রাগ গুর্জরী তোড়ী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতকালীন ভূখণ্ডে পা রাখলে এমন কিছু গভীর, মরমী এবং করুণ রাগের সাক্ষাৎ মেলে, যা ভোরের আলো ফোটার মূহূর্তে মানবমনের সমস্ত ব্যাকুলতা, আধ্যাত্মিক আর্তি এবং আত্মনিবেদনকে সুরের ক্যানভাসে জীবন্ত করে তোলে। তেমনই এক পরম মহিমান্বিত, প্রাচীন এবং করুণ রসে ভরপুর রাগ হলো ‘রাগ গুর্জরী তোড়ী’ (বা সংক্ষেপে কেবল ‘গুর্জরী’)। তোড়ী পরিবারের রাজকীয় প্রধান রাগ ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’-র সাথে এর নিকটতম গভীর আত্মীয়তা থাকলেও, একটি নির্দিষ্ট স্বরের অনুপস্থিতি গুর্জরী তোড়ীকে এক অনন্য, সংহত এবং স্বতন্ত্র সাঙ্গীতিক আভিজাত্য দান করেছে।

সঙ্গীত শাস্ত্রে আঞ্চলিক রূপান্তর ও প্রথাভেদে এটি ‘গুর্জরী তোড়ী’, ‘গুর্জরী’ বা ‘গুজরী তোড়ী’ নামেও সমাদৃত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

ঐতিহাসিক বিচারে রাগ গুর্জরী তোড়ীর শিকড় জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ভারতের গুর্জর (বর্তমান গুজরাট ও সংলগ্ন অঞ্চল) অঞ্চলের লোকসুর এবং রাজকীয় দেবালয় সংস্কৃতির সাথে। পরবর্তীকালে ধ্রুপদী ব্যাকরণে আবদ্ধ হয়ে এটি তোড়ী ঠাটের অন্যতম প্রধান রাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
পণ্ডিত ও সুরশাস্ত্রীগণের মতে, তোড়ী অঙ্গের মৌলিক করুণ রস এই রাগে পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান। তবে তোড়ীর বড় ভাই ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’-তে যে পঞ্চমের (প) ওপর এসে সুর কিছুটা বিশ্রাম নেয় বা স্থায়িত্ব পায়, গুর্জরী তোড়ীতে পঞ্চম স্বরটি বর্জিত হওয়ায় সুরের ব্যাকুলতা এবং অস্থির করুণ ভাবটি আরও বেশি নিবিড় হয়ে ওঠে। এই রাগের প্রধান রস হলো করুণ, শান্ত এবং ভক্তিরস।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: তোড়ী ঠাট।
  • জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই ছয়টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: গ (কোমল গান্ধার)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম (প) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (গ), তীব্র মধ্যম (হ্ম), কোমল ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন) এবং ষড়্‌জ (স)।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যবর্তী সময়; ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করে)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত করুণ, গম্ভীর, মরমী, ব্যাকুল এবং আধ্যাত্মিক প্রভাবে ভরা।
আরোহণ: স র গ, হ্ম ধ নি র্স
অবরোহণ: র্স নি ধ, হ্ম গ, র গ র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র গ, হ্ম ধ নি ধ, হ্ম গ, র গ র স | হ্ম ধ নি র্স, নি ধ, হ্ম গ র স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

রাগ গুর্জরী তোড়ীর আসল গায়কি এবং কারিগরি শক্তি লুকিয়ে রয়েছে এর কোমল স্বরগুলোর বিশেষ আন্দোলন এবং পঞ্চমের অনুপস্থিতির ওপর।

১. পঞ্চমের (প) সম্পূর্ণ বর্জনে ব্যাকুলতা: মিঞাঁ কি তোড়ীর সাথে গুর্জরী তোড়ীর মূল পার্থক্য এটিই। তোড়ীতে পঞ্চমে গিয়ে সুর এক ধরণের আশ্রয় পায়, কিন্তু গুর্জরীতে পঞ্চম না থাকায় তীব্র মধ্যম থেকে সরাসরি কোমল ধৈবতে কিংবা কোমল ধৈবত থেকে সরাসরি তীব্র মধ্যমে নামার সময় এক ব্যাকুল শূন্যতার সৃষ্টি হয়, যা শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

২. কোমল ঋষভ ও গান্ধারের আন্দোলন: তোড়ী অঙ্গের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলো কোমল ঋষভ (র) ও কোমল গান্ধারের (গ) অতি সূক্ষ্ম আন্দোলন ও মীড়। র গ র স চলনে কোমল ঋষভের মৃদু কম্পন এবং কোমল গান্ধারের করুণ স্পর্শ ভোরের নির্জনতায় এক পরম আধ্যাত্মিক আবেশ তৈরি করে।

৩. ধৈবত ও গান্ধারের সংগতি: বাদী স্বর কোমল ধৈবত এবং সমবাদী কোমল গান্ধার হওয়ায় সুরের বিস্তার প্রধানত মধ্য ও তারা সপ্তকে এই দুটি স্বরকে কেন্দ্র করেই ঘূর্ণায়মান থাকে।

ধ্রুপদ, ধামার এবং প্রথাগত বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়ালে গুর্জরী তোড়ীর গাম্ভীর্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এছাড়া সেতার, সরোদ, রুদ্রবীণা কিংবা বাঁশিতে ভোরের স্নিগ্ধ প্রহরে এই রাগের আলাপ মেহফিলে এক অনন্য স্তব্ধতার জন্ম দেয়।

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভোরের প্রহরে রাগ গুর্জরী তোড়ীর কোমল স্বরগুলোর সুনির্দিষ্ট আন্দোলন মানুষের ভেতরের অতি-উৎসাহ বা মানসিক চঞ্চলতা কমিয়ে এক গভীর স্থিরতা ও শান্ত ভাব এনে দেয়। এর ‘ধ-গ’ স্বরসংগতি এবং পঞ্চমহীন সংহত স্বরবিন্যাস মানুষের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, মানসিকভাবে অহংবোধ শিথিল করতে এবং আত্মধ্যানে নিমগ্ন হতে সাহায্য করে।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ মিঞাঁ কি তোড়ী: তোড়ী পরিবারের মূল প্রতিনিধি; গুর্জরী তোড়ীর সাথে এর প্রায় সমস্ত স্বর ও চাল মিল থাকলেও এতে পঞ্চমের (প) স্পষ্ট ব্যবহার থাকে।
  • রাগ ভূপাল তোড়ী: তোড়ী অঙ্গের একটি ঔড়ব রূপ; এতে তীব্র মধ্যম ও নিখাদ বর্জিত হয়, তবে তোড়ীর কোমল স্বরের করুণ রস এতেও বিদ্যমান।
  • রাগ বিলাসখানী তোড়ী: কোমল স্বরাশ্রয়ী ভোরের অন্য এক অনবদ্য রাগ; তবে এটি ভৈরী ঠাটের আশ্রয়ে গীত হয় বলে এর গায়কি গুর্জরী তোড়ী থেকে পৃথক।
  • রাগ মুলতানি: তোড়ী ঠাটেরই অপরাহ্ণকালীন রাগ; স্বরকাঠামো তোড়ীর কাছাকাছি হলেও দিনের শেষভাগে গীত হওয়ায় এর মেজাজ গুর্জরী তোড়ী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

উপসংহার

রাগ গুর্জরী তোড়ী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই অপার্থিব ভোরের সুর, যা জাগতিক কোলাহল ছাড়িয়ে আত্মাকে পরমাত্মার মুখোমুখি দাঁড় করায়। কোনো রকম চপল অলঙ্কার বা বাহুল্য ছাড়াই কেবল কোমল স্বরগুলোর খাঁটি প্রক্ষেপণে এটি ভোরের নিস্তব্ধতায় যে আধ্যাত্মিক করুণ রস সৃষ্টি করে, তা এক কথায় অতুলনীয়। স্নিগ্ধ ভোরে যখন শিল্পীর কণ্ঠে কিংবা যন্ত্রের তারে গুর্জরী তোড়ীর ‘হ্ম গ, র গ র স’-র মিড় ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অপার্থিব ধ্যানমগ্ন সুরলোকে নিয়ে যায়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — তোড়ী ঠাট ও গুর্জরী তোড়ী স্বর বিশ্লেষণ।
আরও দেখুন:
  • অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ সূচি [ গান খেকো ]
  • সব দেশের সব রকম সঙ্গীতের রীতি/ধারা [ Music Genre ] সূচি | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