হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দ্বিপ্রহরের দীপ্ত আলো এবং অপরাহ্ণের প্রফুল্ল মেজাজ প্রকাশের জন্য সারং পরিবারের প্রখ্যাত ও আভিজাত্যপূর্ণ শাখা রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ বঢ়হংস সারং’ (বা বাড়হংস সারং) এক অনন্য ও মনোরম সুরচ্ছবি।
‘বঢ়হংস’ বা ‘বাড়হংস’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ রাজহাঁস; রাজহাঁসের গতি ও সৌন্দর্যের মতো এই রাগের স্বরসঞ্চার অত্যন্ত প্রফুল্ল, ঋজু ও লালিত্যময়। সারং অঙ্গের প্রথাগত রূপের সাথে উত্তর্যাঙ্গে শুদ্ধ ধৈবতের সুনিপুণ সংযোজন এই রাগটিকে সারং পরিবারের অন্যান্য সদস্য (যেমন—বৃন্দাবনী সারং) থেকে একটি স্বতন্ত্র ও মনোহর আভিজাত্য দান করেছে।
ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় পটভূমি
রাগ বঢ়হংস সারং প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কাফী ঠাটের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় রাগ। পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডেজীর ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’ এবং বি. সুব্বা রাও-এর ‘রাগানidhi’ সংকলনে এর সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ ও বন্দিশ সংগৃহীত রয়েছে।
সারং পরিবারের মূল আশ্রয় রাগ ‘বৃন্দাবনী সারং’-এ ধৈবত (ধ) এবং গান্ধার (গ) সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে। কিন্তু বঢ়হংস সারঙে উত্তর্যাংশে শুদ্ধ ধৈবত (ধ/D)-এর প্রবেশ ঘটিয়ে প্রবীণ সুরসাধকগণ সারং রাগের আকাশকে আরও বেশি বিস্তৃত ও আভিজাত্যপূর্ণ করে তুলেছিলেন।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট।
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (বা ঔড়ব-সম্পূর্ণ — আরোহণে পাঁচ স্বর; অবরোহণে ধৈবত ও উভয় নিখাদসহ ছয়টি/সাতটি স্বরের সঞ্চার ঘটে)।
- বাদী স্বর: র (শুদ্ধ ঋষভ)।
- সমবাদী স্বর: প (শুদ্ধ পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও ধৈবত (ধ) বর্জিত; অবরোহণে গান্ধার সাধারণত বর্জিত বা অতি সূক্ষ্ম বক্র স্পর্শমাত্র।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (ধ – উত্তর্যাঙ্গে), শুদ্ধ নিখাদ (নি – আরোহণে) এবং কোমল নিখাদ (ণ – অবরোহণে)।
- সময়: মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্ণ (দিনের ২য় প্রহর — দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা)।
- প্রকৃতি ও রস: দীপ্ত, রাজকীয়, প্রফুল্ল ও উজ্জ্বল মেজাজ। এর মূল প্রকাশ বীর এবং শৃঙ্গার রসে।
আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)
আরোহণ:
স র ম প, ধ নি র্স
(S R M P, D N S’)
(নোট: কিছু ঐতিহ্যে আরোহণে স র ম প নি র্স রূপেও যাওয়া হয়, তবে উত্তরের দিকে প ধ নি র্স চরণটিই এর মূল পরিচয়)।
অবরোহণ:
র্স ণ ধ প, ম প ম র, স
(S’ n D P, M P M R, S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, ধ নি র্স, ণ ধ প, ম র, স
(S R M P, D N S’, n D P, M R, S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ বঢ়হংস সারং-এর মূল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এর উত্তর্যাঙ্গে শুদ্ধ ধৈবতের উপস্থিতি এবং উভয় নিখাদের সুষম ভারসাম্যে:
১. ধৈবতের ভূমিকা (Dhaivat’s Role): বৃন্দাবনী সারঙে যেখানে র্স ণ প, ম র স সোজা নেমে আসে, বঢ়হংস সারঙে অবরোহে ধৈবতকে যুক্ত করে র্স ণ ধ প বা প ধ ণ ধ প ভঙ্গিতে নামা হয়। এতে সুরের ক্যানভাসে এক অপূর্ব রাজকীয় বাঁক তৈরি হয়।
২. উভয় নিখাদের প্রয়োগ: আরোহণে স্পষ্ট শুদ্ধ নিখাদ (নি/N) এবং অবরোহণে কোমল নিখাদ (ণ/n) ব্যবহার করা সারং অঙ্গের অনমনীয় নিয়ম।
৩. সারং অঙ্গের ‘ম-র-স’ প্রক্ষেপণ: পূর্বাঙ্গে সারং অঙ্গের মূল পরিচয় স র ম প, ম র, স অত্যন্ত স্পষ্ট ও দীপ্ত থাকে। ঋষভ থেকে পঞ্চমে লম্ফ এবং পঞ্চম থেকে ঋষভে নামার মীড় রাগটিকে সারং পরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রাখে।
ধ্রুপদ, ধামার, প্রথাগত বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়াল বন্দিশের পাশাপাশি সেতার, সরোদ, সানাই ও বাঁশিতে বঢ়হংস সারং-এর বিস্তার অত্যন্ত মনোহর রূপ ধারণ করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- বৃন্দাবনী সারং: সারং পরিবারের প্রথাগত আশ্রয় রাগ; এতে ধৈবতের ব্যবহার সম্পূর্ণ বর্জিত।
- শুদ্ধ সারং: সারং অঙ্গের অন্যতম প্রধান রাগ; এতে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়।
- মিঞাঁ কী সারং: সঙ্গীত সম্রাট তানসেন রচিত সারং রূপ; যাতে কাফী ও মালহার অঙ্গের সুনিপুণ মিশ্রণ থাকে।
- সামন্ত সারং: অবরোহে কোমল ধৈবতের সূক্ষ্ম ছোঁয়া যুক্ত সারং রূপ।
রাগ বঢ়হংস সারং হলো হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে মধ্যাহ্নের এক দীপ্ত ও প্রফুল্ল আলপনা। দ্বিপ্রহরের প্রখর রোদে যখন তানপুরের সুগভীর গুঞ্জনে বঢ়হংস সারং-এর ‘স র ম প, ধ নি র্স, ণ ধ প, ম র, স’-র রূপালী তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যেই আসরকে এক পরম উজ্জ্বল, রাজকীয় ও আনন্দময় সুরলোকে নিয়ে যায়।