আজ অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজে আলোচনা গজল নিয়ে। প্রথমে আলাপ করা যাক – গজল আসলে কী? আমরা প্রচলিত ভাবে ছোট বেলা থেকে হামদ-নাত টাইপ ধর্মগানকেই গজল হিসেবে জেনে থাকি। কিন্তু গজল কি আসলে তাই?

গজল
আসলে গজল এক ধরনের কবিতা, বা জোড়া দেয়া কবিতার সমগ্র। এই কবিতাগুলো যখন সুর মিশিয়ে গাওয়া শুরু হলো, তখন সেই গানের নামও হল গজল।
গজলের জন্ম কিন্তু সরাসরি গজল হিসেবে হয়নি। আরবে তখন ‘কসিদা’ (Qasida) নামের দীর্ঘ কবিতা লেখা হতো (যাতে রাজা বা গোত্রের প্রশংসা থাকত)। এই দীর্ঘ কসিদার শুরুতে কবিরা ভূমিকা হিসেবে প্রেমিকা বা হারানো যৌবনের স্মৃতিচারণ করতেন। এই অংশটুকুকে বলা হতো ‘তশবিব’ (Tashbib)। কালক্রমে এই প্রেমের অংশটুকু মূল কবিতা থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রূপ নেয়, যাকে আরবিতে বলা হলো ‘গজল’ (যার আক্ষরিক অর্থ: নারীদের সাথে প্রেমের আলাপ)।
আরবি গজল যখন ইরানে (পারস্যে) এলো, তখন ফারসি কবিরা একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। তাঁরা গজলে পার্থিব প্রেমের পাশাপাশি সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক প্রেম যোগ করলেন। যেখানে ‘মদ’ হয়ে উঠল ঐশ্বরিক জ্ঞান এবং ‘সাকি’ (পরিবেশক) হলেন সৃষ্টিকর্তা বা গুরু। এই সময়ের দিকপাল ফারসি কবিরা হলেন হাফিজ শিরাজি, শেখ সাদি, রূমি এবং ওমর খৈয়াম।
সুলতানি ও মুঘল আমলে ফারসি গজল ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। ১৩শ শতকের আমীর খসরুকে ভারতীয় গজলের জনক বলা হয়। তিনি ফারসি ও স্থানীয় ব্রজভাষা মিলিয়ে গজল লেখা ও গাওয়া শুরু করেন। ওয়ালী দখিনী প্রথম দক্ষিণ ভারত থেকে উর্দু ভাষায় গজল লিখে দিল্লিতে নিয়ে আসেন। এরপর দিল্লি ও লখনউ হয়ে ওঠে গজলের মূল কেন্দ্র। এরপর মীর তকি মীর, মির্জা গালিব এর মতো ওস্তাদদের হাত ধরে উর্দু গজল তার চূড়ান্ত সাহিত্যিক রূপ পায়।
গজলের সাধারণ কারিগরি বিষয়:
উর্দু গজল সচরাচর দুই দুই লাইন করে তৈরি কবিতা। যেটাকে “মিসরা” বলে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি মিসরা একটি করে স্বাধীন কবিতা। আগের মিসরার সাথে তার সম্পর্ক থাকতেও পারে, নাও পারে। ছন্দ ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ও আমাদের কবিতা থেকে একটু আলাদা। মির্জা গালিবের দুই লাইন নিয়ে আলোচনা করে দেখা যাক :
“দিলে নাদান তুঝে হুয়া কিয়া হ্যায়,
আখির ইস দারদ কা দাওয়া কিয়া হ্যায়”
শেষে “কিয়া হ্যায়, কিয়া হ্যায়” রিপিট করে ছন্দ মেলাতে সহায়তা করা হয়। এই ছন্দ সহযোগী শব্দগুলোকে বলে “রাদিফ“। এবং মুল ছন্দ “হুয়া” বা “দাওয়া”, যা বদলে যাচ্ছে প্রতিটি লাইনে, একে “কাফিয়া” বলে।
প্রথম “মিসরা” টি সচরাচর খুব ছন্দ-মিল রেখে করা হয়, যেটার নাম “মাতলা“। এটাই গজলের ভিত্তি। এরপর মোটামুটি একই ধরনের ছন্দ (মিটার) ও রাদিফ ধরে আগানো হয়।
শেষ শের বা মিসরা কে বলে “মাকতা“, যেখানে কবি তার নাম, পেন নেম (তাখাল্লুস) ব্যাবহার করেন।
