রাগ আসাবরী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ আসাবরী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তি রসাত্মক রাগ। এই রাগটি শ্রবণ করলে মনের মধ্যে এক প্রকার বৈরাগ্য ও প্রশান্তির সৃষ্টি হয়।

রাগ আসাবরী

রাগ আসাবরী: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ আসাবরী ‘আসাবরী ঠাট’-এর প্রধান রাগ (আশ্রয় রাগ)। এটি একটি প্রাচীন রাগ এবং মনে করা হয় যে এর উৎপত্তি দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত ধারা থেকে। মধ্যযুগে সংগীতের বিভিন্ন গ্রন্থে এই রাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। আসাবরী রাগের চলন প্রধানত ধীর এবং এর প্রধান আবেদন লুকিয়ে আছে কোমল স্বরগুলোর সঠিক প্রয়োগে। বিশেষ করে কোমল ধৈবত (ধ) এবং কোমল নিষাদ (নি)-এর আন্দোলন এই রাগের মধ্যে একটি বিরহী বা আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা তৈরি করে। এটি মূলত একটি দিনের রাগ, যা সূর্য ওঠার পর প্রকৃতির শান্ত রূপকে প্রতিফলিত করে।

রাগের শাস্ত্র

রাগ আসাবরী-এর শাস্ত্রীয় রূপ ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: আসাবরী।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে ম প ধ সা (কিংবা স র ম প ধ সঁ — এখানে ‘ধ’ কোমল)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ প ম গ রে সা (এখানে গ, ধ, নি — তিনটি স্বরই কোমল)।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধ) — (কোমল)।
  • সমবাদী স্বর: গান্ধার (গ) — (কোমল)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গ) ও নিষাদ (নি) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (ম) এবং পঞ্চম (প) শুদ্ধ; কিন্তু গান্ধার (গ), ধৈবত (ধ) ও নিষাদ (নি) কোমল।
  • সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং বৈরাগ্যপূর্ণ।

 

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

আসাবরী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগের তালিকা:

  • রাগ জৌনপুরী: আসাবরী ও জৌনপুরী প্রায় একই রকম, তবে জৌনপুরীর আরোহে নিষাদ (নি) ব্যবহৃত হয় যা আসাবরীতে হয় না।
  • রাগ দরবারী কানাড়া: আসাবরী ঠাটের অন্তর্গত হলেও দরবারী কানাড়ার চলন এবং গমকের ব্যবহার একে আসাবরী থেকে পৃথক করে।
  • রাগ গন্ধারী: আসাবরীর সাথে এই রাগের অনেক মিল আছে, তবে এতে শুদ্ধ ঋষভের পরিবর্তে কোমল ঋষভ ব্যবহারের প্রয়োগ দেখা যায়।
  • রাগ আড়ানা: এটিও আসাবরী ঠাটের রাগ, তবে এর আরোহ-অবরোহের গতি অনেক দ্রুত এবং এটি মূলত বীর বা শৃঙ্গার রসের রাগ।

রাগ আসাবরী কেবল সুরের বিন্যাস নয়, বরং এটি আত্মিক উপলব্ধির একটি পথ। এর ভক্তিপূর্ণ এবং শান্ত মেজাজ শ্রোতাকে পার্থিব কোলাহল থেকে দূরে নিয়ে যায়। উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষার্থীদের জন্য এই রাগটি আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কোমল স্বরের সূক্ষ্ম প্রয়োগ এবং মীড়ের কাজ শেখার জন্য একটি চমৎকার মাধ্যম। ভোরের পরবর্তী সময়ে প্রকৃতির নিস্তব্ধতার সাথে এই রাগের সুর এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে।

তথ্যসূত্র (Sources)

এই নিবন্ধের তথ্যগুলো নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

২. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৩. সংগীত তত্ত্ব – প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী।

৪. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর স্নাতক (সংগীত) শ্রেণীর নির্ধারিত পাঠ্যক্রম।

আরও দেখুন: