অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ আশাবরী বা রাগ আসাবরী । রাগের শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগিণী আশাবরী বা রাগ আশাবরী - রাগমালা পেইন্টিং

সকালবেলার আলসেমি জড়ানো রোদটা যখন ঘরের কোনায় এসে পড়ে, তখন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রাগ আশাবরী শোনার চেয়ে বড় বিলাসিতা আর কিছু হতে পারে না। এই যে আশাবরী—ইনি কিন্তু সকালের রাগ, আশাবরী থাটের মেল রাগ। আশাবরীর আরোহণে ‘নি’ আর ‘গ’ বর্জিত (ঔড়ব-সম্পূর্ণ জাতি), আর অবরোহণে সাতটি স্বরই লাগে। কিন্তু এই রাগের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর কোমল স্বরে। কোমল গান্ধার (জ্ঞা), কোমল ধৈবত (দা) আর কোমল নিখাদ (নী)—এই তিনটি কোমল স্বরের খেলা মনের ভেতর এক অদ্ভুত উদাসীনতা আর ব্যাকুলতা তৈরি করে। কোমল ধৈবতটা যখন মধ্যমের (মা) ওপর ভর করে দাঁড়ায়, তখন বুকের ভেতরটায় কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, ফেলে আসা কোনো পুরোনো প্রেম বা কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন যেন জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ হাতছানি দিচ্ছে।

শাস্ত্র বলে, আশাবরী রাগের প্রকৃতি গম্ভীর, একটু ত্যাগের সুর আছে এতে। কিন্তু আমি যখন শুনি, আমার কাছে একে শুধুই বৈরাগ্য মনে হয় না। এতে আছে এক অদ্ভুত রোমান্টিক বিষণ্ণতা। সকালবেলার কাঁচা ঘুম ভেঙে যখন এই রাগের আলাপ বা বিস্তারের ভেতরে ডুব দেওয়া যায়, মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। এই রাগের বাদী স্বর হলো ধৈবত (ধা) আর সমবাদী হলো গান্ধার (গা)। বাদী-সমবাদীর এই মেলবন্ধন পুরো রাগটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ক্ল্যাসিক্যালের পণ্ডিতরা যখন নিখাদ দরদ দিয়ে এই রাগ পরিবেশন করেন, তখন পাষাণ হৃদয়ের অসুরও যেন মুহূর্তের জন্য সুরলোকে পাড়ি জমায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো এই রাগের চলন—ধীর, গম্ভীর এবং গভীর অর্থবহ।

বাংলা গানে বা ছায়াছবির গানেও আশাবরীর ছায়া আমরা প্রায়ই খুঁজে পাই। যখনই কোনো গানে একটু বিরহ, একটু না-পাওয়ার বেদনা আর এক চিলতে ভোরের আলো মিশে থাকে, বুঝবেন সেখানে আশাবরীর দেবী এসে ভর করেছেন। আশাবরীকে ঠিকমতো ধারণ করতে পারলে গলার সুর তো বটেই, মানুষের চিন্তার গভীরতাও বদলে যায়। অন্তত আমার মতো সঙ্গীতের এই সামান্য শিক্ষানবিশের কাছে আশাবরী মানে কেবল কিছু স্বরের ব্যাকরণ নয়; আশাবরী হলো এক কাপ চা, সকালের রোদ আর ফেলে আসা জীবনের এক নীরব দীর্ঘশ্বাস।

রাগ আশাবরীর স্বরগ্রাম ও রূপ অত্যন্ত সুস্পষ্ট হলেও এর কাছাকাছি স্বরবিন্যাসের রাগগুলোর সঙ্গে পার্থক্য বজায় রাখা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের একটি বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জৈনপুরী, দরবারী কানাড়া এবং আড়ানা—এই রাগগুলোর স্বর আশাবরীর প্রায় হুবহু এক হওয়ায় পরিবেশনার সামান্য ভুলের কারণে রাগ মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই দুটি রাগের ঠাট (আশাবরী ঠাট), বর্জিত স্বর (আরোহে ‘গ’ ও ‘ন’ বর্জিত ঔড়ব-সম্পূর্ণ জাতি) এবং কোমল স্বর (গ, ধ, ন কোমল) সম্পূর্ণ এক। পার্থক্য তৈরি হয় কেবল আরোহ ও গায়কির চলনে। আশাবরীতে আরোহের সময় ঋষভ (রে) থেকে সরাসরি মধ্যমে (মা) যাওয়া হয়—যেমন ‘সা রে মা পা’। কিন্তু জৈনপুরীতে আরোহের সময় কোমল নিখাদ স্পর্শ করে গাওয়া হয়—যেমন ‘সা রে মা পা, ধা না সা’ বা ‘সা রে গ মা পা’। এছাড়া জৈনপুরীর গতি আশাবরীর চেয়ে কিছুটা দ্রুত ও চঞ্চল।

দরবারী কানাড়াও আশাবরী ঠাটেরই রাগ এবং এতেও কোমল গা, ধা, না ব্যবহৃত হয়। তবে দরবারীর মূল পরিচয় লুকিয়ে আছে এর বিশেষ অলঙ্করণ ও সপ্তকে। দরবারী কানাড়াতে কোমল গান্ধার (গ) এবং কোমল ধৈবতে (ধ) অতি সূক্ষ্ম অন্দোলিত আন্দোলন (vibrato) করা হয় এবং এটি মূলত মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের রাগ। অন্যদিকে আশাবরী মধ্য ও তার সপ্তকপ্রধান রাগ, যেখানে স্বরগুলো আন্দোলন ছাড়াই সোজা ও গম্ভীরভাবে লাগানো হয়।

আড়ানাতেও আশাবরীর মতো একই কোমল স্বর ব্যবহৃত হয়। তবে আড়ানা হলো চঞ্চল ও উদ্দীপনামূলক প্রকৃতির উত্তরঙ্গপ্রধান রাগ (তার সপ্তকের কাজ বেশি), অন্যদিকে আশাবরী হলো এক শান্ত, করুণ ও বিলম্বিত লয়ের সকালের রাগ।

রাগিণী আশাবরী বা রাগ আশাবরী - রাগমালা পেইন্টিং
রাগিণী আশাবরী বা রাগ আশাবরী – রাগমালা পেইন্টিং

রাগ আশাবরী

রাগ আশাবরীর শাস্ত্র [Grammar of this Raga]:

আশাবরী থাটের এই রাগে গান্ধার, ধৈবত ও নিখাদ কোমল। আরোহণে ‘গ’ ও ‘ন’ বর্জিত হওয়ায় এটি ঔড়ব জাতির এবং অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হওয়ায় সম্পূর্ণ জাতির রূপ নেয়।

  • আরোহণ: স র ম প দ র্স
  • অবরোহণ: র্স ন দ প ম জ্ঞ র স
  • ঠাট: আশাবরী
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ
  • বাদীস্বর: দ (ধৈবত)
  • সমবাদী স্বর: জ্ঞ (গান্ধার)
  • অঙ্গ: উত্তরের অংশ বা উত্তারাঙ্গপ্রধান।
  • সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর (সকাল)।
  • পকড়: র ম প দ প, ম জ্ঞ র স।

 

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

আসাবরী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগের তালিকা:

  • রাগ জৌনপুরী: আসাবরী ও জৌনপুরী প্রায় একই রকম, তবে জৌনপুরীর আরোহে নিষাদ (নি) ব্যবহৃত হয় যা আসাবরীতে হয় না।
  • রাগ দরবারী কানাড়া: আসাবরী ঠাটের অন্তর্গত হলেও দরবারী কানাড়ার চলন এবং গমকের ব্যবহার একে আসাবরী থেকে পৃথক করে।
  • রাগ গন্ধারী: আসাবরীর সাথে এই রাগের অনেক মিল আছে, তবে এতে শুদ্ধ ঋষভের পরিবর্তে কোমল ঋষভ ব্যবহারের প্রয়োগ দেখা যায়।
  • রাগ আড়ানা: এটিও আসাবরী ঠাটের রাগ, তবে এর আরোহ-অবরোহের গতি অনেক দ্রুত এবং এটি মূলত বীর বা শৃঙ্গার রসের রাগ।

