো ঐক্য বজায় থাকবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Hindustan se alag hone ke baad subayiyati nafrat (provincialism) mazeed barh jayegi. Punjab, Sindh, Balochistan aur Sarhad (KPK) ke darmayan iqtedar aur wasail (resources) ki jang shuru hogi. Punjab apni aabadi aur taaqat ki wajah se bade bhai ka kirdar ada karne ki koshish karega, jise Sindh aur Balochistan hargiz qubool nahi karenge. Androoni inteshar (internal rebellion) aur elaqayi jhagray riyasat ko andar se khokhla kar denge.”

বাংলা অনুবাদ: “হিন্দুস্তান থেকে আলাদা হওয়ার পর প্রাদেশিক ঘৃণা আরও বৃদ্ধি পাবে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন নিয়ে যুদ্ধ শুরু হবে। পাঞ্জাব তার জনসংখ্যা ও শক্তির কারণে ‘বড় ভাই’-এর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করবে, যা সিন্ধু ও বেলুচিস্তান কখনোই মেনে নেবে না। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আঞ্চলিক ঝগড়া রাষ্ট্রটিকে ভেতর থেকে খোকলা করে দেবে।”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

১০. ভারতের অবশিষ্ট মুসলিমদের ভবিষ্যৎ ও পরিচয় সংকট

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Agar partition ho gaya, toh Hindustan mein reh jaane wale Musalmanon ka mustaqbil kya hoga?”

বাংলা অনুবাদ: “যদি দেশভাগ হয়েই যায়, তবে হিন্দুস্তানে থেকে যাওয়া মুসলমানদের ভবিষ্যৎ কী হবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Yeh Pakistan تحریک (movement) ka sab se bada almiya hai. Pakistan tamam Hindustani Musalmanon ko apne andar samane ki salahiyat nahi rakhta. Crore-on Musalman yahin reh jayenge. Partition ke baad, unhein hamesha shakk o shubha ki nigah se dekha jayega. Woh apne hi watan mein ajnabi ban jayenge. Pakistan jab bhi koi ghalati karega, us ka khamyaza Hindustan ke Musalmanon ko bhugatna padega. Un ki siyasi taaqat khatam ho jayegi aur woh ek mazloom aqalliyat (oppressed minority) ban kar reh jayenge.”

বাংলা অনুবাদ: “এটি পাকিস্তান আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। পাকিস্তানের পক্ষে সমস্ত হিন্দুস্তানি মুসলমানকে নিজের ভেতর জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। কোটি কোটি মুসলমান এখানেই থেকে যাবে। দেশভাগের পর, তাদের সবসময় সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখা হবে। তারা নিজেদের মাতৃভূমিতেই পরবাসী হয়ে পড়বে। পাকিস্তান যখনই কোনো ভুল করবে, তার খেসারত দিতে হবে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব হবে এবং তারা একটি নিপীড়িত সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।”

১১. অমুসলিমদের (হিন্দু ও শিখ) পাকিস্তান ত্যাগ

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Kya Maghribi Pakistan mein Hindu aur Sikh Musalmanon ke sath aman se nahi reh sakenge?”

বাংলা অনুবাদ: “পশ্চিম পাকিস্তানে কি হিন্দু ও শিখরা মুসলমানদের সাথে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Nafrat ki buniyaad par banne wale mulk mein aqalliyaton (minorities) ke liye jagah sikurti chali jayegi. Khusoosan Maghribi Pakistan mein Hinduan aur Sikhan ka rehna na-mumkin bana diya jayega. Unhein ya toh hansi-khushi mulk chhodna padega ya unhein dabaav dal kar nikal diya jayega. Is se mulk ka mizaaj mazeed ugra aur inteshar-pasand ho jayega, kyun ke jab koi doosra dushman andar nahi bachega, toh woh aapas mein hi dushman dhoondenge.”

বাংলা অনুবাদ: “ঘৃণার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া দেশে সংখ্যালঘুদের জন্য জায়গা সংকুচিত হতে থাকবে। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানে হিন্দু ও শিখদের বসবাস অসম্ভব করে তোলা হবে। তাদের হয় স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে হবে, না হয় চাপ প্রয়োগ করে বের করে দেওয়া হবে। এর ফলে দেশটির মানসিকতা আরও উগ্র ও উগ্রপন্থী হয়ে উঠবে, কারণ যখন ভেতরে কোনো সাধারণ শত্রু (অন্য ধর্মের মানুষ) অবশিষ্ট থাকবে না, তখন তারা নিজেদের মধ্যেই শত্রু খুঁজতে শুরু করবে।”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

১২. উলামা ও ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহার

শূরিশ কাশ্মীরি প্রশ্ন করেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Ulema-e-Deen ka Pakistan ki siyasat mein kya kirdar hoga?”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তানের রাজনীতিতে দ্বীনি উলামাদের ভূমিকা কেমন হবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ জবাব দিয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Pakistan mein Islam sirf ek naara (slogan) hoga, koi haqeeqi nizam nahi. Siyasat-daan ulema ko apne maqasid ke liye istemal karenge, aur ulema iqtedar ke lalach mein shamil honge. Woh shariat ke naam par awam ko bewaqoof banayenge aur fatwa-bazi ke zariye aapas mein larenge. Islam ki asli rooh—jo aman, insaf aur rawadari hai—woh gum ho jayegi, aur us ki jagah mulla-iyat (clericalism) aur dhandli le legi.”

বাংলা অনুবাদ: “পাকিস্তানে ইসলাম কেবল একটি স্লোগান হবে, কোনো বাস্তব শাসনব্যবস্থা নয়। রাজনীতিবিদরা উলামাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবেন, আর উলামারাও ক্ষমতার লোভে তাদের সাথে হাত মেলাবেন। তারা শরীয়তের নামে জনগণকে বোকা বানাবেন এবং ফতোয়াবাজির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে লড়াই করবেন। ইসলামের আসল আত্মা—যা শান্তি, ন্যায়বিচার ও পরমতসহিষ্ণুতা—তা হারিয়ে যাবে, আর তার জায়গা নেবে মোল্লাতন্ত্র ও ভণ্ডামি।”

১৩. ইতিহাসের বিচার ও চূড়ান্ত পরিণতি

শূরিশ কাশ্মীরি সাক্ষাৎকারটির শেষে জানতে চেয়েছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Kya tareekh aap ke is faisle ko sahi sabit karegi?”

বাংলা অনুবাদ: “ইতিহাস কি আপনার এই সিদ্ধান্ত বা দূরদর্শিতাকে সঠিক প্রমাণ করবে?”

মওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন:

উর্দু (রোমান হরফে): “Tareekh kisi ki riayat nahi karti. Jab partition ke jazbaat thanday honge, toh aane wali naslein dekhengi ke hum ne kya khoya aur kya paya. Mujhe koi shak nahi ke jo haqaaeq maine aaj bayan kiye hain, woh aane wale waqt mein ek-ek karke sach sabit honge. Afsos is baat ka hai ke tab tak bohot der ho chuki hogi aur Musalman ek aisi daldal mein phans chuke honge jahan se nikalna namumkin hoga.”

বাংলা অনুবাদ: “ইতিহাস কাউকে রেহাই দেয় না। যখন দেশভাগের আবেগ ঠান্ডা হবে, তখন আগামী প্রজন্ম দেখবে আমরা কী হারিয়েছি আর কী পেয়েছি। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে আজ আমি যেসব সত্য বয়ান করলাম, তা আগামী দিনে একে একে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হবে। আফসোস কেবল এই যে, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে এবং মুসলমানরা এমন এক দলদলে ফেঁসে যাবে যেখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব হবে।”

১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি কেবল একটি রাজনৈতিক কথোপকথন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সমাজতাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়, পাকিস্তানে বারবার সামরিক শাসন, বর্তমান চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান মওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রতিটি শব্দকে ইতিহাসের পাতায় সত্য বলে প্রমাণিত করেছে। শূরিশ কাশ্মীরির উর্দু গ্রন্থ ‘আবুল কালাম আজাদ’-এ এই ঐতিহাসিক দলিলটি সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ
মওলানা আবুল কালাম আজাদ

মওলানা আজাদের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার: নিউএজইসলামের ইংরেজি সংস্করণ থেকে অনুবাদ

এই কাজটি শুরু করার পরে দেখলাম নিউএজইসলাম নামে একটি ওয়েবসাইট সাক্ষাৎকারটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেছে। সেখান থেকে একটা বাংলা করে দিলাম।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ: পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই যিনি এর ভবিষ্যৎ জানতেন

সাক্ষাৎকার গ্রহণে: শূরিশ কাশ্মীরি

প্রকাশনায়: মাতবুয়াত চাতান, লাহোর

সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন (শূরিশ কাশ্মীরি): হিন্দু-মুসলিম বিরোধ এখন এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে। আপনার কি মনে হয় না যে, এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্ম অনিবার্য হয়ে উঠেছে?

উত্তর (মওলানা আজাদ): পাকিস্তান যদি হিন্দু-মুসলিম সমস্যার প্রকৃত সমাধান হতো, তবে আমি নিজেই একে সমর্থন করতাম। হিন্দু জনমতের একটি অংশ এখন এর পক্ষে চলে যাচ্ছে। তারা ভাবছে যে, একদিকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (NWFP), সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও অর্ধেক পাঞ্জাব এবং অন্যদিকে অর্ধেক বাংলা ছেড়ে দিয়ে তারা বাকি ভারত পেয়ে যাবে—একটি বিশাল দেশ, যা সব ধরনের সাম্প্রদায়িক দাবি থেকে মুক্ত থাকবে। আমরা যদি মুসলিম লীগের পরিভাষা ব্যবহার করি, তবে এই নতুন ভারত বাস্তবিকভাবে এবং স্বভাবগতভাবেই একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হয়ে উঠবে।

এটি কোনো সচেতন সিদ্ধান্তের ফলে ঘটবে না, বরং এটি হবে সেখানকার সামাজিক বাস্তবতার এক যৌক্তিক পরিণতি। আপনি কীভাবে এমন একটি সমাজের কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করতে পারেন যার ৯০% মানুষই হিন্দু এবং যারা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে তাদের নিজস্ব নীতি ও মূল্যবোধ নিয়ে বসবাস করে আসছে? যে উপাদানগুলো ভারতীয় সমাজে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং একটি শক্তিশালী অনুসারী দল তৈরি করেছিল, সেগুলো আজ দেশভাগের রাজনীতির শিকার। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে ঘৃণার জন্ম দিয়েছে, তা ইসলাম প্রচার ও প্রসারের সমস্ত সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে নিভিয়ে দিয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধর্মের পরিমাপাতীত ক্ষতি করেছে। মুসলমানরা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা যদি কুরআন এবং পবিত্র রাসুল (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিত এবং ধর্মের নামে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তৈরি না করত, তবে ইসলামের অগ্রগতি থমকে যেত না। মোগল শাসনের পতনের সময় ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ২২.৫ মিলিয়নের (২ কোটি ২৫ লক্ষ) কিছু বেশি, যা বর্তমান সংখ্যার প্রায় ৬৫%।

তারপর থেকে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছিল। মুসলিম রাজনীতিবিদরা যদি এমন আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার না করতেন যা সাম্প্রদায়িক সম্পর্ককে তিক্ত করে তুলেছে এবং অন্য অংশটি যদি ব্রিটিশ স্বার্থের এজেন্ট হিসেবে হিন্দু-মুসলিম ফাটল আরও চওড়া করার জন্য কাজ না করত, তবে ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পেত। আমরা ধর্মের নামে যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি করেছি, তা ইসলামকে একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছে—কিন্তু ইসলাম আসলে তা নয়; ইসলাম হলো মানুষের আত্মার পরিবর্তনের একটি মূল্যবোধের ব্যবস্থা। ব্রিটিশদের প্রভাবে আমরা ইসলামকে একটি সীমাবদ্ধ ব্যবস্থায় পরিণত করেছি এবং ইহুদি, পার্সি ও হিন্দুদের মতো অন্যান্য সম্প্রদায়ের পথ অনুসরণ করে আমরা নিজেদের একটি বংশানুক্রমিক সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করেছি।

ভারতীয় মুসলমানরা ইসলাম এবং এর বার্তাকে স্থবির করে ফেলেছে এবং নিজেদের অনেকগুলো উপদলে (Sects) বিভক্ত করেছে। কিছু উপদলের জন্ম তো স্পষ্টতই ঔপনিবেশিক শক্তির ইশারায় হয়েছিল। ফলস্বরূপ, এই দলগুলো সমস্ত গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। মুসলিম অস্তিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ‘জিহাদ’ বা প্রচেষ্টা (Striving), আর এখন এই শব্দটাই তাদের কাছে অচেনা। নিশ্চিতভাবেই তারা মুসলমান, কিন্তু তারা তাদের নিজস্ব খেয়ালখুশি এবং আকাঙ্ক্ষা অনুসরণ করে। আসলে এখন তারা খুব সহজেই রাজনৈতিক ক্ষমতার সামনে মাথা নত করে, ইসলামী মূল্যবোধের সামনে নয়। তারা কুরআনের ধর্মের চেয়ে রাজনীতির ধর্মকে বেশি পছন্দ করে। পাকিস্তান একটি রাজনৈতিক অবস্থান মাত্র।

ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যার সঠিক সমাধান এটি কি না—সেই সত্যকে একপাশে সরিয়ে রাখলেও, এটি দাবি করা হচ্ছে ইসলামের নামে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ভিত্তিতে জনসংখ্যা নির্ধারণের জন্য ইসলাম কখন এবং কোথায় ভূখণ্ড ভাগের বিধান দিয়েছে? কুরআন বা পবিত্র রাসুলের (সা.) সুন্নাহতে কি এর কোনো অনুমোদন আছে? ইসলামের পণ্ডিতদের মধ্যে কে আল্লাহর এই জমিনকে এভাবে ভাগ করেছেন? আমরা যদি নীতিগতভাবে এই বিভাজন মেনে নিই, তবে সর্বজনীন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের সাথে এর সামঞ্জস্য করব কীভাবে?

ভারতসহ অমুসলিম দেশগুলোতে মুসলমানদের ক্রমাগত বাড়তে থাকা উপস্থিতির ব্যাখ্যা আমরা কীভাবে দেব? তারা কি বুঝতে পারছে যে, ইসলাম যদি এই নীতি অনুমোদন করত, তবে এটি তার অনুসারীদের অমুসলিম দেশে যাওয়ার অনুমতি দিত না এবং পাকিস্তানের সমর্থকদের অনেক পূর্বপুরুষ হয়তো ইসলামের আলোতেই প্রবেশ করতে পারতেন না?

ধর্মের ভিত্তিতে ভূখণ্ড ভাগ করা মুসলিম লীগের উদ্ভাবিত একটি কৌশল মাত্র। তারা এটিকে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে অনুসরণ করতে পারে, কিন্তু ইসলাম বা কুরআনে এর কোনো অনুমোদন নেই। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য কী? ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়া, নাকি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য ধর্মীয় লাইনে ভূখণ্ড ভাগ করা? পাকিস্তানের দাবি মুসলমানদের কোনোভাবেই উপকৃত করেনি। পাকিস্তান কীভাবে ইসলামের উপকার করতে পারে তা একটি বড় প্রশ্ন এবং এটি মূলত নির্ভর করবে তারা কেমন নেতৃত্ব পাচ্ছে তার ওপর।

পাশ্চাত্য চিন্তা ও দর্শনের প্রভাব এই সংকটকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। মুসলিম লীগের নেতৃত্ব যেভাবে নিজেদের পরিচালনা করছে, তা নিশ্চিত করবে যে ইসলাম পাকিস্তানে একটি বিরল বস্তু হয়ে উঠবে এবং ভারতের মুসলমানদের জন্যও এটি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এটি একটি অনুমান এবং ভবিষ্যৎ গর্ভে কী আছে তা কেবল আল্লাহই জানেন। পাকিস্তান যখন অস্তিত্বে আসবে, তখন তাকে ধর্মীয় প্রকৃতির নানামুখী সংঘাতের মুখোমুখি হতে হবে।

আমি যতদূর দেখতে পাচ্ছি, যারা ক্ষমতার লাগাম ধরবে তারা ইসলামের মারাত্মক ক্ষতি করবে। তাদের আচরণ পাকিস্তানি যুবসমাজকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে এবং তারা অধর্মীয় আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। আজ মুসলিম সংখ্যালঘু রাজ্যগুলোতে মুসলিম যুবকেরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলোর চেয়ে ধর্মের প্রতি বেশি অনুরক্ত। আপনারা দেখতে পাবেন যে, উলামাদের বর্ধিত ভূমিকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে ধর্ম তার দীপ্তি হারাবে।

প্রশ্ন (শূরিশ কাশ্মীরি): কিন্তু অনেক উলামা তো কায়েদে আজম [মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ]-এর সাথে আছেন।

উত্তর (মওলানা আজাদ): অনেক উলামা তো আকবর-ই-আজমের (মোগল সম্রাট আকবর) সাথেও ছিলেন; তারা তাঁর জন্য একটি নতুন ধর্মই [দ্বীন-ই-ইলাহী] আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। ব্যক্তিবিশেষ নিয়ে আলোচনা করবেন না। আমাদের ইতিহাস এমন উলামাদের কর্মকাণ্ডে পরিপূর্ণ, যারা প্রতিটি যুগে ও সময়ে ইসলামের জন্য অপমান ও কলঙ্ক বয়ে এনেছেন।

সত্যের পথ অবলম্বনকারীরা সবসময়ই ব্যতিক্রম। গত ১,৩০০ বছরের মুসলিম ইতিহাসে কতজন উলামার নাম সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়? সেখানে একজন ইমাম হানবল ছিলেন, একজন ইবনে তাইমিয়্যাহ ছিলেন। হিন্দুস্তানে শাহ ওয়ালিউল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ছাড়া আমরা অন্য কোনো উলামাকে স্মরণ করি না। শেখ আহমদ সিরহিন্দির (মুজাদ্দিদে আলফে সানি) সাহসিকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু রাজদরবারে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগে কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছিলেন এবং যাঁর কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল, তাঁরাও তো উলামা ছিলেন। তাঁরা এখন কোথায়? কেউ কি আজ তাঁদের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়?

প্রশ্ন: মওলানা, পাকিস্তান যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে ক্ষতি কী? দিনশেষে, সম্প্রদায়ের ঐক্য বজায় রাখতে এবং তা রক্ষা করতেই তো “ইসলাম” শব্দটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

উত্তর: আপনারা এমন একটি উদ্দেশ্যের জন্য ইসলামের নাম ব্যবহার করছেন যা ইসলামী মানদণ্ডে মোটেও সঠিক নয়। মুসলিম ইতিহাস এই ধরনের বহু জঘন্য অপরাধের সাক্ষ্য বহন করে। জমলের যুদ্ধে [ইমাম আলী এবং মহানবী (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ] বর্শার ফলায় কুরআন প্রদর্শন করা হয়েছিল। সেটা কি সঠিক ছিল? কারবালায় মহানবী (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের শহীদ করেছিল সেইসব মুসলমানরাই, যারা নবীর সাহচর্যের দাবি করত। সেটা কি সঠিক ছিল? হাজ্জাজ বিন ইউসুফ একজন মুসলিম জেনারেল ছিলেন এবং তিনি মক্কার পবিত্র কাবা শরীফে নৃশংস আক্রমণ চালিয়েছিলেন। সেটা কি সঠিক ছিল? কোনো পবিত্র শব্দই একটি মিথ্যা উদ্দেশ্যকে ন্যায়সঙ্গত বা পবিত্র করতে পারে না।