গজল এর কালেকশন বা সংগ্রহ কে বলে “দিউয়ান“। গজল বিষয়ে এটুকু কারিগরি বিষয় আপনার জানলেই চলবে। আরও যদি জানতে চান তবে কিছু জিনিস জানিয়ে রাখি:
অন্যন্য কারিগরি বিষয়:
নিচের ৪টি বিষয় গজলকে পূর্ণতা দেয়:
১. বহর (Bahr / Meter)
গজলের সবচেয়ে কঠিন ব্যাকরণ হলো এর ‘বহর’ বা মিটার। একটি গজলের সবকটি শের একই বহরে (একই ছন্দে ও মাত্রায়) হতে হবে। যদি কোনো লাইনের মাত্রা কম-বেশি হয়, তবে তাকে উর্দুতে ‘খারিজ আজ বহর’ (ছন্দচ্যুত) বলা হয় এবং গজল হিসেবে সেটি বাতিল হয়ে যায়।
২. হুসন-এ-মাতলা (Husn-e-Matla)
কখনো কখনো কবি গজলের প্রথম শের-এর (মাতলা) ঠিক পরপরই দ্বিতীয় শেরটিতেও দুই লাইনেই কাফিয়া ও রাদিফ ব্যবহার করেন। এই দ্বিতীয় চমৎকার শেরটিকে বলা হয় ‘হুসন-এ-মাতলা’ বা ‘জেব-এ-মাতলা’।
৩. গজলের প্রকারভেদ (পড়ার ধরন অনুযায়ী)
- মুরাদ্দফ গজল (Muraddaf Ghazal): যে গজলে কাফিয়া এবং রাদিফ দুটোই থাকে (যেমন গালিবের ওই শেরটি)।
- গায়ের মুরাদ্দফ গজল (Ghair-Muraddaf Ghazal): যে গজলে কোনো রাদিফ থাকে না, শুধু কাফিয়া (ছন্দ মেলানো শব্দ) দিয়ে শের শেষ হয়।
৪. গায়ে গজল ও তারান্নুম (সুর করে গাওয়ার শিল্প)
গজল যখন সাহিত্য থেকে সংগীতে রূপ নেয়, তখন তার পরিবেশনের কিছু ব্যাকরণ আছে:
- তারান্নুম (Tarannum): কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া শুধু খালি গলায় সুর করে গজল পড়া।
- মুশায়েরা (Mushaira): কবিদের আসর, যেখানে গজল পাঠ করা হয়।
- দাদ (Daad): গজলের ভালো শের শুনলে শ্রোতারা যে “ওয়াহ্ ওয়াহ্” বা “সুবহানআল্লাহ” বলে প্রশংসা করেন, তাকে উর্দুতে ‘দাদ দেওয়া’ বলে। এটি গজলের আবহের প্রাণ।
এগুলো ছাড়াও গজলে আরও কিছু অত্যন্ত চমৎকার এবং সূক্ষ্ম কারিগরি বিষয় (Technical Aspects) রয়েছে, যা একজন সাধারণ কবি এবং একজন উস্তাদ (মাস্টার) কবির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। সেই বিশেষ কারিগরি বিষয়গুলো হলো:
তাকতি (Taqti – স্ক্যানিং বা ছন্দ বিশ্লেষণ)
বহর বা মিটার ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার গাণিতিক প্রক্রিয়াকে বলে ‘তাকতি’।
- এটি অনেকটা আমাদের ছোটবেলার ছন্দের মাত্রা গণনার মতো। উর্দুতে অক্ষরের স্বরধ্বনিকে ভাঙা হয়।
- প্রতিটি শব্দকে নির্দিষ্ট মাত্রার এককে (যাকে রুকন বা বহরের একক বলে, যেমন: ফাইলুন, মুফাইলুন, ফাউলুন) ভাগ করে দেখা হয় লাইনের ওজন ঠিক আছে কি না। ওজন কম-বেশি হলে তাকে বলে ‘খারেজ-আজ-বহর’ (ছন্দচ্যুত)।
মিসরা-এ-উলা এবং মিসরা-এ-সানি (The Two Lines)
একটি শের-এর দুটি লাইনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে:
- মিসরা-এ-উলা (প্রথম লাইন): এটি মূলত একটি ভূমিকা বা একটি প্রশ্ন/অবস্থা তৈরি করে।
- মিসরা-এ-সানি (দ্বিতীয় লাইন): এটি প্রথম লাইনের উত্তর দেয়, চমক তৈরি করে বা মূল ভাবটিকে পূর্ণতা দেয়।
উদাহরণ: (প্রথম লাইন): যখনই তোমার নাম মুখে নিই, তখনই চোখ জলে ভরে ওঠে! (দ্বিতীয় লাইন – চমক): এমন কষ্টের জীবন পার করার মতো কলিজা মানুষ কোথায় পাবে?
রদ-এ-মাতলা (Radd-e-Matla)
এটি গজলের একটি অত্যন্ত উঁচুমানের কারিগরি কৌশল। কবি যখন গজলের প্রথম শের-এর (মাতলা) কোনো একটি লাইন বা শব্দকে গজলের একদম শেষ শের-এ (মাকতা) পুনরায় ফিরিয়ে আনেন এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অর্থে ব্যবহার করেন, তাকে রদ-এ-মাতলা বলে। এটি গজলের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।
হুসন-এ-তলব (Husn-e-Talab)
গজলের কোনো একটি শেরে যদি কবি নিজের কোনো ইচ্ছা, দাবি বা অনুরোধ প্রিয়ার কাছে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এবং সুন্দর কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেন, তবে সেই শেরটিকে কারিগরি ভাষায় ‘হুসন-এ-তলব’ বলা হয়।
গজলের ভাবগত প্রকারভেদ (শ্রেণীবিভাগ)
কারিগরি ছাড়াও ভাবের ওপর ভিত্তি করে গজলের কিছু ভাগ আছে:
- গজল-এ-মুসালসাল (Ghazal-e-Musalsal): আমরা জানি গজলের প্রতিটি শের স্বাধীন। কিন্তু যদি কোনো গজলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবগুলো শের একটি নির্দিষ্ট গল্প বা ধারাবাহিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়, তাকে মুসালসাল গজল বলে।
- তাগাজ্জুল (Taghazzul): গজলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রেম ও বিরহের চিরাচরিত রস বা আবহকে ‘তাগাজ্জুল’ বলে। কোনো গজলে যদি প্রেম বা বিরহের আসল সুরটি না থাকে, তবে ব্যাকরণ ঠিক থাকলেও উস্তাদরা বলেন— “এতে তাগাজ্জুল নেই!”
কিছু সাধারণ ত্রুটি (যাকে উস্তাদরা দোষ ধরেন):
গজলে কিছু কারিগরি ভুলকে বড় অপরাধ ধরা হয়:
- শুতার গুরবা (Shutur Gurba): একটি শের-এর প্রথম লাইনে আপনি যদি কাউকে ‘আপনি’ (আপ) করে বলেন এবং দ্বিতীয় লাইনে হুট করে ‘তুমি’ (তুম) বা ‘তুই’ (তু) করে বসেন, তবে তাকে শুতার গুরবা দোষ বলে। অর্থাৎ, পুরুষ/বচন/সর্বনামের সামঞ্জস্য না থাকা।
- ইতা (Ita): কাফিয়া মেলানোর সময় একই শব্দের পুনরাবৃত্তি করাকে ইতা দোষ বলে। যেমন— একবার কাফিয়া দিলেন ‘নাদান’ আর পরের শেরে কাফিয়া দিলেন ‘জানান’। এখানে মূল ছন্দ ‘আন’ মিলে গেলেও একই শব্দের অংশ আসায় একে দুর্বল কাফিয়া ধরা হয়।
আরুজ (Ilm-ul-Arooz – ছন্দবিজ্ঞান)
আমরা যে ‘বহর’ (ছন্দ মাত্রা) নিয়ে কথা বলেছি, সেই বহরগুলো যে শাস্ত্রের অধীনে তৈরি ও পরিমাপ করা হয়, তাকে বলে আরুজ বা ইলম-এ-আরুজ।
- এটি মূলত প্রাচীন আরবি ও ফারসি ব্যাকরণ থেকে এসেছে।
- উর্দুতে ১৯টি মূল বহর আছে। এই মূল বহরগুলো থেকে ভেঙে ভেঙে প্রায় শতাদিক উপ-বহর তৈরি হয়েছে।
আরকানের পরিবর্তন (Zihaf – জিহাফ)
এটি গণিতের সমীকরণের মতো! একটি নির্দিষ্ট বহরের মূল শব্দ বা একককে বলা হয় রুকন (Rukn) (বহুবচনে আরকান)।
কবিরা যখন এই মূল এককের ছাঁচে শব্দ বসাতে গিয়ে একটু হেরফের করেন (যেমন কোনো স্বরবর্ণ ছোট করা বা ছেঁটে ফেলা), তখন সেই প্রক্রিয়াকে বলে জিহাফ। এটি করার অনুমতি ব্যাকরণে আছে, যাতে কবিদের শব্দ চয়নে স্বাধীনতা থাকে।
কাফিয়ার প্রকারভেদ ও ত্রুটি (Uyoob-e-Qafiya)
কাফিয়া মেলানোর ক্ষেত্রে উস্তাদরা কিছু সূক্ষ্ম ত্রুটি বা ‘আইব’ (Uyoob) ধরেন, যা একজন সাধারণ পাঠক ধরতে পারেন না:
- কাফিয়া-এ-মামুলা (Qafiya-e-Mamoola): যখন দুটি শব্দের আসল বানান বা ব্যুৎপত্তি আলাদা, কিন্তু উচ্চারণ মেলাতে গিয়ে জোর করে কাফিয়া বানানো হয়।
- সানিদ (Sanad) ও ইকতা (Ikta): কাফিয়ার মূল স্বরধ্বনি (Vowel Sound) যদি সামান্যও বদলে যায়, তবে তাকে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি ধরা হয়। যেমন— ‘দিল’ (Dil) এর সাথে ‘কাল’ (Kal) মেলানো যাবে না, কারণ একটির মূল স্বর ‘ই’ এবং অপরটির ‘আ’।
গজলের গাঠনিক প্রকারভেদ (অনুপস্থিত রাদিফ ও অতিরিক্ত উপাদান):
- গায়ের মুরাদ্দফ গজল (Ghair Muraddaf Ghazal): যে গজলে কোনো ‘রাদিফ’ (অপরিবর্তিত শব্দ) থাকে না। প্রতিটি শের সরাসরি ‘কাফিয়া’ দিয়ে শেষ হয়। এটি লেখা অনেক বেশি কঠিন, কারণ কবির হাতে বারবার একই শব্দ ব্যবহারের সুযোগ থাকে না।
- মুসাল্লাস ও মুরাব্বা (Musallas & Murabba): প্রথাগত গজল দুই লাইনের শের হলেও, কখনো কখনো তিন লাইনের (মুসাল্লাস) বা চার লাইনের (মুরাব্বা) স্তবক দিয়েও গজল লেখা হয়।
- কসيده (Qasida) এবং গজল: কসিদাহ হলো গজলেরই বড় ভাই! গজলে যেখানে শেরের সংখ্যা সাধারণত ৫ থেকে ১৫টি হয়, কসিদাহ-তে তা ৫০ থেকে ১০০টি হতে পারে এবং এটি সাধারণত কোনো রাজা বা ব্যক্তির প্রশংসায় লেখা হতো।
গজল গাইবার রীতি :
শুরুর দিকে আগে থেকে কম্পোজড্ গজল গাইবার রীতি ছিল না। রেয়াজ ছিল- গায়ক কবিতার সাথে সময় নিয়ে নিজের বোঝাপড়া শেষ করবেন। এরপর গাইবার সময় কবিতার মুডের সাথে মানাসই একটি রাগ ও তাল বেছে নেবেন, সেটার উপরে ভিত্তি করে মনে যেই সুরে আসবে, সেই সুর দিয়ে কবিতাটি প্রকাশ করবেন।
ওস্তাদ মেহেদি হাসান খান প্রথম দিকে যখন রেডিওতে গাইতেন, তখন সাবধানতার জন্য প্রথমে গজল গুলো কম্পোজ করে নিতেন। একদিন তার বাবা (আজিম খান) ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কিভাবে গাইছে ছেলে। মেহেদি হাসান আগে কম্পোজ করার কথা বলাতে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন। মেহেদি হাসান বললেন ভুল হলে চাকরি খোয়া যেতে পারে, এজন্য সাবধানতার কারণে তিনি আগে থেকে কম্পোজ করে নিচ্ছেন। বড় খাঁ সাহেব বললেন- গজল যদি আগে থেকে কম্পোজ করেই গাইবে, তবে এত প্রজন্ম ধরে গান শিখে কি লাভ হল? শেষ পর্যন্ত বাবা ছেলে একটা বোঝাপড়ায় এলেন। ৩ টি গজলের একটি আগে থেকে কম্পোজ করে যাবেন, আর দুটি ওই মুহূর্তে যে সুর এবং তাল মনে আসবে তা থেকে গাইবেন।
ওস্তাদ মেহেদি হাসানের এমন অনেক গজল, আছে যেটা প্রথমবার একবারে বসে গাওয়া সুরই জনপ্রিয় হয়েছে। এমনকি কবিতাটি আধা ঘণ্টা আগে হাতে পেয়ে, প্রথম বার সুর লাগিয়েই, পুরো গজলের ফাইনাল টেক হয়ে গেছে।
একজন গাইয়ে প্রথমবারে যে সুরে গান, মোটামুটি ভালো হলে সেই সুরটিকে ধরে রাখেন। তবে গজলের মানে প্রতিবার একটু আলাদা করে, ইমপ্রোভাইজ করে গাওয়া। একই সুরে একই রকম করে প্রতিবার গাইলে গজলের শ্রোতারা আগ্রহ হারান।
গজলের মূল গায়নরীতি (The Singing Styles)
ঐতিহাসিকভাবে গজলের গায়নরীতিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক. শাস্ত্রীয় বা ক্লাসিক্যাল গায়নরীতি (Classical Style):
ঠুমরি, দাদরা বা টপ্পা অঙ্গের রাগ-সংগীতের ওপর ভিত্তি করে এই ধারার গজল গাওয়া হয়। এখানে রাগের বিশুদ্ধতা এবং শাস্ত্রীয় তান-বিস্তারের প্রাধান্য থাকে।
প্রবক্তা: উস্তাদ বরকত আলী খান, বেগম আখতার, উস্তাদ আমানত আলী খান।
খ. আধুনিক বা সেমি-ক্লাসিক্যাল গায়নরীতি (Semi-Classical/Light Classical):
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জগজিৎ সিং, মেহেদী হাসান বা গোলাম আলীর হাত ধরে গজলে এক নতুন বিপ্লব আসে। এখানে রাগের ব্যাকরণ ঠিক রেখেও সুরকে সহজ ও শ্রুতিমধুর করা হয়, যাতে সাধারণ শ্রোতারাও তা উপভোগ করতে পারেন। একে বলা হয় সুগম সংগীত বা আধুনিক গজল গায়কি।
গায়নের প্রধান অঙ্গ ও কারিগরি উপাদান (Technical Elements)
গজল গাওয়ার সময় একজন গায়ককে নিচের কারিগরি দিকগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়:
১. শায়েরি বা উচ্চারণ স্পষ্টতা (Lafz aur Talaffuz):
গজলের প্রধান শর্ত হলো— শব্দ সুরের চেয়ে বড়। খিয়াল বা তারানায় যেমন সুরের দাপটে কথা হারিয়ে যায়, গজলে তা করা অপরাধ। প্রতিটি উর্দু বা ফারসি শব্দের উচ্চারণ (যেমন: ‘খ’ ও ‘খ়’, ‘জ’ ও ‘জ়’ এর পার্থক্য) একদম নিখুঁত হতে হবে।
২. তারান্নুম (Tarannum):
অনেক সময় গজলের শুরুতে বা মুশায়েরায় কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া, কেবল খালি গলায় পঠিত সুর করে শায়ের আবৃত্তি করা হয়। এই বিশেষ সুরময় আবৃত্তিকে তারান্নুম বলে।
৩. গিরহ লাগানো (Girah Bandi):
এটি গজলের অত্যন্ত উঁচুমানের গায়নরীতি। গজল গাইতে গাইতে মূল ভাবের সাথে মিল রেখে গায়ক যখন হঠাৎ অন্য কোনো কবির একটি প্রাসঙ্গিক শের বা লাইন সেখানে জুড়ে দেন এবং আবার মূল গজলের সুরে ফিরে আসেন, তাকে ‘গিরহ লাগানো’ বলে।
৪. মুরকি বা মীড় (Murki and Meend):
গজলে বড় বড় তান বা গিটকিরি দেওয়া হয় না। এখানে ব্যবহার করা হয় সূক্ষ্ম ‘মুর্কি’ (অল্প কথায় দ্রুত স্বরের কাজ) এবং ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া)। এটি গজলে এক ধরনের চাপা কান্না বা আবেগের সৃষ্টি করে।
গজলের তাল ও বাদ্যযন্ত্র (Taal and Instruments):
ব্যবহৃত তাল:
গজলে সাধারণত ধীর ও মিষ্টি তাল ব্যবহার করা হয়, যা শব্দের ভাব প্রকাশে বাধা দেয় না।
- কাহারবা তাল (৮ মাত্রা): গজলের সবচেয়ে প্রিয় ও জনপ্রিয় তাল।
- রূপক তাল (৭ মাত্রা): একটু গম্ভীর ও বিরহের গজলে ব্যবহৃত হয়।
- দাদরা তাল (৬ মাত্রা): দ্রুত গতির বা চপল গজলে ব্যবহৃত হয়।
বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ:
গজলে বাদ্যযন্ত্র সবসময় কণ্ঠশিল্পীর পেছনে ছায়ার মতো থাকে, কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায় না।
- হারমোনিয়াম ও সারেঙ্গি: সুরের রেশ ধরে রাখার জন্য।
- তবলা: মৃদু লয়ে ছন্দ দেওয়ার জন্য।
- সন্তুর, সেতার বা গিটার: আধুনিক গজলে আবহ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের ৪টি প্রধান গজল ঘরানা বা গায়কি:
গজল গায়কির ক্ষেত্রে চারজন কিংবদন্তি চারটি আলাদা ধারার জন্ম দিয়েছেন:
১. মেহেদী হাসান (রাজস্থানি বা শাস্ত্রীয় ধারা): তাঁকে গজলের সম্রাট বা ‘শেহেনশাহ-এ-গজল’ বলা হয়। তাঁর গায়কিতে নিখুঁত রাগ ও খাদের আওয়াজের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ছিল।
২. জগজিৎ সিং (আধুনিক ও ভাব গম্ভীর ধারা): তিনি পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র (যেমন গিটার, ভায়োলিন) গজলে নিয়ে আসেন এবং ভারী গলায় অত্যন্ত আবেগ দিয়ে সহজ সুরে গজলকে মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেন।
৩. গোলাম আলী (পাঞ্জাবি ও শাস্ত্রীয় চপল ধারা): তাঁর গায়কি ছিল দ্রুত মুর্কি ও ঠুমরি অঙ্গের। গানের মাঝখানে তবলার সাথে তাঁর সওয়াল-জওয়াব ও লয়কারি দারুণ জনপ্রিয়।
৪. বেগম আখতার (লখনউ ও পুরব অঙ্গ): দরবারি ঐতিহ্য ও ঠুমরির এক বিষণ্ণ মেলবন্ধন ছিল তাঁর কণ্ঠে। তাঁকে ‘মল্লিকা-এ-গজল’ বলা হয়।

গজলে আমার কয়েকজন কবি:
- মীর তকী মীর
- মীর্জা গালিব
- মিয়া মমিন
- বাহাদুর শাহ জাফর
- আহমাদ ফারাজ (সৈয়দ আহমেদ শাহ)
- হাফিজ হোশিয়ারপুরী
- সাগর সিদ্দিকী
- দাঘ দেহেলভী (নওয়াব মীর্জা খান) এর শায়েরি
** আমার পছন্দের সব শায়ের কে কবির উচ্চতা দিয়ে বিচার করিনি। যাদের শায়েরি গজ.ল হিসেবে শুনতে ভালো লেগেছে তাদেরই তালিকা দিয়েছি।
আমার প্রিয় কয়েকজন গজল গায়ক:
- বেগম আখতার
- ওস্তাদ আমানত আলী খান
- ওস্তাদ মেহেদি হাসান (শ্যাহেনশাহে গাজল)
- ইজাজ হুসেইন হাযারভী
- গোলাম আলী
- জগজিৎ সিং
![গজল Ghazal গান খেকো গজল সম্পর্কে বিস্তারিত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 4 গজল [ Ghazal ] গান খেকো](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/গজল-Ghazal-গান-খেকো-300x157.png)
গজল বিষয়ে আরও পড়তে পারেন মিউজিক গুরুকুলে গাজল নিয়ে যা লিখেছি।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
![গজল Ghazal গান খেকো গজল সম্পর্কে বিস্তারিত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 গজল [ Ghazal ] গান খেকো](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/গজল-Ghazal-গান-খেকো.png)