রাগ কল্যাণ পরিবার ও কল্যাণ রাগাঙ্গ | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সান্ধ্যকালীন আসরে সূর্যাস্তের পর আলো-আঁধারির সন্ধিক্ষণে পরম প্রশান্তি, আভিজাত্য, রঞ্জন ক্ষমতা এবং গাম্ভীর্য প্রকাশের সর্বপ্রধান ও রাজকীয় ভিত্তি হলো ‘কল্যাণ রাগাঙ্গ’ বা ‘কল্যাণ অঙ্গ’।

কল্যাণ কেবল ১০টি মূল ঠাটের একটি বা একটি একক জনপ্রিয় রাগ নয়; এটি এমন এক সুগভীর ও বিশাল ‘রাগাঙ্গ’ (Ragang), যা নিজের স্বকীয় স্বরপ্রক্ষেপণ, তীব্র মধ্যমের মহিমান্বিত ব্যবহার এবং অনন্য স্বরসংগতি দিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম বৃহত্তম শাখা ও পরিবারকে নেতৃত্ব দেয়। সান্ধ্যকালীন মার্গ সঙ্গীতে কল্যাণ অঙ্গের রাগগুলোর বিস্তার আসরকে এক অনাবিল মাধুর্য ও আধ্যাত্মিক সুধায় ভরিয়ে তোলে।

কল্যাণ অঙ্গের গাঠনিক ও সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ

একটি রাগে কল্যাণ অঙ্গের উপস্থিতি চিনতে প্রখ্যাত সঙ্গীতশাস্ত্রবিদগণ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন:

১. তীব্র মধ্যমের (M’) প্রাধান্য: কল্যাণ রাগাঙ্গের প্রধান প্রাণশক্তি ও চাবিকাঠি হলো তীব্র মধ্যম (M')। কল্যাণ পরিবারের প্রায় সব রাগেই তীব্র মধ্যম নিজস্ব স্থান দখল করে রাখে।

২. আরোহণে ‘S’ এবং ‘P’-র দুর্বলতা বা বর্জন: কল্যাণ অঙ্গের মূল রাগগুলোতে (যেমন—ইমন বা কল্যাণ) আরোহণে সচরাচর ষড়্‌জ (S) এবং পঞ্চম (P) সরাসরি প্রয়োগ না করে নিখাদ থেকে ঋষভে স্পর্শ করে যাওয়া হয় (N' R G)।

৩. গান্ধার ও নিখাদের ওপর ন্যাস: কল্যাণ অঙ্গের প্রধান ন্যাস স্বর (যেখানে সুর স্থির হয়) হলো গান্ধার (G) এবং নিখাদ (N)। বিশেষ করে N' R G সংগতিটি কল্যাণ অঙ্গের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।

৪. প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):

N' R G, M' P, M' G R, S

অথবা, N' R G M' D N S', S' N D P M' G R S

৫. সময় ও ভাব: কল্যাণ অঙ্গের প্রধান সময় হলো সূর্যাস্তের অব্যবহিত পর—সন্ধ্যাকাল ও রাত্রির ১ম প্রহর (সন্ধে ৬টা থেকে রাত ৯টা)। এটি সান্ধ্যকালীন প্রধান ‘সন্ধিপ্ৰকাশ রাগ’ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মূল রস হলো শান্ত, শৃঙ্গার (প্রেম/মাধুর্য), ভক্তি ও গম্ভীর রস।

কল্যাণ পরিবারের প্রখ্যাত ও আশ্রিত রাগসমূহ

কল্যাণ অঙ্গকে ভিত্তি করে যুগে যুগে প্রবাদপ্রতীম সুরসাধকগণ বহু কালজয়ী, মিশ্র ও ওস্তাদী রাগের উদ্ভাবন করেছেন। কল্যাণ পরিবারের রাগগুলোকে মূলত তাঁদের সাঙ্গীতিক গঠন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. আশ্রয় ও জনক রাগ