পাকিস্তান যদি মুসলমানদের জন্য সঠিক হতো, তবে আমি একে সমর্থন করতাম। কিন্তু আমি এই দাবির অন্তর্নিহিত বিপদগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আমি আশা করি না যে মানুষ আমার পথ অনুসরণ করবে, তবে আমার পক্ষে আমার বিবেকের ডাকের বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ সাধারণত হয় বলপ্রয়োগের কাছে নতিস্বীকার করে, না হয় নিজেদের অভিজ্ঞতার শিক্ষা থেকে শেখে। মুসলমানরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো কথাই শুনবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা এর অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। আজ তারা সাদাকে কালো বলতে পারে, কিন্তু তারা পাকিস্তান ত্যাগ করবে না। এটি এখন কেবল তখনই থামানো সম্ভব, যদি সরকার এই দাবি মেনে না নেয় অথবা মিস্টার জিন্নাহ নিজে কোনো নতুন প্রস্তাবে সম্মত হন।

এখন ওয়ার্কিং কমিটিতে আমার সহকর্মীদের মনোভাব থেকে আমি যা বুঝতে পারছি, তাতে ভারতের বিভক্তি নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। তবে আমি অবশ্যই সতর্ক করে দিচ্ছি যে, দেশভাগের এই কুফল কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পাকিস্তানও সমভাবে এর দ্বারা ভুক্তভোগী হবে। এই দেশভাগ হবে জনসংখ্যার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, কোনো পাহাড়, মরুভূমি বা নদীর মতো প্রাকৃতিক সীমানার ভিত্তিতে নয়। একটি রেখা টেনে দেওয়া হবে; তবে সেটি কতটা স্থায়ী হবে তা বলা মুশকিল।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো সত্তা কেবল ততদিনই টিকে থাকে, যতদিন সেই ঘৃণা বজায় থাকে। এই ঘৃণা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ককে গ্রাস করবে। এমন পরিস্থিতিতে, কোনো বিপর্যয়কর ঘটনা না ঘটলে ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে বন্ধু হওয়া এবং সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করা সম্ভব হবে না। দেশভাগের এই রাজনীতি নিজেই দুই দেশের মধ্যে একটি দেওয়াল হিসেবে কাজ করবে। পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের সমস্ত মুসলমানকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে না, এটি তার ভৌগোলিক সক্ষমতার বাইরের একটি কাজ। অন্যদিকে, অমুসলিমদের পক্ষে বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা সম্ভব হবে না। তাদের বের করে দেওয়া হবে অথবা তারা নিজেরাই চলে যাবে। এর প্রতিক্রিয়া ভারতেও দেখা যাবে এবং ভারতীয় মুসলমানদের সামনে তখন তিনটি পথ খোলা থাকবে:

১. তারা লুটপাট ও নৃশংসতার শিকার হবে এবং পাকিস্তানে হিজরত করবে; কিন্তু কতজন মুসলমান সেখানে আশ্রয় পাবে?

২. তারা হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হবে। মুসলমানদের একটি বড় অংশকে এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না দেশভাগের তিক্ত স্মৃতিগুলো মানুষ ভুলে যায় এবং যে প্রজন্ম এই সময়টি পার করেছে তাদের স্বাভাবিক জীবনাবসান ঘটে।

৩. দারিদ্র্য, রাজনৈতিক শূন্যতা এবং আঞ্চলিক নিপীড়নে জর্জরিত হয়ে একটি বড় সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

মুসলিম লীগের সমর্থক প্রভাবশালী মুসলমানরা পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ভারত ত্যাগ করবেন। ধনী মুসলমানরা সেখানকার শিল্প ও ব্যবসা দখল করে নেবেন এবং পাকিস্তানের অর্থনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করবেন। কিন্তু ৩ কোটিরও (৩০ মিলিয়ন) বেশি মুসলমান ভারতেই রয়ে যাবেন। পাকিস্তান তাদের জন্য কী প্রতিশ্রুতি ধারণ করে? পাকিস্তান থেকে হিন্দু ও শিখদের বিতাড়নের পর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা এই অবশিষ্ট মুসলমানদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হবে। পাকিস্তান নিজেই অনেক গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হবে। সবচেয়ে বড় বিপদ আসবে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের কাছ থেকে, যারা এই নতুন দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে এবং সময়ের সাথে সাথে এই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হবে। ভারতের এই বাইরের হস্তক্ষেপ নিয়ে কোনো সমস্যা থাকবে না, কারণ ভারত সবসময়ই পাকিস্তানের কাছ থেকে বিপদ ও শত্রুতার আভাস পাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মিস্টার জিন্নাহর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, তা হলো বাংলা। তিনি জানেন না যে বাংলা বাইরের নেতৃত্বকে অবজ্ঞা করে এবং আজ হোক বা কাল তা প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক জিন্নাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং তাঁকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। মিস্টার এইচ এস সোহরাওয়ার্দীও জিন্নাহকে খুব একটা উচ্চ চোখে দেখেন না। শুধু মুসলিম লীগ কেন, কংগ্রেসের ইতিহাসের দিকে তাকান। সুভাষ চন্দ্র বসুর বিদ্রোহের কথা সবার জানা। গান্ধীজি বসুর সভাপতিত্বে খুশি ছিলেন না এবং রাজকোটে আমরণ অনশন করে পাশা উল্টে দিয়েছিলেন। সুভাষ বসু গান্ধীজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নিজেকে কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। বাংলার পরিবেশটাই এমন যে তা বাইরের নেতৃত্বকে মেনে নেয় না এবং যখনই নিজের অধিকার ও স্বার্থে আঘাত লাগে, তখনই বিদ্রোহ করে বসে।

পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) মানুষের আস্থা ততদিন পর্যন্ত ক্ষুণ্ণ হবে না, যতদিন জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খান বেঁচে থাকবেন। কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়ার পর, যেকোনো ছোটখাটো ঘটনাই সেখানে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেবে। আমার মনে হয়, পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে কোনোভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে থাকা সম্ভব হবে না। এই দুটি অঞ্চলের মধ্যে তারা নিজেদের ‘মুসলমান’ বলে দাবি করা ছাড়া আর কোনো সাধারণ মিল নেই। কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার বিষয়টি পৃথিবীর কোথাও কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করতে পারেনি।