রাগ আসাবরী কেবল সুরের বিন্যাস নয়, বরং এটি আত্মিক উপলব্ধির একটি পথ। এর ভক্তিপূর্ণ এবং শান্ত মেজাজ শ্রোতাকে পার্থিব কোলাহল থেকে দূরে নিয়ে যায়। উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষার্থীদের জন্য এই রাগটি আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কোমল স্বরের সূক্ষ্ম প্রয়োগ এবং মীড়ের কাজ শেখার জন্য একটি চমৎকার মাধ্যম। ভোরের পরবর্তী সময়ে প্রকৃতির নিস্তব্ধতার সাথে এই রাগের সুর এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ আশাবরী:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. আজিকে তোমারে স্মরণ করি (রাগঃ আশাবরী মিশ্র)

২. আমি যেদিন রইব না গো (রাগঃ আশাবরী)

৩. ঝর্‌ল যে-ফুল ফোটার আগেই (রাগঃ আশাবরী মিশ্র)

৪. নতুন নেশার আমার এ মদ (রাগঃ আশাবরী)

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ আশাবরী:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।

  • “মনমোহন গহন যামিনীশেষে” (রাগ: আশাবরী, তাল: ঝাঁপতাল)। এটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম যুগের ধ্রুপদী অঙ্গের খাঁটি আশাবরী।
  • “বিমল আনন্দে জাগো রে” (রাগ: আশাবরী, তাল: আড়াঠেকা)।
  • “এসে শরতের অমল মহিমা” (রাগ: আশাবরী, তাল: কাহারবা)।
  • জয় জয় পরম” (আশাবরী-ভৈরবী, তাল: কাহারবা)
  • “তোমারে না পেলে আমি” (আশাবরী-ভৈরবী, তাল: ত্রিতাল)
  • “অমন আড়াল দিয়ে” (আশাবরী-ভৈরবী, তাল: দাদরা)

 

আধুনিক গানে আশাবরী:

১. “কে নিবি গো কিনে আমায়”  শিল্পী: শচীন দেব বর্মণ

শচীন কর্তার এই বিখ্যাত গানটিতে আশাবরী অঙ্গের (বিশেষ করে জৌনপুরী-আশাবরী) চলন খুব স্পষ্ট। শচীন দেব বর্মণ শাস্ত্রীয় সংগীতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন এবং এই গানে তিনি আশাবরী ঠাটের বিষণ্ণতা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

২. “তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার” (হারানো সুর চলচ্চিত্র) শিল্পী: গীতা দত্ত

এই গানটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক আছে। অনেকে একে প্রথাগত আশাবরী বলেন, তবে সংগীত গবেষকদের মতে এটি মূলত মিশ্র জৌনপুরী বা আশাবরী ঠাটের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি একটি রোমান্টিক মেলোডি। পুরোপুরি শাস্ত্রীয় আশাবরী এটি নয়, তবে আশাবরী অঙ্গের ছায়া এতে প্রবল।

 

গজলে আশাবরী:

১.

ভজনে আশাবরী:

১.

ঠুমরিতে আশাবরী:

১.

যন্দ্রে আশাবরী:

সেতার: ১. ইমদাদখানী ঘরানার পণ্ডিত শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – আশাবরী।

সরদ: ১. মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরদে – আশাবরী। ২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরদে – আশাবরী।

খেয়াল:

১. ওস্তাদ আমীর খান সাহেবের কণ্ঠে – আশাবরী।

২. পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খানের কণ্ঠে – আশাবরী।

৩. পণ্ডিত ডি. ভি. পলুস্করের কণ্ঠে – আশাবরী।

যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে।

সম্পর্কিত রাগ:

জৌনপুরী

দেশী

দেবগান্ধার

গান্ধারী।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……।

আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।