  • রাগ কল্যাণ / ইমন (Raga Yaman / Kalyan): কল্যাণ ঠাট ও কল্যাণ অঙ্গের মূল ‘জনক বা আশ্রয় রাগ’। চার শুদ্ধ স্বরের সাথে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ নিখাদের সংযোগে গঠিত এই রাগ রাত্রির প্রথম প্রহরে মার্গ সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার।

২. প্রখ্যাত প্রধান শাখা রাগসমূহ

  • রাগ ইমন কল্যাণ (Raga Yaman Kalyan): মূল ইমনের রূপ, তবে অবরোহণে দুই গান্ধারের মাঝখানে অতীব সূক্ষ্ম ও সুমিষ্টভাবে শুদ্ধ মধ্যমের স্পর্শ ব্যবহার করা হয় (G M G R S)।
  • রাগ শুদ্ধ কল্যাণ (Raga Shuddha Kalyan): আরোহণে ঔড়ব (পাঁচ স্বর: S R G P D S') এবং অবরোহণে সম্পূর্ণ কল্যাণ অঙ্গের সংমিশ্রণে তৈরি অত্যন্ত গম্ভীর ও প্রখ্যাত রাগ।
  • রাগ ভূপালী (Raga Bhupali): পাঁচ স্বরের (ঔড়ব-ঔড়ব) প্রখ্যাত সান্ধ্যকালীন রাগ (S R G P D S')। যদিও এতে তীব্র মধ্যম নেই, তবুও স্বরপ্রক্ষেপণ ও মীড়ের দিক থেকে এটি কল্যাণ অঙ্গেরই একটি অঙ্গীভূত রূপ।
  • রাগ ছায়ানট (Raga Chhayanat): কল্যাণ অঙ্গের সাথে ছায়ানট অঙ্গের সংমিশ্রণ। এতে উভয় মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায় (P R, R G M P, P M' G R)।
  • রাগ কামোদ (Raga Kamod): উভয় মধ্যমযুক্ত জটিল ও চমৎকার রাগ। এতে R P, M' P D P M' G R S সংগতির মাধ্যমে কল্যাণ অঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়।
  • রাগ হমীর (Raga Hameer): বীর রস ও গাম্ভীর্য প্রধান রাগ; যাতে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ মধ্যমের সংমিশ্রণে কল্যাণ ও হমীর অঙ্গ প্রকাশ পায়।
  • রাগ শ্যাম কল্যাণ (Raga Shyam Kalyan): আরোহণে সারং বা কাফীর ছোঁয়া থাকলেও অবরোহণে নিখুঁত কল্যাণ অঙ্গ রূপ পায় (S' N D P M' G R S)।
  • রাগ গৌড় সারং (Raga Gaud Sarang): উভয় মধ্যমযুক্ত বক্র গতির অত্যন্ত সুমিষ্ট প্রাক-সন্ধ্যায় গীত রাগ।

৩. ওস্তাদী, অপ্রচলিত ও বিরল রূপভেদ

  • রাগ পুরিয়া কল্যাণ (Raga Puriya Kalyan): পুরিয়া অঙ্গের (কোমল ঋষভ যুক্ত) পূর্বাঙ্গের সাথে কল্যাণ অঙ্গের উত্তরাঙ্গের মিশ্রণে গঠিত গভীর ওস্তাদী রাগ।
  • রাগ গোরখ কল্যাণ (Raga Gorakh Kalyan): মধ্যম প্রধান সান্ধ্যকালীন কোমল নিখাদযুক্ত বিশেষ স্বর রূপ।
  • রাগ হেম কল্যাণ (Raga Hem Kalyan): পঞ্চমহীন ও বিশেষ বক্র গতিসম্পন্ন প্রাচীন কল্যাণ শাখা।
  • রাগ আনন্দ কল্যাণ, সাভনী কল্যাণ ও রূপমঞ্জরী কল্যাণ: শাস্ত্রগ্রন্থে উল্লিখিত বিশেষ কাঠামোর দুর্লভ কল্যাণ শাখা।

কল্যাণ পরিবারের প্রধান রাগসমূহের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য