আমাদের সামনে আরব বিশ্বই এর বড় উদাহরণ; তারা একই ধর্ম, একই সভ্যতা, একই সংস্কৃতি ধারণ করে এবং তাদের ভাষাও এক (আরবি)। এমনকি তারা ভৌগোলিক ঐক্যও স্বীকার করে। তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য নেই। তাদের শাসনব্যবস্থা ভিন্ন এবং তারা প্রায়শই পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও শত্রুতায় লিপ্ত থাকে। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে মুহূর্তে পাকিস্তান সৃষ্টির সেই প্রাথমিক আবেগ ও উষ্ণতা ঠান্ডা হয়ে যাবে, অমনি তাদের মধ্যকার এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করবে এবং তা অত্যন্ত জোরালো রূপ নেবে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের লড়াইয়ের মাধ্যমে আরও উসকে উঠবে এবং ফলস্বরূপ দুই উইং বা অংশই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর—তা যখনই ঘটুক না কেন—পশ্চিম পাকিস্তান নিজেই আঞ্চলিক বৈপরীত্য এবং বিরোধের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ (খাইবার পাখতুনখোয়া) এবং বেলুচিস্তানের এই উপ-জাতীয় (Sub-national) পরিচয়ের উত্থান বহিরাগতদের হস্তক্ষেপের পথ উন্মুক্ত করে দেবে। খুব বেশি দিন লাগবে না যখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বৈচিত্র্যময় ও দুর্বল উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে বলকান বা আরব রাষ্ট্রগুলোর মতো এই দেশটিকেও টুকরো টুকরো করে দেবে। হয়তো সেই পর্যায়ে গিয়ে আমরা নিজেদের প্রশ্ন করব—আমরা আসলে কী লাভ করলাম আর কী হারালাম?

আসল সমস্যাটি হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অগ্রগতি, এটি নিশ্চিতভাবেই কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়। মুসলিম ব্যবসায়ী নেতারা নিজেদের যোগ্যতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে সন্দিহান। তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিশেষ অনুগ্রহের সুবিধায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তারা নতুন স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়। তারা মূলত নিজেদের এই ভয়কে আড়াল করতেই ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর ওকালতি করছে এবং এমন একটি মুসলিম রাষ্ট্র চায় যেখানে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই তারা একচেটিয়াভাবে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তারা কতদিন এই প্রতারণা টিকিয়ে রাখতে পারে, তা দেখা সত্যিই আকর্ষণীয় হবে।

আমার মনে হয়, একদম শুরু থেকেই পাকিস্তান কিছু অত্যন্ত গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হবে:

১. অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক একনায়কত্বের পথ সুগম করবে, যেমনটি অনেক মুসলিম দেশে ঘটেছে।

২. বৈদেশিক ঋণের এক বিশাল ও ভারী বোঝা মাথায় চাপবে।

৩. প্রতিবেশীদের সাথে কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে না এবং সশস্ত্র সংঘাতের স্থায়ী আশঙ্কা তৈরি হবে।

৪. অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং আঞ্চলিক কোন্দল দেখা দেবে।

৫. পাকিস্তানের নব্য ধনী ও শিল্পপতিদের দ্বারা জাতীয় সম্পদ দেদারসে লুটপাট হবে।

৬. এই নব্য ধনীদের শোষণের ফলশ্রুতিতে দেশে ভয়াবহ শ্রেণিসংগ্রামের আশঙ্কা তৈরি হবে।

৭. ধর্ম থেকে যুবসমাজের অসন্তোষ ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হবে এবং শেষ পর্যন্ত ‘পাকিস্তান তত্ত্ব’ বা দ্বিজাতি তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

৮. পাকিস্তানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো ক্রমাগত চক্রান্ত চালিয়ে যাবে।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো তাকে কোনো কার্যকর সাহায্য করার মতো অবস্থানে থাকবে না। আর অন্যান্য উৎস থেকে যে সাহায্য বা অনুদান আসবে, তা শর্তহীন হবে না—যা তাদের আদর্শিক এবং ভৌগোলিক—উভয় দিক থেকেই আপস করতে বাধ্য করবে।

প্রশ্ন (শূরিশ কাশ্মীরি): কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, মুসলমানরা কীভাবে তাদের সম্প্রদায়ের পরিচয় (Community Identity) অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং কীভাবে তারা একটি মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকসুলভ গুণাবলী নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলবে?

উত্তর (মওলানা Azad): ফাঁপা কথাবার্তা দিয়ে মৌলিক বাস্তবতাকে মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না, আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্নও উত্তরের গভীরতাকে খর্ব করতে পারে না। এটি আসলে মূল আলোচনাকে ভিন্ন খাতে ডাইভার্ট করার শামিল। ‘সম্প্রদায়ের পরিচয়’ বলতে আপনারা কী বোঝাচ্ছেন? এই সম্প্রদায়ের পরিচয় যদি ব্রিটিশদের দাসত্বের সময়েও অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে, তবে একটি মুক্ত ও স্বাধীন ভারতে তা কীভাবে হুমকির মুখে পড়বে—যেখানে মুসলমানরা সব বিষয়ে সমান অংশীদার হবে? আর মুসলিম রাষ্ট্রের কোন গুণাবলী আপনারা নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে চান?

আসল বিষয়টি হলো বিশ্বাস এবং ইবাদত বা উপাসনার স্বাধীনতা; আর কে এই স্বাধীনতায় বাধা দিতে পারে? স্বাধীনতা কি ৯ কোটি মুসলমানকে এমন এক অসহায় অবস্থায় নামিয়ে আনবে যে তারা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে বাধাগ্রস্ত বোধ করবে? যে ব্রিটিশরা বিশ্বশক্তি হিসেবে এই ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারেনি, হিন্দুদের এমন কী জাদু বা শক্তি আছে যার মাধ্যমে তারা এই ধর্মীয় অধিকার অস্বীকার করবে?

এই প্রশ্নগুলো তারা তুলছেন, যারা নিজেরা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়েছেন এবং এখন সস্তা রাজনৈতিক কূটচালের মাধ্যমে ধুলো ওড়াচ্ছেন। ভারতীয় ইতিহাসে মুসলিম ইতিহাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনারা কি মনে করেন মুসলিম রাজারা ইসলামের সেবা করছিলেন? ইসলামের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল নামমাত্র; তারা কোনো ইসলামী প্রচারক ছিলেন না। ভারতের মুসলমানরা আসলে সুফি-সাধকদের কাছে ঋণী, আর এই সুফিদের অনেকের সাথেই তৎকালীন রাজারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলেন।

অধিকাংশ রাজাই উলামাদের এমন একটি বড় দল তৈরি করেছিলেন যারা ইসলামের আসল নীতি ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইসলাম তার আদি ও খাঁটি রূপে এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, প্রথম শতাব্দীতেই তা হেজাজ (মক্কা-মদিনা) ও এর আশেপাশের বিপুল সংখ্যক মানুষের মন জয় করেছিল। কিন্তু ভারতে যে ইসলাম এসেছিল তা ছিল ভিন্ন, কারণ এর বাহকরা ছিল অ-আরব এবং ইসলামের সেই প্রকৃত আধ্যাত্মিক চেতনা এতে অনুপস্থিত ছিল। তা সত্ত্বেও, ভারতের সংস্কৃতি, সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্য এবং ভাষার ওপর মুসলিম যুগের গভীর ছাপ স্পষ্ট। ভারতের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো, যেমন—দিল্লি এবং লখনৌ, আসলে কিসের প্রতিনিধিত্ব করে? এগুলোর অন্তর্নিহিত মুসলিম চেতনা খুবই স্পষ্ট।

মুসলমানরা যদি এখনও নিজেদের বিপন্ন মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে স্বাধীন ভারতে তারা দাসত্বে পরিণত হবে, তবে আমি কেবল তাদের ঈমান ও অন্তরের সুস্থতার জন্য দোয়া করতে পারি। কোনো মানুষ যদি জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে তবে তাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব, কিন্তু কেউ যদি ভীরু ও সাহসীন হয়, তবে তাকে বীর ও সাহসী করে তোলা সম্ভব নয়। একটি সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানরা আজ কাপুরুষ হয়ে গেছে। তাদের মনে আল্লাহর ভয় নেই, বরং তারা মানুষকে ভয় পায়। এটাই ব্যাখ্যা করে যে কেন তারা নিজেদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে এত বেশি আচ্ছন্ন—যা আসলে তাদের অলীক কল্পনামাত্র।

ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখলের পর মুসলমানদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু মুসলমানরা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। উল্টো, তারা গড়ের চেয়েও বেশি হারে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের নিজস্ব এক আকর্ষণ আছে। তাছাড়া, ভারতের তিন দিকেই বিশাল মুসলিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র রয়েছে। তবে কোন যুক্তিতে এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে আগ্রহী হবে? এটি কীভাবে তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করবে? ৯ কোটি মানুষকে শেষ করে দেওয়া কি এতই সহজ? প্রকৃতপক্ষে, মুসলিম সংস্কৃতির এমন এক আকর্ষণ রয়েছে যে স্বাধীন ভারতে যদি ইসলামের অনুসারী সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে আমি মোটেও অবাক হব না।

পৃথিবীর আজ দুটি জিনিসই প্রয়োজন—একটি স্থায়ী শান্তি এবং জীবন দর্শন। হিন্দুরা যদি মার্ক্সের পেছনে ছুটতে পারে এবং পাশ্চাত্যের দর্শন ও প্রজ্ঞার ওপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা করতে পারে, তবে তারা ইসলামকে অবজ্ঞা করবে না এবং এর নীতিগুলো থেকে উপকৃত হতে পেরে আনন্দিতই হবে। আসলে তারা ইসলামের সাথে অনেক বেশি পরিচিত এবং তারা স্বীকার করে যে ইসলাম কোনো বংশানুক্রমিক সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতা বা কোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা নয়।

ইসলাম হলো মানুষের সমতার ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। তারা জানে যে ইসলাম হলো এমন একজন রাসূলের (সা.) ঘোষণা, যিনি আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকেন, নিজের পূজার দিকে নয়। ইসলাম মানে সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং তিনটি মৌলিক নীতি—আল্লাহ-সচেতনতা (তাকওয়া), সৎকর্ম এবং জ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজকে পুনর্গঠন করা।

প্রকৃতপক্ষে, আমরা মুসলমানরা এবং আমাদের চরমপন্থী আচরণই অমুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতি একটি বীতশ্রদ্ধ ভাব বা অনীহা তৈরি করেছে। আমরা যদি আমাদের স্বার্থপর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ইসলামের পবিত্রতায় দাগ লাগাতে না দিতাম, তবে বহু সত্যসন্ধানী মানুষ ইসলামের শীতল ছায়াতলে শান্তি খুঁজে পেতেন। পাকিস্তানের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই; এটি একটি রাজনৈতিক দাবি যা মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে প্রজেক্ট করছে। আমি মনে করি মুসলমানদের বর্তমান সমস্যার সমাধান এটি নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি আরও বেশি সমস্যার জন্ম দিতে বাধ্য।

পবিত্র রাসূল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ পুরো জমিনকে আমার জন্য মসজিদ বানিয়ে দিয়েছেন।” এখন আপনারা আমাকে একটি মসজিদকে খণ্ডিত বা ভাগ করার ধারণাকে সমর্থন করতে বলবেন না। এই নয় কোটি মুসলমান যদি পুরো ভারতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত এবং দাবি করা হতো যে রাজ্যগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হোক যাতে এক বা দুটি অঞ্চলে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়, তবে তা বোঝা যেত। তখনও এই ধরনের দাবি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হতো না, তবে প্রশাসনিক কারণে তা ন্যায়সঙ্গত বলা যেত।

কিন্তু বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের সমস্ত সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সেগুলোর সাথে মুসলিম দেশগুলোর সীমানা রয়েছে।

আমাকে বলুন, কে এই জনসংখ্যাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে? পাকিস্তানের দাবি করে আমরা গত ১,০০০ বছরের ইতিহাসের দিকে চোখ বন্ধ করে রাখছি এবং লীগের পরিভাষা যদি ব্যবহার করি, তবে ৩ কোটিরও বেশি মুসলমানকে “হিন্দু রাজ”-এর কোলে ছুঁড়ে দিচ্ছি। যে হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটি কংগ্রেস এবং লীগের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে, তা পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী বিরোধের উৎসে পরিণত হবে এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের ইন্ধনে এটি ভবিষ্যতে যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

প্রায়ই এই প্রশ্ন তোলা হয় যে, পাকিস্তানের ধারণা যদি মুসলমানদের জন্য এতই বিপজ্জনক হয়, তবে হিন্দুরা কেন এর বিরোধিতা করছে? আমি মনে করি এই বিরোধিতার পেছনে দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছেন তারা, যারা সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত নিয়ে আন্তরিকভাবে উদ্বিগ্ন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে একটি মুক্ত, অবিভক্ত ভারত নিজেকে রক্ষা করতে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

অন্যদিকে, এমন একটি অংশও রয়েছে যারা এই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের বিরোধিতা করছে যাতে মুসলমানরা তাদের দাবিতে আরও বেশি অনড় হয় এবং এভাবে তাদের কাছ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া যায়। মুসলমানদের সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, কিন্তু ভারতের বিভক্তি কখনোই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। এই দাবিটি একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যার সম্পূর্ণ ভুল রাজনৈতিক সমাধান।

ভবিষ্যতে ভারতকে সাম্প্রদায়িক বিরোধের নয়, বরং শ্রেণীগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে; লড়াইটি হবে পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে (ধনী ও শ্রমিকের মধ্যে)। কমিউনিস্ট এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো বিকশিত হচ্ছে এবং সেগুলোকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এই আন্দোলনগুলো সুবিধাবঞ্চিত নিম্নশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য ক্রমান্বয়ে লড়াই করবে।

মুসলিম পুঁজিপতি এবং জায়গিরদার শ্রেণী এই আসন্ন হুমকি নিয়ে শঙ্কিত। এখন তারা এই পুরো বিষয়টিকে একটি সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়েছে এবং অর্থনৈতিক সমস্যাটিকে ধর্মীয় বিরোধে রূপান্তর করেছে। তবে এর জন্য কেবল মুসলমানরা দায়ী নয়। এই কৌশলটি প্রথমে ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করেছিল এবং পরবর্তীতে আলিগড়ের রাজনৈতিক মস্তিষ্কগুলো একে সমর্থন করে। পরবর্তীতে, হিন্দুদের দূরদর্শিতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে এবং এখন স্বাধীনতা ভারতের বিভক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

জিন্নাহ নিজে একসময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত ছিলেন। কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে সরোজিনী নাইডু তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি দাদাভাই নওরোজি-র শিষ্য ছিলেন। ১৯০৬ সালে মুসলমানদের যে প্রতিনিধি দলটি ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করেছিল, তিনি তাতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৯১৯ সালে তিনি একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জয়েন্ট সিলেক্ট কমিটির সামনে মুসলমানদের পৃথক দাবির বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯২৫ সালের ৩ অক্টোবর, ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র কাছে লেখা একটি চিঠিতে তিনি কংগ্রেস একটি হিন্দু সংগঠন—এমন ইঙ্গিতকে আবর্জনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯২৫ এবং ১৯২৮ সালের অল পার্টি কনফারেন্সে তিনি যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর (Joint Electorate) পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে জাতীয় পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, “আমি প্রথমে একজন জাতীয়তাবাদী এবং শেষ পর্যন্ত একজন জাতীয়তাবাদী” এবং তিনি তাঁর সহকর্মীদের—তারা হিন্দু হোক বা মুসলিম—অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা হাউসে সাম্প্রদায়িক সমস্যা না তোলেন এবং অ্যাসেম্বলিকে প্রকৃত অর্থে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সাহায্য করেন।

১৯২৮ সালে জিন্নাহ সাইমন কমিশন বয়কটের কংগ্রেসের আহ্বানকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারত বিভক্তির দাবিকে সমর্থন করেননি। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কাছে পাঠানো বার্তায় তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য কাজ করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস যখন সাতটি প্রদেশে সরকার গঠন করে মুসলিম লীগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তখন তিনি ক্ষুব্ধ ও আঘাতপ্রাপ্ত হন। ১৯৪০ সালে তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক পতন ঠেকাতে দেশভাগের দাবি নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, পাকিস্তানের দাবি মূলত তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতারই একটি প্রতিক্রিয়া। আমার সম্পর্কে মিস্টার জিন্নাহর যেকোনো মতামত রাখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, তবে তাঁর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা এবং পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেছেন। এখন এটি তাঁর জন্য একটি সম্মানের (Prestige) লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে এবং তিনি কোনো মূল্যেই এটি ত্যাগ করবেন না।

প্রশ্ন: এটি স্পষ্ট যে মুসলমানরা পাকিস্তানের দাবি থেকে পিছু হটবে না। কেন তারা সমস্ত যুক্তি এবং তর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এতটা অবিবেচক বা অন্ধ হয়ে উঠেছে?

উত্তর: একটি উন্মত্ত জনতার ভুল আবেগের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন, বরং অসম্ভব; কিন্তু নিজের বিবেককে দমন করা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। আজ মুসলমানরা হাঁটছে না, তারা স্রোতের মতো ভেসে যাচ্ছে। সমস্যা হলো মুসলমানরা স্থির হয়ে হাঁটতে শেখেনি; তারা হয় দৌড়ায় না হয় স্রোতের সাথে ভেসে যায়। যখন একদল মানুষ আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলে, তখন তারা কাল্পনিক সন্দেহ ও বিপদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয় এবং সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়।

জীবনের প্রকৃত অর্থ সংখ্যার শক্তিতে নয়, বরং দৃঢ় ঈমান এবং সৎকর্মে উপলব্ধি করা যায়। ব্রিটিশ রাজনীতি মুসলমানদের মনস্তাত্ত্বিক জগতে ভয় এবং অবিশ্বাসের অনেক বীজ বুনে দিয়েছে। এখন তারা এক ভীতিকর অবস্থায় রয়েছে—তারা ব্রিটিশদের চলে যাওয়া নিয়ে বিলাপ করছে এবং বিদেশী প্রভুরা দেশ ছাড়ার আগেই দেশভাগের দাবি তুলছে। তারা কি বিশ্বাস করে যে দেশভাগ তাদের জীবন ও শরীরের সমস্ত বিপদ এড়াতে পারবে? এই বিপদগুলো যদি বাস্তব হয়, তবে তা তাদের সীমান্তেও তাড়া করে বেড়াবে এবং যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতের ফলে জানমালের আরও অনেক বড় ক্ষতি হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমানরা তো ভিন্ন ও বিপরীতমুখী প্রবণতা সম্পন্ন দুটি আলাদা জাতি। তাহলে দুই পক্ষের মধ্যে ঐক্য কীভাবে সম্ভব?