রাগের নামস্বরবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যঅঙ্গের মেলবন্ধনপ্রকৃতি ও মেজাজ
ইমন / কল্যাণN' R G M' D N S' / S' N D P M' G R Sমূল কল্যাণ অঙ্গ (তীব্র M')গম্ভীর, শান্ত, সুগভীর মাধুর্য
ইমন কল্যাণS R G M' P D N S' (অবরোহে G M G)ইমন + অবরোহী শুদ্ধ Mঅত্যন্ত সুমিষ্ট, প্রফুল্ল ও রঞ্জক
শুদ্ধ কল্যাণS R G P D S' (আরোহে) / S' N D P M' G R S (অবরোহে)ঔড়ব আরোহ + কল্যাণ অবরোহরাজকীয়, গম্ভীর, ভাবপ্রধান
ভূপালীS R G P D S' / S' D P G R Sকল্যাণ স্বরগ্রাম (তীব্র M' বর্জিত)শান্ত, প্রফুল্ল, ভক্তিপ্রবণ
ছায়ানটS R G M P, P M' G R (উভয় M)কল্যাণ + ছায়ানট অঙ্গআভিজাত্যপূর্ণ, উল্লাসিত
কামোদR P, M' P D P M' G R S (উভয় M)কল্যাণ + কামোদ অঙ্গবক্র, প্রজ্ঞাপূর্ণ, সুমিষ্ট
শ্যাম কল্যাণS R M' P N S' / S' N D P M' G R Sসারং (আরোহ) + কল্যাণ (অবরোহ)শান্ত, স্নিগ্ধ, করুণ-মাধুর্য

ইমন বনাম ইমন কল্যাণ: সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক পার্থক্য

সঙ্গীত অনুরাগী ও শিক্ষার্থীদের মনে প্রায়ই ইমন (Yaman) এবং ইমন কল্যাণ (Yaman Kalyan) রাগের পার্থক্য নিয়ে সংশয় দেখা যায়। ব্যাকরণগতভাবে এদের মূল পার্থক্যটি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ইমন (Yaman): এতে কেবল এবং কেবলমাত্র তীব্র মধ্যম (M') ব্যবহৃত হয়। এতে শুদ্ধ মধ্যমের (M) কোনো অস্তিত্ব নেই। এর চলন প্রধানত: `N' R G M' D N S'`।

২. ইমন কল্যাণ (Yaman Kalyan): এতে মূলত ইমনের সমস্ত নিয়ম বজায় থাকে, তবে অবরোহণে বা তানের ফাঁকে গান্ধার থেকে গান্ধারে নামার সময় অলঙ্কার হিসেবে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শুদ্ধ মধ্যম (M) প্রয়োগ করা হয়—যাকে বলা হয় `G M G` বা `P M' G M G R S`। শুদ্ধ মধ্যমের এই ঈষৎ স্পর্শ রাগটিতে এক পরম মিষ্টি ভাব এনে দেয়।

ভৈরবী রাগিনী - সম্ভবত মেওয়ার, সময়কাল আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম।
ভৈরবী রাগিনী – সম্ভবত মেওয়ার, সময়কাল আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম।

 

কল্যাণ পরিবার ও কল্যাণ রাগাঙ্গ হলো হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পদ্ধতির সেই বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় বৈচিত্র্যময় সুরের বিকাশ ঘটেছে। সূর্যাস্তের পর তানপুরা ও সেতারের গম্ভীর মীড়ে যখন কল্যাণ রাগাঙ্গের `N' R G, M' P, M' G R, S`-এর সুগভীর আবেশ ফুটে ওঠে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে শ্রবণকারীকে জাগতিক কোলাহল থেকে মুক্ত করে এক নিবিড়, শান্ত ও রাজকীয় সুরলোকে পৌঁছে দেয়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।

৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।

৪. Ragas of North Indian Music — অ্যালাইন ড্যানিয়েলু (Alain Daniélou)।

৫. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — কল্যাণ ঠাট ও রাগাঙ্গ বিশ্লেষণ।