উত্তর: এটি একটি সেকেলে বা অপ্রচলিত বিতর্ক। আমি এই বিষয়ে আল্লামা ইকবাল এবং মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির মধ্যকার চিঠিপত্র দেখেছি। কুরআনে ‘কওম’ (Qaum) শব্দটি কেবল বিশ্বাসীদের সম্প্রদায়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়নি, বরং সাধারণভাবে স্বতন্ত্র মানব গোষ্ঠী বা জাতির জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। মিল্লাত [সম্প্রদায়], কওম [জাতি] এবং উম্মত [গোষ্ঠী]-এর মতো শব্দগুলোর আভিধানিক পরিধি নিয়ে এই বিতর্ক তুলে আমরা কী অর্জন করতে চাই? ধর্মীয় দিক থেকে ভারত অনেকেরই আবাসভূমি—হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি, শিখ ইত্যাদি।

হিন্দু ধর্ম এবং ইসলামের মধ্যকার পার্থক্যের পরিধি বিশাল। কিন্তু এই পার্থক্যগুলোকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাধা হতে দেওয়া যায় না, কিংবা এই দুটি স্বতন্ত্র ও ভিন্ন বিশ্বাস ব্যবস্থা ভারতের ঐক্যের ধারণাকে নাকচ করে না। আসল বিষয়টি হলো আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা এবং আমরা কীভাবে তা অর্জন করতে পারি। স্বাধীনতা একটি আশীর্বাদ এবং এটি প্রতিটি মানুষের অধিকার। ধর্মের ভিত্তিতে একে ভাগ করা যায় না।

মুসলমানদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে তারা একটি সর্বজনীন বার্তার বাহক। তারা কোনো বর্ণবাদী বা আঞ্চলিক গোষ্ঠী নয় যার ভূখণ্ডে অন্যরা প্রবেশ করতে পারবে না। কঠোরভাবে বলতে গেলে, ভারতের মুসলমানরা কোনো একক সম্প্রদায় নয়; তারা নিজেরা অনেকগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত উপদলে বিভক্ত। আপনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ বা অনুভূতিকে উসকে দিয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন, কিন্তু ইসলামের নামে আপনি তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন না। তাদের কাছে ইসলাম মানে কেবল নিজের উপদলের (Sect) প্রতি অবিমিশ্র আনুগত্য।

ওয়াহাবি, সুন্নি এবং শিয়া ছাড়াও এখানে অসংখ্য দল রয়েছে যারা বিভিন্ন পীর ও বুজুর্গদের অনুসরণ করে। নামাজের সময় হাত তোলা (রফিউল ইয়াদাইন) এবং জোরে আমীন বলার মতো ছোটখাটো বিষয়গুলো এমন বিরোধের জন্ম দিয়েছে যার কোনো সমাধান মেলে না। উলামারা অত্যন্ত উদারভাবে ‘তাকফির’ (কাউকে কাফের ঘোষণার ফতোয়া) নামক হাতিয়ারটি ব্যবহার করেছেন। অতীতে তারা অমুসলিমদের কাছে ইসলাম নিয়ে যেতেন; আর এখন তারা মুমিনদের কাছ থেকে ইসলাম কেড়ে নিচ্ছেন। ভালো এবং পরহেজগার মুসলমানদের কীভাবে ‘কাফের’ ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে, ইসলামী ইতিহাস এমন দৃষ্টান্তে ভরপুর। কেবল নবীদেরই এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষমতা ছিল। এমনকি তাঁদেরও কঠিন পরীক্ষা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, যখন বুদ্ধি ও বিবেককে বিসর্জন দেওয়া হয় এবং মানসিকতা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন সংস্কারকের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু আজকের পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ। মুসলমানরা তাদের সাম্প্রদায়িকতায় অনড় হয়ে গেছে; তারা ধর্মের চেয়ে রাজনীতিকে বেশি পছন্দ করে এবং তাদের জাগতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধর্মের নির্দেশ হিসেবে অনুসরণ করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিটি যুগেই আমরা তাদের উপহাস করেছি যারা অবিচলভাবে কল্যাণের পথ অনুসরণ করেছে, আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলোকে নিভিয়ে দিয়েছে এবং নিঃস্বার্থ সেবার পতাকা ছিঁড়ে ফেলেছে। আমরা সাধারণ মানুষ কোন ছাড়; স্বয়ং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবীদেরও এই ঐতিহ্য ও প্রথার রক্ষকরা (তৎকালীন মোল্লা সমাজ) রেহাই দেয়নি।

প্রশ্ন: আপনি অনেক দিন আগেই আপনার ‘আল-হিলাল’ (Al-Hilal) পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এটি কি বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতায় নিমজ্জিত মুসলমানদের প্রতি আপনার হতাশার কারণে হয়েছিল, নাকি আপনার মনে হয়েছিল যে আপনি একটি অনুর্বর মরুভূমিতে আযান দিচ্ছেন?

উত্তর: আমি আল-হিলাল বন্ধ করিনি এই কারণে যে এর সত্যতার ওপর আমার বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল। এই পত্রিকাটি মুসলমানদের একটি বড় অংশের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করেছিল। তারা ইসলামে, মানুষের স্বাধীনতায় এবং সৎ লক্ষ্যের অবিচল অনুসরণে তাদের বিশ্বাসকে পুনর্নবীকরণ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, এই অভিজ্ঞতার দ্বারা আমার নিজের জীবনও অনেক সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং নিজেকে তাঁদের মতো মনে হতো যারা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সাহচর্যে শেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

আমার নিজের কণ্ঠস্বরই আমাকে মুগ্ধ করেছিল এবং এর প্রভাবেই আমি ফিনিক্স পাখির মতো পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলাম। আল-হিলাল তার উদ্দেশ্য পূরণ করেছিল এবং একটি নতুন যুগের উদয় হচ্ছিল। আমার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, আমি পরিস্থিতির একটি নতুন মূল্যায়ন করেছিলাম এবং আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমার সমস্ত সময় ও শক্তি উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার এই বিশ্বাস দৃঢ় ছিল যে এশিয়া ও আফ্রিকার স্বাধীনতা বহুলাংশে ভারতের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যই হলো ভারতের স্বাধীনতার চাবিকাঠি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ভারতের স্বাধীনতা নিশ্চিত, এবং পৃথিবীর কোনো শক্তিই তা অস্বীকার করতে পারবে না। মুসলমানদের ভূমিকা নিয়েও আমার মনে স্পষ্ট ধারণা ছিল। আমি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলাম যে মুসলমানরা তাদের দেশবাসীর সাথে একসাথে চলতে শিখুক এবং ইতিহাসকে এই কথা বলার সুযোগ না দিক যে—যখন ভারতীয়রা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল, মুসলমানরা তখন দর্শক হিসেবে তাকিয়ে ছিল। কেউ যেন বলতে না পারে যে—তরঙ্গের সাথে লড়াই করার পরিবর্তে তারা তীরে দাঁড়িয়ে ছিল এবং স্বাধীনতা স্বামীদের বহনকারী নৌকা ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আনন্দ প্রকাশ করছিল […]।

আরও দেখুন: